Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

বড়িশা ক্লাবে মণ্ডপ মাতাচ্ছেন ‘জোকার’ আব্বাস আলি শাহু

‘কাল খেল মে হাম হো না হো/গর্দিশ মে তারে রহেঙ্গে সদা’— মেরা নাম জোকার সিনেমার গানে মুখরিত প্যান্ডেল। প্রতিমার সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে গলা মেলাচ্ছেন এক জোকার।

বড়িশা ক্লাবে মণ্ডপ মাতাচ্ছেন ‘জোকার’ আব্বাস আলি শাহু
  • ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘কাল খেল মে হাম হো না হো/গর্দিশ মে তারে রহেঙ্গে সদা’— মেরা নাম জোকার সিনেমার গানে মুখরিত প্যান্ডেল। প্রতিমার সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে গলা মেলাচ্ছেন এক জোকার। রং মাখা মুখে হরেকরকম অঙ্গভঙ্গি, হাতে রঙিন বল বারবার শূন্যে ছুড়ে চলেছেন। প্যান্ডেল হপিংয়ে আসা জনতা হেসে খুন। করতালিতের মুখরিত চারিদিক। কিন্তু এ কী! জোকারের দু’চোখ যে ভিজে! হাসির পিছনে কি লুকিয়ে আছে যন্ত্রণা? জোকারের নাম আব্বাস আলি শাহু। প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে নমাজ পড়েন। ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছেন ধর্মশিক্ষা নিতে। অথচ আব্বাস ভিড়ে ঠাসা মণ্ডপে দুর্গাপ্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে মাতিয়ে তুলছেন অসংখ্য মানুষকে। অদৃশ্য গণ্ডি ভেঙে তাঁর বার্তা, ধর্মের চেয়ে বড় হাসি, আনন্দ, ভালোবাসা।

Advertisement

কৃষ্ণনগরের ধুবুলিয়ার আব্বাস ছোট থেকেই সার্কাসের সঙ্গে জড়িয়ে। সমাজের অবহেলা উপেক্ষা করেই মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁদের রোজগারের পথ। কিন্তু এখন বন্যপ্রাণীদের খেলা দেখানো বন্ধ। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে লুপ্তপ্রায় রঙিন তাঁবুর সার্কাস। তাই রুজিরুটিতে তালা পড়েছে। সার্কাসের অবক্ষয়ের করুণ চিত্রই এবার বেহালা বড়িশা ক্লাবের দুর্গাপুজোর থিম, ‘শূন্য পৃথিবী’। শুধু থিম বললে কম বলা হবে, এ এক জীবন্ত কাহিনি। সার্কাসের হারিয়ে যাওয়া দিন, কাজ হারানো অবহেলিত জোকারদের কষ্ট আর নতুন আশা মিলিয়ে মানবিক বার্তা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী মানস দাস। আর আব্বাস আলির উপস্থিতি সেই ভাবনার বোনাস।  আজ যখন ধর্মের নামে মানুষ বিভাজিত, তখন মণ্ডপে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছেন আব্বাস। জোকারের কথায়, ‘আমি মুসলিম। কিন্তু দুর্গা আমারও মা। তাঁর আলোয় আলোকিত এই মণ্ডপ, আমার ভবিষ্যৎও।’
বড়িশা ক্লাবে ঢুঁ মারলে প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে প্রকাণ্ড এক ট্রাক। তাতে লোড করা হচ্ছে সার্কাসের ভাঙা কাঠামো, ফিকে পোস্টার, রঙিন কিন্তু জীর্ণ তাঁবুর কাপড়। পাশে ট্রাঙ্ক মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত এক জোকার। তবে প্যান্ডেলের ভিতরে ভিন্ন পৃথিবী। যেন ঢুকে পড়েছি এক ভুলে যাওয়া স্বপ্নের দেশে। মাথার উপর রঙিন ছাউনি, দু’পাশে ডিজাইন করা পর্দা। দেওয়ালজুড়ে সাজানো কিংবদন্তি সার্কাস শিল্পীদের ছবি। বাংলার সার্কাসের জনক প্রিয়নাথ বোস, মঞ্চে বাঘ নিয়ে প্রথম খেলা দেখানো বীরাঙ্গনা সুশীলা দেবী, পশুপ্রশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীদের প্রাণপণ কসরতের ঝলক। কিন্তু হর্ষের মধ্যেও তাঁদের চোখেমুখে বিষাদের ছায়া। চিত্কার করে প্রশ্ন করতে চাইছেন, ‘আজ আমাদের জায়গা কোথায়?’ মাতৃপ্রতিমাতেও রয়েছে সার্কাসের ছোঁয়া। মা দুর্গা দোল খাওয়াচ্ছেন গণেশকে। ছেলেও যে বাকিদের থেকে আলাদা! শিল্পী মানস দাস বলছিলেন, ‘বাঙালির বিনোদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল সার্কাস। কিন্তু এখন তা সার্কাস লুপ্তপ্রায়। জোকাররা কাজ পায় না। মায়ের আশীর্বাদে তাঁরা আবার সোনালি অতীত ফিরে পাবে। এই ভাবনাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’
বেহালার পুজো মানেই বিবিধ ভাবনার সমাহার। তাই এবার এগিয়ে আসুন বেহালা ক্লাবে। থিম ‘মনচাষ’। বাঙালির প্রিয় আড্ডাকেই মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী কৃশানু পাল। মাটির তৈরি প্যান্ডেলে ঢুকতেই প্রথমে আপনার চোখ টানবে ঝুলবারান্দা। তারপর উত্তর কলকাতার রোয়াক, চায়ের দোকান, ক্লাব ঘর, কফি হাউস, গঙ্গার ঘাট শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন কৃশানু। মাতৃপ্রতিমা দেখলে ঠাকুর দালানের কথা মনে পড়বে। এবার গুটিগুটি পায়ে চলে আসুন বেহালা ২৯ পল্লিতে। থিম ‘মোক্ষপট’। সাপ-সিঁড়ি খেলার মাধ্যমে মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরেছেন শিল্পী অমিত বিশ্বাস। পাশাপাশি ঘুরে আসুন শকুন্তলা পার্কের নেতাজি সংঘেও। সেখানের থিম ‘উড়ন্ত’। সবমিলিয়ে বেহালার দুর্গাপুজো আপনাকে মোহিত করতে বাধ্য।-নিজস্ব চিত্র 

সম্পর্কিত সংবাদ