সব এলোমেলো হয়ে গেল...
নমিতা চৌধুরী (বোন)
পিঠোপিঠি বড় হয়ে ওঠা আমাদের। ছোটবেলার কথা বলি। আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না তেমন। তাই বলে দৈন্যতা ছিল না। শিল্প সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা এত বেশি সমৃদ্ধ ছিলাম যে অন্য অভাব টের পাইনি। যোগেনদা ছিলেন আমার সেজদাদা। ছোট থেকেই সকলের থেকে ভিন্ন। কাজকর্মই ছিল অন্যরকম। ঝুলন যাত্রা হবে, নিজে হাতে যোগেনদা আর অন্য দাদারা মিলে ঝুলন সাজাতেন। পাড়ার সরস্বতী পূজার সময় মূর্তি তৈরি করেতেন, আবার পাড়ার লাইব্রেরি তৈরি, ক্লাব তৈরি করা, ক্লাবের যে পত্রিকা তৈরি করা সবকিছুতেই ভূমিকা থাকত সেজদার। আমি বকা খেতাম মাঝেমধ্যেই। বড় হয়েও মৃদু শাসন ছিল। বলতেন বাজে সিনেমা দেখা যাবে না।... ছবি আঁকালাম হয়তো, খারাপ হলে ধমক খেতাম। সব মিলিয়ে দাদা ছিলেন প্রাণবন্ত। কাজপাগল মানুষ। কাজ নিয়েই থাকতে ভালোবাসতেন। দেখা হলেই আলাদা কাজ করার কথা বলতেন। সেই দাদা নেই। সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল...।
থেমে গেল সংবেদনশীল রেখার ব্যবহার
সমীর আইচ (শিল্পী)
যোগেনদার মাথায় মধ্যে সবসময় কিছু না কিছু কাজের ভাবনা ঘুরতো। সমীর এটা করব সমীর ওটা করব, এমন বলেই যেতেন। মনে আছে ১৯৯৭ সালে আমরা কলকাতায় একটা মেট্রোপলিটন আর্ট ফেস্টিভাল করেছিলাম। যোগেনদার নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছিল ওই কাজ। অত বড় আর্ট ফেস্টিভাল আর হয়নি কলকাতা শহরে। এমন কত যে কাজ করেছি...।
কলেজে পড়ার সময় থেকেই ওঁর কাজের সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলাম। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা বাড়ে পেশাদার জগতে প্রবেশের পর। নয়ের দশকের প্রথম দিকে আলাপ ঘন হয়। আমরা একসঙ্গে এগজিবিশন শুরু করি। ‘শিল্পী আস্থা’ নামে একটা সংস্থাও আমরা তৈরি করেছি। আর্থিক অভাবের কারণে কোনো শিল্পীর চিকিত্সা যাতে আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য এই সংস্থার। যোগেনদা ছিলেন প্রেসিডেন্ট। আমি সেক্রেটারি। যোগেনদা শান্তিনিকেতনে স্বাদ নামে একটা প্রতিষ্ঠান করেছেন। জুনিয়র আর্টিস্টরা যাতে কাজ করতে পারে, কাজ শিখতে পারে, তার জন্য এক ছাদের তলায় অনেকগুলো স্টুডিও বানানো হয়েছে। সেই যোগেনদা আজ নেই! এই দুঃখ শুধু আমাদের নয়। রাজ্য তথা গোটা দেশেরই দুঃখের দিন। বিদেশেও যোগেনদার কাজের কদর ছিল তা আমরা সকলেই জানি। যোগেনদার বহু শিল্পকর্ম আছে জাপানে। এছাড়া কিরণ নাদার মিউজিয়ামেও আছে বহু কাজ। যোগেনদা নিজের হাতে কলকাতার যোধপুরে চারুবাসনা নামে যে সেন্টারটি গড়ে তুলেছিলেন, সেখানেও রয়েছে একাধিক কাজ। যোগেনদার ছবির যে স্বতন্ত্র দিক, তা হল সংবেদনশীল রেখার ব্যবহার। রেখাকে শিল্প প্রকাশের মাধ্যম করার দক্ষতা ভারতের খুব কম শিল্পীর মধ্যেই ছিল বা আছে। খুব সাবলীলভাবে উনি শিল্পের চিরাচরিত রীতিকে ভাঙতে পারতেন। বস্তুতঃ উনি যেভাবে শিল্পরীতিকে নিয়ে খেলা করতে পারতেন তার দেখা খুব সহজে মেলে না। পাশাপাশি যোগেনদার কাজের মধ্যে দেশজ চেতনা আছে। উনি সবসময় ভারতবর্ষকে মাথায় রেখেই কাজগুলো করেছেন। ফলে ওঁর ছবির মধ্যে নারী-পুরুষ যাকেই দেখি, তাকে কখনো বিদেশি মনে হয় না। শিল্পের এই ধারা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাওয়া দরকার।
মন ভালো নেই...
সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় (শিল্পী)
যোগেনদা আমাদের খুব প্রিয় ও কাছের মানুষ। শিল্পী হিসেবেও যতটা কাছের ছিলেন, মানুষ হিসেবেও ততটাই প্রিয়। সারা পৃথিবীর নানা শিল্প সংগ্রাহকদের কাছে যোগেনদার ছবি আছে। আমরা যখন আর্ট কলেজে ঢুকি, তখন থেকেই যোগেনদা নিজের একটা আলাদা ফর্ম তৈরি করেছিলেন। রেখাচিত্র দিয়ে যে ওই অসাধারণ ছবিগুলি তৈরি করা যায় সেটা যোগেনদার ছবি না দেখলে বোঝা যেত না। স্ট্রোকের মাধ্যমে মানবজীবনে নানা সমস্যা, নানা উত্থান পতন তিনি অপূর্বভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। যোগেনদা তাঁর ছবির মাধ্যমে বিশ্বের তাবড় শিল্পীদের সঙ্গে একসারিতে বসতে পেরেছিলেন। ছবি নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনাও হতো। একেবারে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। ওঁর স্ত্রী, ছেলে সকলের সঙ্গেই আমাদের সখ্য। ওঁর চলে যাওয়া বড্ড ব্যথিত করেছে। মন ভালো নেই আমাদের।
পরিজন হারালাম
ইলিনা বণিক (শিল্পী)
যোগেনদা আমার মাস্টারমশাই। যখন শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিতে যাই, ফর্ম তুলতে যাওয়ার দিনই যোগেন চৌধুরীকে প্রথম দেখি। সঙ্গে কিছু আঁকা ছিল নিজের। সেগুলো তাঁকে দেখাই। দেখেই আপ্লুত হয়েছিলেন। তারপর সেখানে সুযোগ পেয়ে ভর্তি হই। তখন আমার ১৮ বছর বয়স। সেই সময় থেকে এই মহীরুহসম মানুষটির সঙ্গে আমার যোগাযোগ। ৩৬ বছর হয়ে গেল এই পরিচয়ের। যোগেনদার ছেলের ডাক নাম পুপুন। আমারও ডাকনাম পুপুন। আমাকে বরাবর সন্তানসম স্নেহ করতেন। আমার বিয়েতেও এসেছেন। পারিবারিক যে কোনো বিপদে পাশে পেয়েছি। মায়ের স্মরণসভাতেও এসেছেন। জীবনের নানা ক্ষেত্রে ও শিল্পচর্চায় তাঁর গাইডেন্স পেয়েছি। ছাত্রছাত্রীদের পাশে ছিলেন আজীবন। আমার মায়ের ক্যানসারের সময় আমার টাকা পয়সার প্রয়োজন ছিল। একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে দিয়েছিলেন। আমার এক সিনিয়রের এক সময় একটু টাকা পয়সার দরকার হয়। যোগেনদা নিজের একটি ছবি তাঁকে দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যাতে সেটি বিক্রি করে সেই সিনিয়র তাঁর প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেন। এত বড়ো মনের মানুষ ছিলেন।
তিনি ছিলেন আমার পরিবারের একজন। শেষ যোগেনদার বাড়ি গিয়েছি ২০২৫ এর সেপ্টেম্বরে। একটি বিশেষ ছবি আঁকার জন্য কিছু চিঠিচাপাটির প্রয়োজন পড়ে। যোগেনদা একটু রেফার করে দিলে কাজটা করতে সুবিধা হতো। সেই সূত্রে একটি চিঠিতে সই করাতে যাই। তারপর হঠাৎ শুনি উনি অনেকদিন ধরে আর কোথাও আসছেন না। চারুবাসনাতেও নয়। একেবারে সুচিত্রা সেনের মতো অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। কারও সঙ্গে দেখা করতেন না। তার কিছুদিন বাদে খবর পাই যে তিনি ব্লাড ক্যানসারে ভুগছেন। সম্প্রতি হাসপাতালে দেখতেও যাই। সেদিন কথাও বলেন। আমার মেয়েও ছিল সঙ্গে। শুধু আলোটা জ্বালাতে দিলেন না। কেন কে জানে! হয়তো রোগব্যাধির মুখ কারওকে দেখতে দেবেন না ঠিক করেছিলেন। বললাম, জানালার পরদা সরিয়ে দিলে বাইরেটা আপনি দেখতে পাবেন। আমার মেয়ের খবর নিলেন। কথাও হল কত! যোগেনদার চলে যাওয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভারতীয় শিল্পে তো বটেই, দুনিয়ার শিল্পভাষাতেও যোগেনদার কাজ পৌঁছে গিয়েছিল অনায়াসে। আমি আমার প্রিয় যোগেনদাকে হারালাম। এই শোকের কোনো অন্ত নেই।



