সমীর সাহা, নবদ্বীপ: চিরাচরিত প্রথা মেনে নবদ্বীপ প্রাচীন মায়াপুর শ্রীশ্রীরাধা মদন গোপাল মন্দিরে শুরু হয়েছে ঝুলন যাত্রা উৎসব। রবিবার সন্ধ্যায় পদাবলী ঝুলন সূচক কীর্তনের মধ্যে দিয়ে এই উৎসবে সূচনা হয়। ‘গৌর আনা প্রভু’ অদ্বৈত আচার্যের বংশধর প্রভুপাদ নিকুঞ্জ গোপাল গোস্বামীর প্রাণবল্লভ রাধা মদন গোপালকে নিয়ে এই ঝুলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বৃন্দাবনের লীলা অনুসারে ১৪ দিনের এই ঝুলন উৎসবে মেতে ওঠেন মন্দিরের ভক্তরা। এই ১৪ দিনের ঝুলন উৎসবকে বলা হয় হিন্দোলা উৎসব।
এখানে একখণ্ড বৃন্দাবন কুঞ্জ তৈরি করা হয়েছে। যমুনা নদীর ধারে কদম গাছ। সেই কদম গাছের ডালে দোল খাচ্ছেন রাধা মদন গোপাল। অষ্টসখিরা তাঁকে ঘিরে রয়েছেন। গাছের ডালের উপরে রয়েছে শুকসারি। পাশেই রয়েছে ময়ূর- ময়ূরী। আর তার পিছনে রয়েছে গিরি গোবর্ধন পর্বত। তার সামনেই রয়েছে গোচরণ ভূমি। সেখানেই গোরু চরে বেড়াচ্ছে।
জানা গিয়েছে এই ১৪ দিন সন্ধ্যায় মূল মন্দির থেকে রাধা মদন গোপালকে ওই ঝুলন মণ্ডপের দোলনায় আনা হয়। রাতে আবার মূল মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। তৃতীয়া থেকে রাধা মদন গোপালকে ঝুলন পূর্ণিমার দিন পর্যন্ত ফুলের সিংহাসনে ঝোলানো হবে। সেইসঙ্গে ১৪ দিন রাধা মদন গোপালকে এক এক দিন এক এক রকমের পোশাক পরানো হবে। আজ, মঙ্গলবার ঝুলনের প্রথম দিন বিগ্রহকে পরানো হবে বাউল বেশ। বুধবার পরানো হবে রাখাল বেশ, পরের দিন গোপী বেশ। ঝুলন পূর্ণিমার দিন পরানো হবে রাসলীলার বেশ অর্থাৎ সম্পূর্ণ সাদা রাজবেশ। ঝুলনের বিভিন্ন দিনে রাধা গোবিন্দকে নিবেদন করা হয় বিশেষ বিভিন্ন ভোগ। এছাড়া শেষের পাঁচ দিন ঝুলন কীর্তনের পদে পদে গোবিন্দকে ভোগ নিবেদন করা হয়।
ঝুলন উপলক্ষে প্রতিদিনই মন্দির প্রাঙ্গণে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ঝুলন কীর্তন। ঝুলন পূর্ণিমার রাত ১০টা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত রাসলীলা পরিবেশিত হবে। এই ১৪ দিন প্রথা মেনে ন› দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সন্ধ্যাকালীন ঝুলন। সেসময় সকলেই রাধা গোবিন্দকে দর্শন করতে পারবেন। আর একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত পাঁচ দিন রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত ২টো পর্যন্ত রাতের ঝুলন। অর্থাৎ কুঞ্জের ঝুলন। এই কুঞ্জের ঝুলন হচ্ছে গোপন ঝুলন। এই রাতের ঝুলনে সখী ও সখাদের নিয়ে গোবিন্দ রাধারানির সঙ্গে কুঞ্জে ঝুলন করেছিলেন। সেই সময় কুঞ্জের ভক্ত ও সখীদের নিয়ে যুগল চরণ দর্শন করিয়েছিলেন। সেই পাঁচ দিন চরণ যুগলই রাতের ঝুলনে দর্শন করতে পারেন ভক্ত ও পুণ্যার্থীরা।
মন্দিরের অন্যতম সেবায়েত প্রভুপাদ কৃষ্ণ গোপাল গোস্বামী জানান, বৃন্দাবনের রীতি অনুযায়ী এই মন্দিরে ঝুলন উৎসব উদযাপিত হয়। এই ১৪ দিন রাধারানি বাবার বাড়িতে আসেন। রাধারানির সঙ্গে গোবিন্দের মিলন হয়। সেই আনন্দে শ্রাবণের এই সময় রাধা গোবিন্দকে ঝুলনে বসানো হয়। গৃহবধূ তিয়াশা গোস্বামী বলেন, ন’বছর আগে এই পরিবারে আমার বিয়ে হয়েছে। ঝুলনের দিনগুলিতে নিজের হাতে রাধা মদন গোপাল এবং অষ্টসখীদের সাজাই। শ্রীশ্রীরাধা মদন গোপাল মন্দিরে ভোগ রান্না করেন লোকনাথ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ঝুলনে কোনদিন ভুনা খিচুড়ি, কোনদিন অন্ন, পঞ্চ ব্যঞ্জন, কোনদিন পুষ্পান্ন, ছানার রসা, লুচি, পরোটা, কচুরি তৈরি করে রাধামাধব গোপালকে নিবেদন করা হয়।