দেবাঞ্জন দাস: সমুদ্রসফেন ঢেউ আছড়ে পড়া তটভূমি। বালিয়াড়ি আর ঝাউবন! বাঙালি মধ্য আর নিম্নবিত্তের হট ফেভারিট ডেস্টিনেশন ‘দীপুদা’ শুরু এই দীঘা দিয়েই। সাগরে হুল্লোড়ে স্নান, মাছভাজা, সেলফি আর নরম-গরম পানীয়ের মৌতাতের উইকএন্ড! এহেন ডেস্টিনেশনে এবার ধর্মীয় ভাবাবেগ। প্রভু জগন্নাথের নব আলয়! শ্রীধাম পুরীর আদলে বিশালাকার মন্দির! কলিঙ্গ স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী গোপুরম (সিংহদ্বার), পদ্মকুণ্ড, গোপুরম ২, ভোগমণ্ডপ, নাটমন্দির, জগমোহন, ভীমানা ( গর্ভগৃহ) আর গোপুরম ৩—-পরতে পরতে নীলাচলের ছায়া! মন্দির, জগন্নাথ দেব আর সঙ্গে প্যাঁড়া, গজা, খাজা আর রসগোল্লার প্রসাদ। ফেভারিট ডেস্টিনেশনে নিউ দীঘা, ওল্ড দীঘা আর মোহনার মাঝে নবতম সংযোজন নয়া জগন্নাথধাম। আস্তিক বাঙালির পিলগ্রিম প্যাকেজ।সৈকতনগরীর এহেন উত্তরণ যাঁর হাত ধরে, বাংলার সেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তুমুল উচ্ছ্বসিত! অধ্যাত্মবাদ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—-দীঘা এখন থেকে যেন এক ‘অমরাবতী’! শুধু রাজ্য তথা দেশই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও ঠাঁই পাবে দীঘার তটভূমি, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন মমতা!
দীঘার বর্তমান চেহারাটা যে মমতার সৌজন্যেই, তা মানে তাঁর কট্টর সমালোচকরাও। মোহনা থেকে উদয়পুর, ঝাঁ চকচকে মেরিন ড্রাইভ ধরে যাওয়ার পথে খন্দালগোবরা গ্রাম (বর্তমানে যা জগন্নাথ ঘাট)। মেরিন ড্রাইভের ধারে রাস্তাটা শঙ্কর মণ্ডল রোড। তারই একটা অংশে ছোট্ট দেবালয়ে বলরাম দেব আর দেবী সুভদ্রাকে নিয়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন জগন্নাথ দেব। হলফ করে বলা যায়, খুব কম পর্যটকের নজরে ছিল জায়গাটি। ২০১৮ সালে দীঘা সফরপর্বে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের মাথায় এসেছিল এক অভাবনীয় পরিকল্পনা! আলোচনা করলেন আমলাদের সঙ্গে। মুখে না বললেও, অনেকেই তখন আড়ালে আবডালে বলাবলি করেছিলেন—-কেমন করে সম্ভব? শ্রীধাম পুরীর রেপ্লিকা দীঘায়! কিন্তু মমতার অভিধানে অসম্ভব বলে কোনও শব্দ যে নেই, তাও জানতেন আমলারা। তেমনই কয়েকজন মিলে (তাঁদের মধ্যে ছিলেন তিনিও, এখন রাজনীতির কারণে বিরোধিতায় নামলেও, তখন তুমুল উৎসাহ নিয়ে মন্দিরের জমি খুঁজেছিলেন) উপায় বের করলেন। দীঘা স্টেশনে যাওয়ার পথে বালিয়াড়ি সদৃশ বিশাল একটা জমি পড়েছিল দীঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের। প্রায় ২০ একর। প্রস্তাব গেল নবান্নে, সানন্দে সায় এল জগন্নাথ দেব ভক্ত মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে। ২০১৯ সালের ২১ আগস্ট ফের দীঘা সফরের সময় মমতা নিজেই ঘোষণা করলেন, এখানকার সমুদ্রতটে গড়ে তোলা হবে বাংলার জগন্নাথ ধাম।
দীঘার যে ছোট্ট দেবালয় থেকে বিশালাকার মন্দিরে অধিষ্ঠিত হতে চলেছেন জগন্নাথ দেব, সেটা তৈরির ইতিহাসের সঙ্গে রয়েছে দেব মাহাত্ম্য! দীঘার বাসিন্দারা কমবেশি সবাই জানেন তা। বছর ১৯ আগের কথা! জনৈক সমীর দাস সস্ত্রীক বসে ছিলেন খন্দালগোবরা গ্রামের সমুদ্রপাড়ে। সেই সময় ভেসে এসেছিল তিন দেব মূর্তি—-জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা! তুমুল আলোড়ন শুরু হয়ে যায় গোটা এলাকায়। মহাপ্রভু নিজে এসেছেন সৈকতনগরীতে। এগিয়ে এলেন মৎস্যজীবীরা, ব্যবসায়ীরা। অধিষ্ঠিত করা হবে দেব-দেবীকে।সমীরবাবুর উদ্যোগ আর ভক্তপ্রাণ কতিপয় মানুষের অর্থ সাহায্যে সমুদ্রপাড়ে ২০০৭ সালের ২১ মার্চ অধিষ্ঠিত হলেন জগন্নাথ দেব। দীঘার ছোট জগন্নাথ মন্দির, জগন্নাথ ঘাট। জগন্নাথ ঘাটের এই মন্দিরে পূজিত হতেন রাধাগোবিন্দ দেব এবং দেবী গঙ্গাও। সেই মন্দির থেকে যেমন নয়া দেবালয়ে গিয়েছেন জগন্নাথদেব, তেমনই পুরনো মন্দিরের বাকি দেব-দেবীরা যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় নিত্য পূজিত হওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুরীর ধাঁচেই দীঘায় জগন্নাথ দেবের জন্য তৈরি হয়েছে ‘নন্দীঘোষ’, বলরাম দেবের জন্য ‘তালধ্বজ’ ও দেবী সুভদ্রার জন্য ‘দেবদলন’ রথ। তিনটি রথ সজ্জায় যে কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে, তাও পুরীর মতোই। তবে আকার-আকৃতিতে অনেকটাই ছোট। এবার রথযাত্রার সময় নব আলয় থেকে বের হয়ে জগন্নাথ সেই নন্দীঘোষে চেপেই যাবেন মাসির বাড়ি। খন্দালগোবরার সেই পুরনো মন্দিরই এখন যে প্রভুর মাসির বাড়ি। পর্যটনস্থল থেকে ধর্মীয় উত্তরণ, দীঘা নিয়ে বিতর্ক তৈরিতে ব্যস্ত কয়েকজন স্বঘোষিত ‘সনাতনী রক্ষাকর্তা’, তাতে মাথা ঘামাতে রাজি নন মমতা। গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে পর্যটকদের আনাগোনা আর সেলফি তোলার ভিড় বাড়ছে মন্দিরের দ্বারে, তাতেই তৃপ্ত রূপকাররা। জনতা জনার্দন সায় দিয়েছেন মহাপ্রভুর আবাহনে। দীঘা তো বটেই, গোটা বাংলা এখন মগ্ন ‘জয় জগন্নাথ’এ।