


জগদ্ধাত্রীর জগদ্ধাত্রী পূজা-কথাটি শুনতে অবাক লাগে। পরবর্তী কালে কয়েক জন ভাগ্যবান শ্রীশ্রীমাকে মা জগদ্ধাত্রীরূপে দর্শন করেছিলেন। ১৮৯১ সাল। জয়রামবাটীতে জগদ্ধাত্রী পূজা উপলক্ষ্যে স্বামী সারদানন্দ, বৈকুণ্ঠ সান্যাল, হরমোহন মিত্র, কালীকৃষ্ণ (বিরজানন্দ), যোগেন-মা ও গোলাপ-মা কলকাতা থেকে বর্ধমান হয়ে গোরুর গাড়িতে বহু জিনিসপত্র নিয়ে কামারপুকুর পৌঁছান। প্রাচীন সাধুদের মুখে বা লেখনীতে পুরানো দিনের স্মৃতি শুনতে ভালো লাগে। স্বামী বিরজানন্দের নিখুঁত বর্ণনা পড়লে আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি ৩৮ বছরের শ্রীশ্রীমায়ের মাতৃত্ব কী সুন্দরভাবে কর্ম ও সেবার মাধ্যমে ফুটে উঠেছিলঃ
[কামারপুকুর থেকে] পরদিন সকালে মুটেদের মাথায় সব বোঝা দিয়া আমরা পদব্রজে প্রায় দুই ক্রোশ মাঠের আল ধরিয়া হাঁটিয়া ও পথে আমোদর নদী পার হইয়া জয়রামবাটীতে শ্রীশ্রীমায়ের চরণপ্রান্তে উপনীত হইলাম। মা আমার চিবুকে হাত দিয়া চুম্বন করিলেন। আমাদের পাইয়া তাঁহার সে কি আনন্দ! কি করিবেন, কোথায় রাখিবেন, কি রান্না করিয়া খাওয়াইবেন যেন ভাবিয়া পান না! এইজন্য দিনরাত খাটিতে লাগিলেন। নানা ব্যঞ্জনাদি নিজ হাতে দুবেলা রাঁধিতে ব্যস্ত থাকিতেন ও বসিয়া খাওয়াইতেন, খাওয়াইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিয়া পাতে দেওয়াইতেন। অমন অমৃতের মতো রান্না জীবনে কখনও খাই নাই। সকাল ৯/১০ টার সময় একটা বড় থালা ভরা ঘিয়ে মাখা মুড়ি, কামার-পুকুরের মেঠাই (মিষ্টি) বা কড়াইয়ের ডালের জিলিপি, বেলা ১টার সময় নানা ব্যঞ্জনাদির সহিত ভাত, বৈকালে চা, রাত্রে লুচি, ভাজা, তরকারী। অমন মুড়ি কখনও খাই নাই, দ্বিতীয়বার যাইয়া আরও চাহিয়া আনিয়া খাইতাম। মায়ের হাতের বাড়া ভাত ও তরকারী (মাছচাটুই যাহা ঠাকুর খাইতে খুব ভালবাসিতেন, কড়াইয়ের ডাল, পোস্ত-চচ্চড়ি, প্রভৃতি) বলিয়া এবং মা নিজে আরও খাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতেন-এইজন্য প্রায় দ্বিগুণ খাইয়া ফেলিতাম। সে রান্না কি যে সুস্বাদু ও মিষ্ট লাগিত তাহা বলা যায় না। যেন etherial something (স্বর্গীয় কিছু); এখনো যেন মুখে লাগিয়া রহিয়াছে!
আমরা চারজনে তখনকার মায়ের বাড়ীর বাহিরের দিকে ছোটঘরে থাকিতাম। তাহার পাশে খোলা দালানে জগদ্ধাত্রীপূজার আয়োজন হইয়াছিল। আমাদের ঘরটির পিছন দিকের দরজার সামনেই ছোট উঠান, উঠানের সম্মুখে মায়ের খোড়ো ঘর ও দাওয়া; তাই আমাদের ঘরের দরজা খোলা থাকিলে মা দাওয়ায় বসিয়া তাঁহার তরকারীকোটা প্রভৃতি কাজ করিতেছেন দেখা যাইত। মায়ের ঘরের পাশের অন্য খড়ো ঘরগুলিতে মামারা ও দিদিমা থাকিতেন। উঠানের মাঝখানে ধানের দুইটা মরাই, আমাদের ঘরের পাশে উত্তরে যাইবার দরজা ও পথ, তাহার বামদিকে রান্নাঘর ও ঢেঁকিশাল, পাশের দিকে খিড়কীর [খিড়কির] পুকুর, মা তাহাতে বাসন মাজিতেন। গ্রামের বাহিরে বড় তালপুকুর, তাহাতে পাড়াশুদ্ধ [সুদ্ধ] স্ত্রী পুরুষ স্নানাদি করিত ও তাহা হইতে খাবার ও রান্নার জল আনিত। মাও তাই করিতেন, নিজে কলসী করিয়া জল আনিতেন।
স্বামী চেতনানন্দের ‘ধ্যানলোকে শ্রীমা সারদা দেবী’ থেকে