Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরেই বাংলায় শুরু জগদ্ধাত্রী পুজো

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর জাঁকজমক আজ বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছে। আলোর উৎসব, শিল্পসজ্জা আর ভক্তির মিলনে এই পুজো এখন বাংলার অন্যতম ঐতিহ্য।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরেই বাংলায় শুরু জগদ্ধাত্রী পুজো
  • ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর জাঁকজমক আজ বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছে। আলোর উৎসব, শিল্পসজ্জা আর ভক্তির মিলনে এই পুজো এখন বাংলার অন্যতম ঐতিহ্য। কিন্তু এই উৎসবের সূচনা যে হয়েছিল কৃষ্ণনগরের মাটিতে, সে কথা অনেকেই ভুলে গিয়েছেন। নদীয়ার কৃষ্ণনগরই জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্মভূমি। রাজনীতি, ধর্মবিশ্বাস, বেদনা আর ভক্তির মেলবন্ধনে এখানেই প্রথম দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা শুরু হয়েছিল। সে কাহিনি এরকম— তখন বাংলার শাসনভার ছিল আলিবর্দি খাঁর হাতে। আর কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন এক বিশিষ্ট জমিদার বা রাজা। দিল্লির দরবারে নিয়মিত খাজনা পাঠানো ছিল তাঁদের কর্তব্য। কিন্তু একবার কৃষ্ণচন্দ্র কোনও কারণে সেই খাজনা দিতে অস্বীকার বা বিলম্ব করেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে আলিবর্দি খাঁ (মতান্তরে মিরকাশিম) কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দি করে নিয়ে যান মুর্শিদাবাদে।

Advertisement

ঘটনাটি ঘটে শরৎকালে, দুর্গাপুজোর ঠিক আগে। রাজা বন্দি থাকায় সেই বছর রাজপরিবারে দুর্গাপুজো হয়নি। রাজা মুক্তি পান দুর্গা ঠাকুর বিসর্জনের পর, যখন দেবী উমা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে। দুর্গা আরাধনা করতে না পারার দুঃখে ভেঙে পড়েন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। সেই রাতে নাকি স্বপ্নে তাঁকে দর্শন দেন দেবী স্বয়ং। বলেন, আমাকে আবার পূজা করো, আমি অন্য রূপে ফিরে আসব। রাজা কুল পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে, তাঁর পরামর্শে পরদিন থেকেই শুরু করেন দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা। নবমী তিথিতেই তিনি পুজোর আয়োজন করেন। এইভাবেই কৃষ্ণনগরে সূচনা হয় জগদ্ধাত্রী পুজোর, যা পরবর্তীকালে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।
তবে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বন্দিদশার পিছনে অন্য এক কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, আলিবর্দি খাঁ তাঁর দৌহিত্রীর সঙ্গে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্র শিবচন্দ্রের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ধর্মবিশ্বাসে দৃঢ়, গোঁড়া শাক্ত হিন্দু রাজা এই প্রস্তাবে রাজি হননি। স্থানীয় গবেষক সুপ্রতিম কর্মকারের বক্তব্য, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র আলিবর্দির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। শোনা যায়, নবদ্বীপের তান্ত্রিক কালীশঙ্কর ঠাকুরের তন্ত্রক্রিয়ায় আলিবর্দির দৌহিত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। এই কথা জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে আলিবর্দি রাজাকে বন্দি করেন। যদিও এই ঘটনার কোনও লিখিত প্রমাণ আজও মেলেনি, তবে লোকমুখে কাহিনিটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বন্দিদশা থেকে জন্ম নেওয়া এক নতুন আরাধনা আজ এক মহান উৎসবে রূপ নিয়েছে। কৃষ্ণনগরের সেই প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজোই ছিল দুর্গাপুজোর বিকল্প রূপ, কিন্তু তা-ই পরে বাংলার সংস্কৃতির অংশ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চন্দননগর থেকে কলকাতা পর্যন্ত।
আজ চন্দননগরকে বলা হয় জগদ্ধাত্রী পুজোর শহর। কিন্তু তার আলো প্রথম জ্বলে উঠেছিল কৃষ্ণনগরের রাজপ্রাসাদে। এখানেই দেবী প্রথম পূজিত হয়েছিলেন ‘জগদ্ধাত্রী’ নামে। তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই ঐতিহ্য আজও অম্লান। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ভক্তি, বেদনা আর দৃঢ় বিশ্বাসই হয়ে উঠেছিল এক নতুন পুজোর প্রেরণা— যা আজ বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক।
চন্দননগরের পুজো যতই খ্যাত হোক, ইতিহাস সাক্ষী— জগদ্ধাত্রীর জন্মভূমি কৃষ্ণনগর। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ভক্তি ও ঐতিহ্যের সেই আলোকময় অধ্যায়, যা আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জাগিয়ে রাখে শ্রদ্ধা মিশ্রিত গর্বের অনুভূতি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ