পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটে রীতিমতো ঝড় তুলে প্রথমবার সরকার গড়তে চলেছে বিজেপি। এত ভালো ফলাফল গেরুয়া শিবিরের অতি বড়ো নেতাদের অনেকেই হয়তো আশা করতে পারেননি। এর আগে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ‘২০০-পার’-এর প্রচার চালিয়ে ৭৭-এ থামতে হয়েছিল বিজেপিকে। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে তাদের আসন সংখ্যা ১৮ থেকে এক ধাক্কায় নেমেছিল ১২-তে। পরপর দু’টি নির্বাচনে ভরাডুবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে অপ্রতিরোধ্য মনে করা হচ্ছিল। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছিল, পশ্চিমবঙ্গে শাসন ক্ষমতা দখল করতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব কতটা আগ্রহী—তা নিয়েও। এই মিথ আর অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিল ’২৬-এর ফলাফল। ভোটের প্রচারে ১৭৭টি বা তারও বেশি আসন দখল করে সরকার গঠনের স্বপ্ন ফেরি করেছিলেন বিজেপি নেতৃত্বের অনেকেই। ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেল, ২০২১-এর স্লোগান ২০২৬-এ ফলে গিয়েছে। ২০০ পার। বিজেপির বিজয় রথ এখনও পর্যন্ত থেমেছে ২০৭-এ। এই বঙ্গভূমি জয়ের একটি কারণ যদি হয় মেরুকরণের সুফল, তবে অন্য কারণটি নিশ্চিতভাবে মমতা সরকারের দেড় দশকের শাসনের বিরুদ্ধে জনরোষের বহিঃপ্রকাশ। বিজেপির চড়া সুরের বিভাজনের রাজনীতির প্রচারে হিন্দু ভোটের সিংহভাগ ভোটযন্ত্রে গেরুয়া শিবিরকে বাড়তি সুবিধা দেবে, তা জানাই ছিল। কিন্তু তাতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ছাইচাপা আগুন। এই জোড়া ফলার আক্রমণে কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে তৃণমূলের রক্ষণ।
আক্ষরিক অর্থেই এবার ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর সরকার দেখবে বঙ্গবাসী। ভোটের প্রচারে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকার সুফলের দাবির কথা বারবার বলতে শোনা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহদের মুখে। মমতার আমলে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ বিশেষভাবে শোনা যেত। এক) বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে রাজ্যের ন্যায্য পাওনা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। যেমন, ১০০ দিনের কাজের টাকা, আবাস যোজনার অর্থ ইত্যাদি। দুই) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের মতো বিরোধী শাসিত অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে মোদি সরকার। পাশাপাশি রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অভিযোগ ছিল, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে রাজ্যবাসীকে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুফল পাওয়া থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে মমতার প্রশাসন। আশা করা যায়, রাজ্যে এবার বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসায় অতীতের যাবতীয় আকচা-আকচি বন্ধ হবে। কোনো প্রকল্পের টাকা আটকে থাকবে না। পাশাপাশি, বেআইনি অনুপ্রবেশ আটকাতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য এবং বিভিন্ন রেল-রাস্তা প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে রাজ্যের তরফে জমি অধিগ্রহণ আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। খবরে প্রকাশ, বাংলার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বাজেটের মাধ্যমে বিশেষ ‘আর্থিক প্যাকেজ’ ঘোষণা করতে পারে মোদি সরকার। তেমনটা সত্যি হলে অবশ্যই তা রাজ্যবাসীর জন্য আশার খবর। যদিও বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে সরকার পরিচালনার ছবিটা দেখলে কিছুটা নেতিবাচক চিন্তা আশাটাও সমান সত্য।
এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই বিপুল জনাদেশ এরাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের কাছে রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মুহূর্তে রাজ্যের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা মাঝারি মানের। প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকা দেনার বোঝা নিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করবে। এই বাস্তবতাকে শিরোধার্য করেই নতুন সরকার ইস্তাহার বা সংকল্পপত্র-এ দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে— এটাই প্রত্যাশিত। তথ্য বলছে, মমতার জমানায় প্রায় একশোটির কাছাকাছি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অংশ ও শ্রেণির মানুষের কাছে নগদ সাহায্য পৌঁছাত। বিজেপি নিশ্চয়ই এসব ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। বিশেষত মহিলা ও বেকারদের ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিজেপি রাজ্যতে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা এখানে ভুল বলে প্রমাণিত হবে। রাজ্যের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য বড়ো শিল্প স্থাপন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ, স্থায়ী কর্মসংস্থানের প্রশ্নে মমতা সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। সোজা কথায়, শিক্ষিত বেকারদের স্থায়ী চাকরি এবং তার জন্য শিল্প চাই। বিজেপির সংকল্পপত্রে পাঁচ বছরে ১ কোটি মানুষের জন্য নতুন চাকরি, শিল্প স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি রয়েছে চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণেরও। এছাড়াও কৃষক, সরকারি কর্মীদের নানা সুবিধা, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় হাল ফেরানো, আবার ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে ইস্তাহারে। এই একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি এখন পূরণ করার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য হাতে থাকবে পাঁচ বছর সময়। সাধারণভাবে রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অনেকটাই রক্ষা করে না বলে সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা। এই ধারণা একেবারে যে ভুল তাও নয়। ‘নতুন পশ্চিমবঙ্গ’ উপহারের অঙ্গীকার করা বিজেপির কাছে তাই এই ধারণা বদলে দেওয়ার সুযোগ এসেছে। নতুন সরকারের যাত্রাপথের শুরুতে তাই কোনো নিরাশা রাখতে চায় না বঙ্গবাসী। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ট্র্যাডিশন বজায় থাকলে এই জনগণেরই মুখ ফেরাতে সময় লাগবে না।