দীপক মল্লিক (দেহ বহনকারী ডোম): ইমার্জেন্সির দোতলার একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে পরপর রাখলাম। একঝলক তাকিয়ে মনে হল, যেন সকলে ঘুমিয়ে আছেন। একবার ডাকলেই উঠে পড়বেন। দেহ নিয়ে যাওয়া শুধু নয়, গোনাও আমাদের অনেকগুলি কাজের মধ্যে পড়ে। আপনাদের মনে হতে পারে, বড় নিষ্ঠুর এই কাজ।
কী করব! পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। আর কাউকে না কাউকে তো সমাজের অপ্রিয় কাজগুলি করতে হবে। এক্ষেত্রে নয় আমি। দোতলার ওই ঘরে রেখে এসেছি ১৩ জন মহিলা, ৩ জন পুরুষ আর একটি বাচ্চাকে। কারো শরীরে বাইরে থেকে তেমন কোনও চোট আঘাতই ছিল না। অভিজ্ঞতা বলছে, এই ধরনের পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় একজনের উপর অন্যজন চাপা পড়লে, আসলে ক্ষতি হয় শরীরের ভিতরে।
কলকাতা মেডিকেল কলেজে শনিবার আমার ডিউটি ছিল দুপুর ২টো থেকে রাত ৯টা। তখন রাত ৮ টা হবে। অন্যান্য দিনের মতো কাজ সেরে স্নান করতে গিয়েছিলাম। সবে স্নান সেরে বেরিয়েছি। তখনই ফোন। ‘তাড়াতাড়ি আসো ইমার্জেন্সিতে’। ওদিকের ফোনের এই ধরনের গলা আমি চিনি। মানে বড় কিছু একটা হয়েছে। তারপর পর একের পর এক, একের পর এক, দেহ আসছে তো আসছেই। হয়ত কারও ভাই, কারও বোন, কারও স্বামী-স্ত্রী বা কারও সন্তান। আর আমার কাছে সেগুলি হল সংখ্যা—আমার কাছে এটি হল কাজ। ভুল বুঝবেন না, বিশ্বাস করুন, আমিও সংসার ধর্ম করা মানুষ। আমারও মনুষ্যত্ব আছে। তাই যতবারই এমন ঘটনা ঘটে, দেহ মর্গে নিয়ে যাওয়ার পর, বাড়ি ফিরে আমি স্নান করে নিই। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি, যাঁদের নিয়ে এলাম, প্রত্যেককে শান্তি দিও।
আজ রাতের মধ্যে বাড়ির লোকজন এসে অনেককে শনাক্ত করেছেন। এখনও অনেককে শনাক্ত করা যায়নি। এর পরের ধাপ, ওয়ার্ডমাস্টার অফিসের খাতায় নাম তোলা হবে। পুলিশকে জানানো হবে। কাগজ দেওয়া হবে। ময়নাতদন্ত হবে। তারপর বাড়ির লোকজনের হাতে দেহগুলি তুলে দেওয়া হবে। জানি, সামনে যাঁরা শুয়ে আছেন, প্রত্যেকের সঙ্গে তাঁদের প্রিয়জনেরকত রকমের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে কেঁদে চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে কাছের মানুষদের। তারই মধ্যে আমাদের কাজ করে যেতে হয়। বুকে পাথর রেখে। আসলে যে কাজগুলি আপনারা ভদ্রলোকেরা অনেকেই করতে চান না, আমাদের মতো লোকজনকেই করতে হয়।
চোরবাগান পুজোমণ্ডপে পদপিষ্টদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শনিবার অনিন্দ্য পালচৌধুরীর তোলা ছবি।



