দুর্গাপুজোর ইতিহাসে কালো দিন! সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত ১৯,গাফিলতির অভিযোগে আটক ১২
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সপ্তমীর সন্ধ্যা। বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে কালো দিন! শহরজোড়া আলোর রোশনাই, মণ্ডপে মণ্ডপে জনস্রোত, উৎসবের উন্মাদনা। মুহূর্তে সব বদলে গেল ভয়াবহ মৃত্যুমিছিলে। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন অন্তত ১৯ জন। মৃতের তালিকায় রয়েছেন ১৪ মহিলা ও এক শিশু সহ ৪ নাবালক। জখম কমপক্ষে ২৫। তাঁদের মধ্যে ছ’জন আশঙ্কাজনক। শনিবারের এই ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে উদ্যোক্তা, স্বেচ্ছাসেবক সহ ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বন্ধ করে দেওয়া হয় চোরবাগানের মণ্ডপ। সেখানে তখনও ইতস্তত ছড়িয়ে জুতো, ব্যাগ, প্যান্ডেলের ছেঁড়া কাপড়। পদপিষ্টের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শহরের বিভিন্ন ভিড়প্রবণ পুজোগুলি রাতে দর্শনার্থীদের প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। 

Advertisement

প্রাণে বেঁচে ফেরা এক পুজোপ্রেমীর দাবি, সংকীর্ণ প্রবেশদ্বার দিয়ে নাগাড়ে দর্শনার্থী ঢোকার ফলে মণ্ডপের ভিড়ের চাপ বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই নামে প্রবল বৃষ্টি। মাথা বাঁচাতে প্যান্ডেলে ঢোকার জন্য মরিয়া দৌড় দেয় লাইনে দাঁড়ানো জনতা। আর তখনই উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে মাইকে একটি ঘোষণা হয়। সঙ্গে সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে মণ্ডপে ঢোকার সংকেত দেন বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা। তাতেই হয় বিপত্তি। অন্ধকারাচ্ছন্ন মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ টপকে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা চালায় অগুনতি মানুষ। ঠেলাঠেলি ও পায়ের চাপে আচমকাই ভেঙে পড়ে প্যান্ডেলের কৃত্রিম মেঝে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান দর্শনার্থীরা। প্রাণ বাঁচাতে একে অপরকে ঠেলে, মাড়িয়ে দেওয়ায় দুর্ঘটনা প্রবল আকার নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারাই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। মোট ৩৫ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১৮ জনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় আরও একজনের। 
এদিনই শহরে এসেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রবিবার বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেনজির বিপর্যয়ের জেরে তা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল রাজ্যের মন্ত্রীদের কর্মসূচিও। দুর্ঘটনার খবর পেয়েই কলকাতা মেডিকেল কলেজে ছুটে আসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রশাসনিক কর্তারা। ইমার্জেন্সির সামনে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। শুভেন্দু বলেন, ‘এই ঘটনা মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক। ঘটনার সময়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুজো কমিটি সব কিছু গুরুত্ব দিয়ে দেখলে এই বিপদ এড়ানো যেত। দুর্ঘটনার পিছনে আলো কম থাকাও একটি কারণ। প্রতিটি পুজো কমিটিকে মনে রাখতে হবে, থিমের থেকে মানুষের জীবনের দাম বেশি। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে লিখব ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের জন্য কর্মরত কোনো বিচারপতিকে নিয়োগ করতে। এনিয়ে সিট গঠন করা হবে, যেখানে এসটিএফ-সিআইডি সহ অন্যান্য সংস্থা থাকবে। গাফিলতিতে জড়িত থাকা কেউই রেহাই পাবেন না।’ অভিযোগ, অনভিজ্ঞ লোকজনের হাতে ছিল পুজোর দায়িত্ব। এমনকি বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী সরবরাহ করা সংস্থাটিও আনকোরা। উদ্বোধনের পর থেকে ভিড় উপচে পড়লেও থানার তরফে অতিরিক্ত বাহিনী চাওয়া হয়নি।
পুজোয় এত মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী কখনো থাকেনি বাংলা। এদিনের ঘটনা ছাপিয়ে গিয়েছে ১৯৮০ সালে ইডেনে ডার্বি ম্যাচে পদপিষ্ট হয়ে ১৬ জনের প্রাণহানিকে। এবার শুরু থেকে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল চোরবাগান। কমিটির হাতবদল হওয়ায় দ্বিতীয়বার খুঁটিপুজো হয়। দায়িত্ব পান শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল। এবারের থিম—‘অ-রব’, অর্থ নৈঃশব্দ। সপ্তমীর সন্ধ্যায় কান্নার রোল সেই থিম ভেঙে খানখান করে দিয়েছে।