নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও,’ কলকাতা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে বসে চিৎকার করছেন ঈশানি বিশ্বাসের মা। মেয়েকে হারিয়ে দিশাহারা। হাসপাতালের চত্বরে স্বজন হারানো এরকম বহু মানুষের চিৎকার। সকলেই ব্যাকুল, আতঙ্কিত। চোরবাগানের ঘটনায় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আলো মুছে নেমে এল আতঙ্কের অন্ধকার। শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটা ৪০ নাগাদ কলকাতার গিরিশ পার্ক থানার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। পদপিষ্টে মৃত ১৮।
নিউটাউনের গৌরাঙ্গনগর থেকে এসেছিলেন ৫ জন। তাঁদের মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কুমোরটুলি থেকে এসেছিলেন মা ও ছেলে সোনু পাল (২৫)। ছেলের চোখের সামনে তাঁর মা পদপিষ্ট হন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। সোনু বলেছেন, ‘আমিও পড়ে গিয়েছিলাম। কোনোরকমে উঠে দেখি মা পড়ে রয়েছেন। কাছে গিয়ে দেখি, আর নেই।’ তিনি জানান, বৃষ্টির মধ্যে তাঁরা প্যান্ডেলের ভিতর আটকে গিয়েছিলেন। আর বৃষ্টির জন্যই বাইরে অপেক্ষারত দর্শনার্থীরা ঢোকার চেষ্টা করেন। তাঁরা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ার ফলেই ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। সে কারণেই পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে। পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা প্রীতম সরকার বৃষ্টির প্রসঙ্গ তুলে পুলিশের গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি জানান, পুলিশকে বলা হয়েছিল অল্প অল্প করে লোক ছাড়তে। একটা সময় বৃষ্টি হচ্ছিল বলে পুলিশ হালকা দিয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত লোক ছেড়ে দিয়েছে। একসঙ্গে একই জায়গায় বিপুল ভিড়ের চাপে এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ একসঙ্গে এত লোক না ছাড়লে এই পরিস্থিতি তৈরি হত না।
অন্যদিকে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উদ্ধার কাজ শুরু হয়। আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। এরপরই হাসপাতাল চত্বরে শুরু হয় উৎকণ্ঠা, খোঁজাখুঁজি আর কান্না। খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান বহু লোক। ভিড়ের মধ্যে প্রিয়জনকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। সেখানে খোঁজ না পেয়ে শেষ ভরসা হয়ে ওঠে হাসপাতাল। তারপর দেহ শনাক্ত করার জন্য হাসাপাতালে ছোটেন নিখোঁজের পরিবার-পরিজন।
শোকের পাশাপাশি জমেছে ক্ষোভও। এত বড়ো বিপর্যয় কেমনভাবে ঘটল তা নিয়ে লাগাতার প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সকলের অভিযোগ, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরনোর পথ ছিল সরু। মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ঘোষণাও ঠিকমতো হয়নি। তার ফলে প্রবল বিভ্রান্তি ছড়ায়। দর্শকদের অনেকের দাবি, ‘বিপদের মুহূর্তে চিৎকার করেও উদ্যোক্তাদের দেখা পাননি তাঁরা। পুলিশও আসেনি।’
যে রাতে পুজোর আলোয় আনন্দ করার কথা ছিল, সেই রাতেই বহু পরিবারের ঘরে নেমে এল কান্নার রোল। ‘বাংলার দুর্গাপুজোর কালো দিন’ হিসাবে ২০২৬ সালের প্রথম সপ্তমীর গায়ে কলঙ্কের ছিটে লাগল। ভবিষ্যতের ক্যালেন্ডারে কালো দিন হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে রইল এই সপ্তমী।



