পরামর্শে এন আর এস মেডিকেল কলেজের ইএনটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ ইন্দ্রনীল খাটুয়া।
পরামর্শে এন আর এস মেডিকেল কলেজের ইএনটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ ইন্দ্রনীল খাটুয়া।
ঘটনা ১: মঙ্গলবার ভোরে আচমকা বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা আর ক্লান্তি নিয়ে হাসপাতালে ভরতি হলেন শ্যামলবাবু। রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেল তাঁর রক্তের পিএইচ স্বাভাবিক মাত্রার থেকে কিছুটা কম। চিকিৎসক জানালেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত অ্যাসিডিক খাবার আর জল কম খাওয়ার ফলে শরীরের পিএইচ বা অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য বিগড়েছে!
ঘটনা ২: দীর্ঘদিন গলা জ্বালা, মুখে ঘায়ের সমস্যায় ভুগছিলেন অবন্তিকা। পরে জানা গেল, মুখগহ্বরের পিএইচ বেশি অ্যাসিডিক হয়ে যাওয়ার ফলে এই সমস্যা!
পিএইচ কী?
পিএইচ-এর পুরো কথা পোটেনশিয়াল অব হাইড্রোজেন বা পাওয়ার অব হাইড্রোজেন। পিএইচ-৭-এর নীচে হলে তা অ্যাসিডিক। ৭ হলে নিরপেক্ষ। ৭-এর উপরে হলে ক্ষারীয়। মানুষের রক্তের স্বাভাবিক পিএইচ ৭.৩৫ থেকে ৭.৪৫। পিএইচ-এর উপরই নির্ভর করে এনজাইমের কার্যকারিতা, কোষে অক্সিজেন সরবরাহ, বিপাকক্রিয়া ইত্যাদি।
পিএইচ- এর তারতম্যে কী ঘটে?
পিএইচ ৭.৩৫-এর নীচে নেমে গেলে তাকে অ্যাসিডোসিস বলা হয়। এর জেরে ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা যায়। পিএইচ ৭.৪৫-এর উপরে গেলেও অ্যালকালোসিস হয়। প্রচুর বমি, বেশি অ্যান্টাসিড খেলে এমন হতে পারে।
রক্ত কীভাবে পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করে?
রক্তের বাফার সিস্টেম (পিএইচ-এর তারতম্য হলে দেহের ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া), ফুসফুসের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ও কিডনির মাধ্যমে অ্যাসিড নিঃসরণের সাহায্যে রক্তে স্বাভাবিকভাবে পিএইচ-এর ভারসাম্য বজায় থাকে।
নাক-কান-গলায় পিএইচ
অতিরিক্ত চিনি বা শর্করাযুক্ত খাবার, সফট ড্রিঙ্কস, কফি, মদ্যপান, ঘন ঘন স্ন্যাকস খাওয়া এবং দাঁতে প্লাক জমার ফলে মুখগহ্বরের পিএইচ কমে যায়। এই অবস্থায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়। ক্যাভিটি তৈরি হয়। মাড়ির রোগ দেখা দেয়। মুখে দুর্গন্ধ হয়।
লালারস মুখের পিএইচ ঠিক রাখতে অপরিহার্য। লালারস কমে গেলেও মুখের ভিতরের অংশ শুষ্ক হয়ে যায়। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পর্যাপ্ত জল পান জরুরি। খাদ্যাভ্যাস এবং টুথপেস্টও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখের পিছনে অবস্থিত ফ্যারিংক্স এবং ল্যারিংক্স বা স্বরযন্ত্রেও পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবে এই অংশগুলোর পিএইচ থাকে প্রায় ৭.০ থেকে ৮.০-এর মধ্যে। কিন্তু যখন পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরের দিকে উঠে আসে, তখন গলার পিএইচ আচমকা কমে যায়। এই অবস্থাকে ল্যারিঙ্গোফ্যারিঞ্জিয়াল রিফ্লাক্স বলে। এর ফলে দীর্ঘক্ষণ কাশি হয়, গলা ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন পিএইচ-এর তারতম্য হলে ফ্যারিঞ্জাইটিস, ল্যারিঞ্জাইটিস, ভোকাল কর্ডে সমস্যা, সিস্ট তৈরি হতে পারে। বাড়ে ক্যান্সারের আশঙ্কাও।
পিএইচ-এর তারতম্য বোঝার উপায়
উপরিউক্ত লক্ষণগুলি দেখা দিলে সতর্ক হন। অবশ্যই ইএনটি চিকিৎসক বা গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের পরামর্শ নিন। ২৪ ঘণ্টার পিএইচ মনিটরিং পরীক্ষায় সমস্যা আছে কি না তা জানা যায়। মনে রাখবেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত জল পান, মুখের পরিচ্ছন্নতা এবং শরীরের প্রতি সচেতনতাই পারে অসুখ দূরে রাখতে। মুখের শুষ্কতা, দুর্গন্ধ, বারবার গলা ব্যথা বা স্বরের পরিবর্তন কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। সাধারণ সমস্যা থেকেও বড় জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত