নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত ও সংবাদদাতা, বনগাঁ: ক্ষমতা ‘দখল’ নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থিত মতুয়াদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে। লড়াই আছে শান্তনুর সঙ্গে মমতা ঠাকুরের। এবার সেই লড়াই সামনে এল শান্তনু ও তাঁর দাদা সুব্রতর মধ্যেও। ফলে ঠাকুরবাড়ির লড়াই এবার ত্রিমুখী! মতুয়া মহাসংঘের সংঘাধিপতি শান্তনুর সঙ্গে মহাসংঘাধিপতি সুব্রতর দখলদারি নিয়ে দ্বন্দ্ব এতদিন তুষের আগুনের মতো জ্বলছিল। রবিবার সেই আগুনটাই দপ করে জ্বলে উঠল। তাও ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে। স্বাভাবিকভাবে বিষয়টি যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিকমহল।
নাগরিকত্বের ক্যাম্প চলছে মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে। এনিয়ে বিজেপি সাংসদ ও বিধায়কের দ্বন্দ্ব ক্রমশ ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। সেটা মেটাতে বিজেপির বিধায়ক দ্বারস্থ হলেন তৃণমূল সাংসদের কাছে, যিনি ছিলেন একদা ‘প্রবল প্রতিপক্ষ’। রবিবার থেকে এনিয়ে জোর চর্চা চলছে বনগাঁর ঠাকুরনগরে। এসআইআর বাংলায় চালু হওয়ার খবর সামনে আসতেই বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মতুয়াদের মধ্যে শোরগোল তৈরি হয়। একে হাতিয়ার করেই ময়দানে নেমে পড়েন বনগাঁর সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর ও তাঁর দাদা বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। তাঁরা পৃথকভাবে ক্যাম্প চালাচ্ছেন। টাকার বিনিময়ে মতুয়া কার্ড ও ধর্মীয় শংসাপত্র দেওয়া হচ্ছিল। বিপত্তি ঘটল নিজের বাড়ির সামনে থেকে সেই ক্যাম্প শান্তনু ঠাকুর সরিয়ে নাটমন্দিরে নিয়ে যাওয়ায়। বিরোধিতা করেন গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। সুব্রতর হয়ে নেমে পড়েন মা ছবিরানি ঠাকুরও। শান্তনুর পাশাপাশি ঠাকুরবাড়িতে সুব্রতরও সমান অধিকারের দাবি নিয়ে ছবিরানি সওয়াল করেন শান্তনুর কাছে। দু’জনে মিলেমিশে ক্যাম্প করার পরামর্শ দেন তিনি।
কিন্তু এমন পরামর্শ শুনেই রেগে গিয়ে মাকে অপমান করেন বলেই অভিযোগ উঠেছে শান্তনু ঠাকুরের বিরুদ্ধে। এই আবহে ছবিরানি দ্বারস্থ হন তাঁর বড়জা তথা তৃণমূল সাংসদ মমতা ঠাকুরের কাছে। বিষয়টি নিয়ে মমতা ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলেন বিপরীত রাজনীতির মেরুতে অবস্থানকারী সুব্রত নিজেও। মমতা অবশ্য ঠাকুরবাড়ি থেকে সংগঠনের অধিকারের প্রশ্নে সুব্রতর পাশেই দাঁড়িয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক চর্চাও শুরু হয়েছে। যদিও গোটা বিষয়টিতে ছিলেন না সুব্রত ও শান্তনুর বাবা মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর। তিনি এখন দিল্লিতে রয়েছেন।
ছবিরানি বলেন, বড় ছেলে হিসেবে ঠাকুরবাড়িতে ও সংগঠনের কাজে অধিকার আছে সুব্রতরও। কিন্তু শান্তনু অধিকার কুক্ষিগত করে রেখেছে। কয়েকজন পেটোয়া লোককে সামনে রেখে সব ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছে। অসহায় হয়ে বিচার চাইতে আমি বড়জায়ের কাছে গিয়েছি। তাঁকে সবটা বলে তাঁর মতামত জানতে চেয়েছি। উনি জানিয়েছেন সুব্রতরও অধিকার আছে। এদিকে সুব্রত বলেন, নাটমন্দিরে মতুয়া কার্ড ও ধর্মীয় শংসাপত্র দেওয়ার শান্তনুর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করি। এজন্য মাকে অপমান করেছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের ক্ষমতার জোরে ‘থ্রেট কালচার’ ঠাকুরবাড়িতে চালু করেছেন শান্তনু ঠাকুর। তাঁর মদতে ঠাকুরবাড়িতে দালালরাজ চলছে। মমতা ঠাকুর আমার জেঠিমা। প্রথমে পরিবার, পরে রাজনীতি। মতুয়াদের কীভাবে ভালো হয়, একচ্ছত্র ক্ষমতা বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে আমি জেঠিমার সঙ্গে কথা বলেছি। রাজনীতি পরিবর্তন করা প্রশ্নে সুব্রত বলেন, সেটা তো পরিবর্তনশীল। পাল্টা শান্তনু ঠাকুর বলেন, সুব্রত ঠাকুর শুধুমাত্র তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করার জন্যই এই নাটক করেছেন। শুধু অপেক্ষা তৃণমূলের ঝান্ডাটা ধরার। বিজেপিতে থাকলে বিধায়ক থেকে মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেটা তৃণমূলেই হতে পারে। তার জন্য এই নাটক।
এদিকে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতা ঠাকুর বলেন, শান্তনু-সুব্রতর মা আমার ছোটজা। শান্তনুর কাছ থেকে অপমানিত হয়ে আমার কাছে এসে তিনি কান্নাকাটি করেছেন। শান্তনু ঠাকুর কোনও অধিকার সুব্রতকে দিচ্ছে না বলেই আমাকে বলে। আমি বলেছি, অধিকার অবশ্যই রয়েছে সুব্রত ঠাকুরের। মতুয়া কার্ড, ধর্মীয় শংসাপত্র দেওয়ার জন্য কেন ভক্তদের নাটমন্দির ব্যবহার করা হবে? মতুয়াদের জন্য যদি এতই দরদ, তাহলে তো বিনাপয়সাতেই সেগুলি দিতে পারত শান্তনু ঠাকুর।