Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সংগঠনের নাম এসআইআর?

আর হপ্তাখানেক। টেনশনের হাওয়া হাড় কাঁপাল বলে। ওই যে, খসড়া তালিকা বেরবে! আর সেইসঙ্গে হাওয়ায়-বাতাসে উড়ে বেড়াবে বেশ কিছু কমন প্রশ্ন। যেমন, ১) ‘ও মশাই, নোটিশ পেলেন নাকি?’ ২) আমি তো ইনিউমারেশন ফর্ম জমা করেছিলাম। তাও খসড়া তালিকায় নাম নেই কেন? ৩) ও দাদা, নোটিশ এসেছে।

সংগঠনের নাম এসআইআর?
  • ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: আর হপ্তাখানেক। টেনশনের হাওয়া হাড় কাঁপাল বলে। ওই যে, খসড়া তালিকা বেরবে! আর সেইসঙ্গে হাওয়ায়-বাতাসে উড়ে বেড়াবে বেশ কিছু কমন প্রশ্ন। যেমন, ১) ‘ও মশাই, নোটিশ পেলেন নাকি?’ ২) আমি তো ইনিউমারেশন ফর্ম জমা করেছিলাম। তাও খসড়া তালিকায় নাম নেই কেন? ৩) ও দাদা, নোটিশ এসেছে। কোথায় যেতে হবে একটু বলে দিন না! আর কী কী কাগজ নিতে হবে? ৪) নাম বাদ চলে গেলে কি আবার নতুন করে অ্যাপ্লাই করতে হবে? নতুন ভোটার হিসেবে? ৫) কত লাখ বাদ গেল শেষ পর্যন্ত? 

Advertisement

ভোটার তালিকা সংশোধন তো নয়, যেন হরর মুভি! দিনে বুক ধড়ফড় করছে। রাতেও ঘুম নেই। ভোটার কার্ড নিয়ে এমন অবস্থা জন্মে হয়নি। ভোটে কী হবে, কে কটা আসন পেতে পারে, ভোটের ইশ্যু কী হবে... অন্যবার প্রশ্নগুলো এই সময়ের মধ্যে পাক খেতে শুরু করে দেয়। অন্তত ‘রাজনীতি সচেতন’ বাংলাতে তো বটেই। এবার আর সেসবের বালাই নেই! আলোচনার এপিসেন্টার একটাই—এসআইআর। আগে নাম উঠুক, তারপর তো ভোট দেব! এখনই শোনা যাচ্ছে, প্রায় ৬০ লক্ষ নাম নাকি বাদ পড়তে চলেছে। এরা সবাই হয় মৃত, না হলে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। আর নোটিশ পাবে আরও প্রায় ৫০ লক্ষ। প্রশ্ন হল, এই বিপুল সংখ্যার ঝুড়িতে আমার-আপনার নাম থাকবে কি না। আর তার থেকেও বড়ো প্রশ্ন, এই এত ভোটার বাদ যাওয়ার সুবিধা কোন পার্টি নেবে? এতগুলো যদি নাম বাদ যায়, তাহলে নিশ্চয়ই শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক খালি হবে না। বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেসেরও হবে। যেহেতু তৃণমূল শাসক দল এবং তাদের ভোটপ্রাপ্তির হার সবচেয়ে বেশি, খুব স্বাভাবিকভাবেই বেশি সংখ্যক ভোটার তারাই হারাবে। এটা একেবারে পাটিগণিতের হিসেবে। আবার যেমন মতুয়া ভোট। গত কয়েকটা নির্বাচন ধরে এই একটা অংশকে স্রেফ নাগরিকত্বের টোপ সামনে ঝুলিয়ে সমর্থন আদায় করে চলেছে বিজেপি। গোটা রাজ্যে দু’লক্ষের কাছাকাছি এই শ্রেণির ভোট রয়েছে। তার ৭০ শতাংশই বিজেপি পেয়ে থাকে। এবার তো কাগজের গেরোয় মতুয়া মানুষদের ভোটও বাদ যাওয়া উচিত! অন্তত নিয়ম তাই বলে। তাঁরা ইনিউমারেশন ফর্ম পেয়েছেন, অনেকে ফিল আপও করেছেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, নোটিশ পেলে কী দেখাবেন। একটা বড়ো অংশ আবার সিএএ’র আশায় বসে আছেন। সে কাজও জোরকদমে চলছে বলেই শোনা যাচ্ছে। মানে, নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া। মতুয়া সম্প্রদায়ের সেই অংশটি ভাবছে, এই তো নাগরিকত্ব পেয়ে যাব। তারপরই পূরণ করে দেব ৬ নম্বর ফর্ম। দু’মাসের মধ্যে নাম উঠে যাবে ভোটার তালিকায়। কিন্তু সেটা কি সত্যিই সম্ভব হবে? এই প্রশ্ন থাকছে। কারণ, মতুয়াদের ভোটাধিকার দেওয়া হবে কি না, তা পুরোটাই ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন। তবে নিন্দুকের নিন্দা সঠিক হলে, বিজেপির স্বার্থমতো মতুয়ারা ভোটাধিকার পেয়েই যাবেন। আর সিএএ’র কঠিন কঠিন শর্তও সেক্ষেত্রে বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার সহজ করে দেবে। তারপর ভোটার তালিকায় নাম। 
অর্থাৎ, পুরোটাই সিড়ি ভাঙা অঙ্কের মতো। একটা সুতোর সঙ্গে আর একটা বাঁধা। ঠিক এই কারণেই বিজেপির বি টিম হিসেবে বারবার অভিযোগ উঠছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। একমুখী এজেন্ডা— এসআইআর। বাংলায় এত বছরেও যে বিজেপির সংগঠন মজবুত হয়নি, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। ৯৪ হাজার বুথে দলীয় স্বার্থে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো কর্মী তাদের নেই। ঘরে ঘরে জনসংযোগ যদি তাদের হয়ে কেউ করে থাকে, সেটা আরএসএস। তাও গ্রামাঞ্চলে। শহরের নাগরিকরা এমন কতজন সংঘ কর্মীকে চেনেন প্রশ্ন করা হলে, উত্তর হাতড়াতে হবে। তাহলে ভোট উতরাবে কীভাবে? বিরোধীরা বলছে, এসআইআর। বলছে বলা ভুল, আশঙ্কা করছে। এই অঙ্ক মোটেও মাঠেঘাটে হবে না। সবটাই ঠান্ডা ঘরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই অভিযোগ করেছেন, বিজেপি পার্টি অফিসে বানানো তালিকা ধরে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ঙ্কর একটা অভিযোগ। তার পক্ষে যুক্তিও আছে তৃণমূল সুপ্রিমোর। তিনি বলছেন, এমনটা না হলে গেরুয়া শিবিরের নেতারা কীভাবে এসআইআর শুরুর এক মাস আগে বলতে পারেন যে, বাংলায় ১ কোটির উপর নাম বাদ যাবে? ইতিমধ্যেই কিন্তু প্রায় ৫৫ লক্ষ নাম বাদ যাওয়াটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। কমিশনের হিসেব বলছে, এরা হয় মৃত, না হলে স্থানান্তরিত। এছাড়া একটা অংশের খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর নোটিশ কতজন পেতে চলেছেন? অন্তত ৪০ লক্ষ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি খুব ভুল আশঙ্কা করেছেন? বঙ্গ বিজেপির প্রচারও লক্ষ করার মতো। তারা শুধু এসআইআর নিয়ে ভয়টুকুই দেখিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, তৃণমূল সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতা। ভোটে জিতে এলে কে মুখ হবেন, কোন কোন ক্ষেত্রে রাজ্যের উন্নতি তারা করবে, কোন কোন প্রকল্পে জোর দেবে... এমন কোনও প্রচারই তাদের মধ্যে থেকে উঠে আসছে না। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া থাকলেও বিরোধীরা কখন ভোটারদের কাছে মূল্য পায়? যখন তারা দেখে, বিকল্প প্রস্তুত। কিন্তু বিরোধীদের মধ্যে কোনও গ্রহণযোগ্য মুখ না থাকলে, বা বিশ্বাসযোগ্য কোনও প্রতিশ্রুতি না পাওয়া গেলে সাধারণত আম ভোটারকুল সরকার ফেলতে চায় না। কারণ তারা জানে, এখন যতটা পাওয়া যাচ্ছে, সরকার উলটে গেলে ততটুকু প্রাপ্তিরও কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাহলে ভোটে কীভাবে জেতা যাবে? অঙ্ক কষে। মেশিনারি কাজে লাগিয়ে। বিজেপি এবং কমিশনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে তো আর গেরুয়া ব্রিগেডকে প্রচারই করতে হবে না! তার দরকারই পড়বে না। শুধু বাংলা নয়, যে কোনও রাজ্যে। যখনই ভোট আসবে, এভাবে নিজেদের আসন এবং ভোট ব্যাংক সাজিয়ে নেবে কেন্দ্রের শাসক। সবটাই হবে নিয়মের গণ্ডির ভিতর। আইন মেনে। সাধারণ মানুষ তো দূরঅস্ত, রাজনৈতিক দলগুলিও কিছু প্রমাণ করতে পারবে না। আমাদের পরমপুজ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হয়ে উঠবেন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। চীনের মতো একনায়কের সিংহাসন পেতে আত্মপ্রকাশ করবে নতুন ভারত। ইতিহাস শুধু নয়, বদলে যাবে সংবিধানও। কারণ, একে তখন আর গণতন্ত্র বলা যাবে না। আর অতটাও যদি না হয়? উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ তো আছেই। বছরের পর বছর নির্বাচন হবে না। বিরোধীরা কণ্ঠরুদ্ধ অবস্থায় সংসদ নামক ‘মন্দিরে’র এক কোণায় পড়ে থাকবে। বছরের পর বছর দেখবে, শুনবে, সহ্য করবে সাধারণ মানুষ। কিন্তু হ্যাঁ, সবটাই নিয়ম মেনে। 
একটা কথা ঠিক, তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা বামেরাও বসে নেই। তারাও বিলক্ষণ বুঝছে এই সমীকরণ। বিজেপির সংগঠনের নাম এসআইআর হতে পারে, কিন্তু মাঠেঘাট আঁকড়ে পড়ে থাকার সংগঠনটা তৃণমূলের আছে। এমনকী বামেরাও একেবারে হারিয়ে ফেলেনি। তাই হিসেব রাখছে তারাও। প্রত্যেক বুথে। মানুষের মধ্যে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বলছে সতর্ক থাকতে। মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের বিষয়ে কিছু করার নেই। তারা বাদ যাওয়ার ছিল। বাদ যাবেও। কিন্তু বাংলার বিপুল যে অংশটা আগামী সপ্তাহে নোটিশ পেতে শুরু করবেন, তাঁদের স্বার্থের সঙ্গেই এখন তৃণমূল ও বামেদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, মিলেমিশে গিয়েছে রাজ্যের স্বার্থ। বিজেপি জানে, তাদের কিছু হারানোর নেই। শেষ একটা কামড় তারা দেওয়ার লক্ষ্যে নেমেছে। বঙ্গ বিজেপির নেতারা তো বটেই, দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বও এখন সাইলেন্ট মোডে চলে গিয়েছে। অপেক্ষায় রয়েছে তারা এসআইআরের পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের। এখন তাদের কাজের সময় নয়। এসআইআর নামক ‘সংগঠন’ এখন বুথে বুথে ডালপালা বিস্তার করছে। ভোটার তালিকা বেরনোর পর ফল কুড়ানোর কাজটা শুধু বিজেপি করতে চায়। আর হ্যাঁ, সবটাই ‘নিয়ম মেনে’। দেখে মনে হবে, খেলা আছে। কিন্তু প্রমাণ করা যাবে না। গেরুয়া শাসক একগাল হেসে বলবে, কাকতালীয়। ঠিক যেভাবে আমাদের মোদিজির এক পরম কর্পোরেট বন্ধু দেশের সবচেয়ে বড়ো পাইলট ট্রেনিং স্কুল ৮২০ কোটি টাকা দিয়ে অধিগ্রহণের তিনদিনের মধ্যে নির্দেশিকা জারি হল ডিজিসিএ’র। তাতে বলা হল, বিমানচালকদের ৩৬ ঘণ্টা নয়, ৪৮ ঘণ্টা বিশ্রাম দিতে হবে। আর এই নির্দেশিকা কার্যকর করতে হবে অবিলম্বে। ধসে পড়ল ভারতের অন্তর্দেশীয় বিমান পরিষেবা। কারণ, ওই নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিমান চালানোর মতো পাইলট কোনও সংস্থার কাছেই নেই। যারা দিনে বেশি বিমান চালায়, তাদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। নিঃসন্দেহে সংস্থাটির নাম ইন্ডিগো। মানুষ খেপে গেল তাদের উপর। ভাঙচুর হল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিমানবন্দরের কর্মীরা ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনারের বদলে শুধু গালি খেলেন। কিন্তু মোদ্দা হিসেবটা কী দাঁড়াল? পাইলট চাই। ‘কর্মখালি’র একটা সেক্টর বাড়ল। আর ঝাঁকে ঝাঁকে যুবক-যুবতীরা আগ্রহী হলেন পাইলট ট্রেনিংয়ে। কোথায় যাবেন তাঁরা? এফএসটিসি। দেশের সবচেয়ে নামজাদা পাইলট ট্রেনিং সংস্থা। কাকতালীয়। তাই না? নাকি নেপথ্যে শুধুই ক্ষমতার দম্ভ?
শাসক ভুলে যায়, সময়ের চাকা কখনও থেমে থাকে না। মানুষ মেনে নেয়, সহ্য করে, ভোলার চেষ্টা করে... কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত। ছিটকে আসা একটি স্ফুলিঙ্গ বারুদের স্তূপে পড়া পর্যন্ত। বাংলাদেশ কিন্তু কয়েক ঘণ্টায় তাদের ক্ষোভের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল। ক্ষমতা দম্ভ শুধু নয়, তার ইতিহাস পর্যন্ত মুছে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল আম জনতা। জেন-জি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ। বয়স, ৩৫’এর নীচে। যারা কখনও ভোট দেওয়ার, নিজেদের মতামত জানানোর সুযোগ পায়নি। বঞ্চনাকে চাবুকের মতো পিঠে নিয়েছে। কিন্তু মুখ থেকে একটাও শব্দ বেরোয়নি। আম আদমি হিসেবে প্রার্থনা করি, ভারত যেন তেমন পরিস্থিতির শিকার না হয়। এই একই প্রার্থনা শাসকও করছে তো? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ