পাঁচালি মুখস্থ, কুমোরটুলিতে লক্ষ্মীর  সরা বিক্রি করেন ইকবাল-সেলিমরা
  • ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এ সময় কুমোরটুলিতে লক্ষ্মীর সরা বিক্রি করেন মহম্মদ ইকবাল। তাঁর কাছে সরা কিনতে গেলে দু-এক কলি লক্ষ্মীর পাঁচালি শুনিয়ে দেন। ইকবালের উচ্চারণ শুনে বোঝা যায়, পাঁচালির উপর তাঁর দস্তুরমতো দখল আছে, পুরোটাই মুখস্থ। ইকবাল একা নন। লক্ষ্মীর সরা বিক্রি করেন সেলিম রহমান, আবু হোসেনরাও। তাঁদের কেউ থাকেন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে। কেউ থাকেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে। তাঁরা এ সময় কলকাতায় আসেন। কুমোরটুলি, রবীন্দ্র সরণি, মদনমোহনতলা স্ট্রিট, বাগবাজারে বা কালীঘাটে ঘুরে ঘুরে সরা বিক্রি করেন। পাঁচালি শোনান। বাংলায় এরকম ইকবাল, সেলিমদের সংখ্যা কম নয়। এটাই নদী-নালা-সবুজে ঘেরা বাংলার জাদু।

Advertisement

ইকবালের সরার দাম ৩০০ থেকে শুরু ১২০০ টাকায় শেষ। সরায় অপূর্ব শিল্পকর্ম। ইকবালদের মুন্সিয়ানা ফুটে ওঠে তুলির প্রত্যেকটি টানে। তা মন টানে। চোখ টানে। মুগ্ধ করে। পুজোর আগে এক দুপুরে ইকবালের থেকে অনেকে সামান্য দরদাম করে সরা কিনলেন। সেলিম বললেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ন’টি সরা বিক্রি হয়েছে।’ রবিবার লক্ষ্মীপুজো। এখন পটুয়াপাড়া জমজমাট। লক্ষ্মী মূর্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের ছবি আঁকা লক্ষ্মীর সরা। অনেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পুজোর জন্য। অনেকে বাড়িতে সাজানোর জন্যও কেনেন।
মানিকতলার বাসিন্দা কলেজ পড়ুয়া সুজাতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এত সুন্দর সরা, চোখ ফেরানো দায়। তাই বাড়ির ছাঁচের লক্ষ্মী ঠাকুর কিনতে এসে সরা দেখে কেনার লোভ সামলাতে পারলাম না। তিনটে কিনলাম।’ কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা বলেন, ‘মূলত পূর্ববঙ্গের মানুষরা লক্ষ্মীর সরায় পুজো করেন। সরায় লক্ষ্মীর দু’পাশে তাঁর দুই সহচরী জয়া ও বিজয়া থাকেন। তার সঙ্গে থাকে ধানের শিস। লক্ষ্মীর হাতে থাকে গাছ কৌটো। সঙ্গে পেঁচা। আবার কোনো সরায় আঁকা নানা ধরনের আলপনা। আঁকা থাকে লক্ষ্মীর চরণ, ধানের গোলা প্রভৃতি।’ মৃৎশিল্পী সমর পাল, জবা পাল, চায়না পালরা জানান, ‘সরা বিভিন্ন ধরনের হয়। উল্লেখযোগ্য হল‑ফরিদপুরী, সুরেশ্বরী, গণকা ও আচার্যী সরা প্রভৃতি।’ মৃৎশিল্পী সংগঠনের কর্তা বাবু পাল বলেন, ‘লক্ষ্মীর সরার আলাদা চাহিদা আছে। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে সরার গুরুত্ব অসীম। সরা ঘিরে মুখে মুখে ফেরে বিভিন্ন লোকগান। যা এখনও গ্রামীণ মেলাগুলিতে গেলে শোনা যায়।’ 
ইকবালরা এই উত্তরাধিকারই বহন করে চলেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তাঁদের মতো মানুষদের হাতেই বেঁচে বাংলার ঐতিহ্য। বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি।