স্বামী আত্মবোধানন্দ: মহালয়া বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনাকে কেন্দ্র করে মহালয়া একদিকে পূর্বপুরুষের স্মরণ ও তর্পণের দিন, অন্যদিকে জগজ্জননীর আবাহনের প্রারম্ভকাল। ফলে এর মধ্যে এক আশ্চর্য সমন্বয় দেখা যায়— অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ, পিতৃস্মরণ এবং শক্তির আরাধনা, মৃত্যুচেতনা ও অমৃতের সন্ধান।
মহালয়ার প্রভাতে যখন চণ্ডীপাঠের ধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যেন মানুষের অন্তরেও একটি আহ্বান জেগে ওঠে—‘মা, এসো।’ কিন্তু এই ‘এসো’ কেবল মৃন্ময় প্রতিমার উদ্দেশে নয়। এটি অন্তরের শক্তিকে জাগ্রত করার আহ্বান। দেবী সর্বত্র বিরাজমান— তাঁকে বাইরে থেকে এনে প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং নিজের চেতনায় তাঁর উপস্থিতিকে উপলব্ধি করাই প্রকৃত আবাহন। মানুষের অন্তরে যে অজ্ঞান, ভয়, দুর্বলতা, অহংকার, লোভ, ক্রোধ ও হিংসা— এই প্রবৃত্তিগুলিই যেন অন্তরের মহিষাসুর। মহালয়া তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দেবীর আগমন মানে নিজের ভিতরের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা।
দেবী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে অশুভ শক্তিকে দমন করেন— এই কাহিনির ভীর অন্তর্মুখী ব্যাখ্যাও রয়েছে। আমাদের ভিতরের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার ও হিংসাই যেন সেই মহিষাসুরের বিভিন্ন রূপ।
পিতৃপক্ষেই কেন তর্পণ করা হয়? তর্পণের অর্থ কী? শ্রাদ্ধ বলতে কী বোঝায়? শ্রাদ্ধ হল কর্মকাণ্ড আর তর্পণ হল স্মরণ-কাণ্ড। ‘তর্পণ’ শব্দের অর্থ তৃপ্তি। স্নিগ্ধ, সজল স্মরণই হল তর্পণ। এক কথায় ‘মহা আলয়ে’ শক্তির দুর্গে প্রবেশই হল তর্পণ। পিতার পিতা তস্য পিতা।— এই ভাবটি অবলম্বন করে, পিতৃপুরুষের বাহিনীকে বিশেষভাবে স্মরণ করার নামই তর্পণ। মন্ত্রের মাধ্যমে তর্পণকারীর মন সমগ্র ভারতের সমস্ত তীর্থ প্রদক্ষিণ করে আসবে। বিষ্ণুকে স্মরণ করার মাধ্যমে তাঁকেই সাক্ষী রেখে, সমস্ত তর্পণ ক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে তাঁরই চরণে সমর্পণ করতে হয়। তর্পণে পাঁচটি তীর্থকে আবাহন করতে হয়— কুরুক্ষেত্র, গয়া, গঙ্গা, প্রভাস ও পুষ্কর।
‘তর্পণ’ শব্দের মূল অর্থ তৃপ্তি সাধন বা সন্তুষ্ট করা। জল ও তিল প্রভৃতি অর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে পিতৃঋণ-স্বীকারের চেতনা।
পুরাণে আমরা দেখতে পাই, শ্রীরামচন্দ্রের অনুজ লক্ষ্মণ নদীর তীরে তর্পণ করছেন। তিনি একটি পা জলে অপর পা স্থলে রেখে মন্ত্র পাঠ করছেন— ‘ওঁ আব্রহ্ম স্তম্ব পর্যন্তং জগৎ স্তৃপ্যতু’। মন্ত্রটির অর্থ— স্তম্ব মানে তৃণ। এই জল-অঞ্জলিতে আব্রহ্ম, বিশ্ব-মহাবিশ্ব থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তৃণ পর্যন্ত তৃপ্ত হোক।
ভক্ত-ভৈরব গিরিশচন্দ্র ঘোষ বাগবাজার গঙ্গার ঘাটে এই মন্ত্র পাঠ করেই পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অঞ্জলি নিবেদন করেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গার জলে পিতৃপুরুষদের জলদানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অঞ্জলিতে জল রাখতে পারছেন না। আঙুলের ফাঁক দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে। হলধারীকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, “তোমার ‘গলিতহস্ত’, ওই হাতে আর ধরা নেই। শুধু ‘ছাড়াটাই আছে’।” ঘটনাটি তাঁর জীবনে বৈদিক আচারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উচ্চতর আধ্যাত্মিক অবস্থার এক বিশেষ সম্পর্কের দিক নির্দেশ করে।



