কৃষ্ণ-কালী: দুই মতের দুই রূপ
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বামী সুমেধানন্দ ব্রহ্মচারী: বৈষ্ণব ও শাক্ত দর্শনের অনন্য নিদর্শন হল শ্রীকৃষ্ণের কালীরূপ। বাংলার লোকসংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং পদাবলি সাহিত্যে এই রূপের নানান দৃষ্টিকোণ থেকে বিদগ্ধ পণ্ডিত থেকে সাধক সকলেই বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বে দু’টি ধারা যুগ যুগ ধরে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়ে এসেছে— একটি বৈষ্ণব এবং অপরটি শাক্ত। এক পক্ষে আছেন প্রেমময় শ্রীকৃষ্ণ; অন্য পক্ষে খড়্গধারিণী মুক্তকেশী দক্ষিণাকালী। আপাতদৃষ্টিতে এই দু’টি রূপের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। একজন প্রেমের আরাধ্য, অন্যজন শক্তির দেবী। একজন শান্ত, মধুর; অন্যজন উগ্র ও সংহারক। একজন পুরুষ, অন্যজন প্রকৃতি। কিন্তু বাংলার সাধক, কবি এবং লোকায়ত সমাজ এই দুই বিপরীত মেরুকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছেন। এই মিলন বিন্দুরই নাম কৃষ্ণকালী বা কৃষ্ণের কালীরূপ ধারণ। এটি আবার অদ্বৈত দর্শনের আভাস, যেখানে প্রেম ও শক্তি, মধুর ও ঐশ্বর্য এক হয়ে গিয়েছে।

Advertisement

কৃষ্ণের কালীরূপ ধারণের পেছনে যে কাহিনিটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তা শ্রীরাধিকা, শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার স্বামী আয়ান ঘোষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
শ্রীকৃষ্ণপদে সমর্পিতা শ্রীরাধিকা সমস্ত নিয়ম-কানুন, লোকলজ্জা বিসর্জন দিয়ে কৃষ্ণের টানে অভিসারে যান। কিন্তু এটিকে সহজভাবে গ্রহণ করেননি অনেকেই। বিশেষ করে রাধার ননদ জটিলা আর কুটিলা সর্বদা রাধার দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াত। সুযোগ পেলেই আয়ান ঘোষের কান ভাঙাত। আয়ান ছিলেন কালীর ভক্ত। তিনি কৃষ্ণকে একেবারেই পছন্দ করেন না। জটিলা-কুটিলার প্ররোচনায় আয়ান একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি রাধাকে কৃষ্ণের সঙ্গে হাতেনাতে ধরবেন এবং তারপর যা করার তাই করবেন।
সেদিন নিভৃত নিকুঞ্জে রাধা ও কৃষ্ণ যখন একত্র হয়েছেন, ঠিক তখনই কুটিলার সংকেত পেয়ে আয়ান ক্রোধোন্মত্ত হয়ে ছুটলেন। রাধা দূর থেকে আয়ানের পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। বুঝতে পারলেন আজ যদি ধরা পড়েন, তবে সমাজ তাকে কলঙ্কিনী বলে ত্যাগ করবে। কৃষ্ণের প্রাণও সংকটে পড়তে পারে। রাধা তখন কাতর হয়ে কৃষ্ণের কাছে মান ও প্রাণ রক্ষার জন্য প্রার্থনা করতে লাগলেন।
ভক্তের ব্যাকুলতা দেখে লীলাময় শ্রীকৃষ্ণ মুচকি হাসলেন। তিনি রাধাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ভয় পেও না রাধে, তোমার মান আমি রক্ষা করব।’ বলতে বলতেই শ্রীকৃষ্ণ নিজের ত্রিভঙ্গমুরারি রূপ পরিবর্তন করলেন। তাঁর হাতের মোহনবাঁশি হয়ে গেল তীক্ষ্ণ খড়্গ। মাথার ময়ূরের পুচ্ছ রূপান্তরিত হল জটাজাল ও মুকুটে। পীতবসন পরিবর্তিত হল কৃষ্ণ বসনে। গলার বৈজয়ন্তী মালা হয়ে গেল মুণ্ডমালা। আর শ্যামবর্ণ ধারণ করল করালবদনা, রক্তলোচনা মা কালীর রূপ। কৃষ্ণ নিকুঞ্জের মাঝে কালীরূপে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং রাধা জবার মালা হাতে দেবী কালীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার ভঙ্গিতে বসে পড়লেন।
আয়ান ঘোষ নিকুঞ্জে প্রবেশ করলেন, তিনি যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দেখলেন, তাঁর সাধের আরাধ্য চিরপ্রণম্য মা কালী স্বয়ং সেখানে আবির্ভূত হয়েছেন এবং রাধিকা পরম ভক্তিতে মায়ের পুজো করছেন। এই দৃশ্য দেখে আয়ানের ক্রোধ ভক্তি ও আনন্দে রূপান্তরিত হল। তিনি লাঠি ফেলে দিয়ে ভূমিতে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে উচ্চৈঃস্বরে ‘জয় মা কালী’ বলে কাঁদতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণের এই লীলার মাধ্যমে রাধার সতীত্ব ও মান রক্ষা পেল, আবার আয়ান ঘোষের মতো শাক্ত ভক্তের বিশ্বাসও অক্ষুণ্ণ রইল। এই রূপই বাংলায় ‘কৃষ্ণকালী’ নামে প্রসিদ্ধ লাভ করে।
কৃষ্ণ এবং কালীর রূপের মধ্যে বাহ্যিক বৈপরীত্য থাকলেও প্রতীকী অর্থে পরস্পরের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। প্রাচীন সাধকেরা দেখিয়েছেন যে, এই দুই রূপ আসলে একই পরমতত্ত্বের দু’টি দিক।
শ্যাম ও শ্যামা 
শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রং শ্যাম বা মেঘবরণ। মা কালীও শ্যামা, অর্থাৎ ঘন কৃষ্ণবর্ণা বা নীলবর্ণা। এই কালো বা নীল রং গভীরতার প্রতীক। অনন্ত আকাশ কিংবা গভীর সমুদ্রের কোনো নির্দিষ্ট রং হয় না, তা দূর থেকে নীল বা কালো দেখায়। ঈশ্বরও তেমনই অনন্ত এবং অসীম, তাই তাকে প্রকাশ করতে এই কৃষ্ণবর্ণ বা শ্যামবর্ণ এই দুই রং দুই বর্ণ এসে মিলিত হয়েছে।  
অলংকার ও অস্ত্রের রূপান্তর
কৃষ্ণের হাতে আছে বাঁশি, নিঃসৃত হয় প্রেমের সুর। এই সুর মানুষকে জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করে ঈশ্বরের দিকে আকর্ষণ করে। কালীর হাতে খড়্গ, যা মানুষের অহংকার, অজ্ঞানতা এবং পশুবৃত্তিকে ছেদন করে। বাঁশি যেখানে হৃদয়ের কোমল বৃত্তিকে জাগ্রত করে, খড়্গ সেখানে কঠোর সাধনার মাধ্যমে অজ্ঞানতা দূর করে। কৃষ্ণের মাথার ময়ূরপুচ্ছ কালীর করাল মুকুটে পরিণত হয়, যা ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতিত্বের প্রতীক। কৃষ্ণের গলার বনমালা কালীর গলায় নরমুণ্ডমালা হয়ে ওঠে। এই মুণ্ডমালা আসলে পঞ্চাশটি মাতৃকা বর্ণের (বর্ণমালার) প্রতীক।
কদমবৃক্ষতলা বনাম মহাশ্মশান
কৃষ্ণলীলার প্রধান কেন্দ্র হল বৃন্দাবনের যমুনা তীরবর্তী কদমতলা, যা আনন্দ, মাধুর্য ও উৎসবের প্রতীক। অন্যদিকে কালীর বাস মহাশ্মশান। এটি হল বৈরাগ্য, ধ্বংস এবং সৃষ্টির অন্তিম পরিণতির প্রতীক। কিন্তু আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিচার করলে, মানুষের হৃদয় যখন সমস্ত জাগতিক বাসনা ও অহংকার পুড়িয়ে শ্মশান হয়ে যায়, তখনই সেখানে মা কালীর আগমন ঘটে। আবার সেই শুদ্ধ হৃদয়েই রাধাকৃষ্ণের নিত্য রাসলীলা সম্ভব। অতএব, কদমতলা এবং মহাশ্মশান আসলে মানুষের মনের দু’টি ভিন্ন স্তরের প্রতীক মাত্র।
পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদলোপ
সনাতন দর্শনে কৃষ্ণ হলেন পরম পুরুষ এবং রাধা বা কালী হলেন আদ্যাশক্তি প্রকৃতি। কৃষ্ণকালী রূপে পুরুষ ও প্রকৃতির এই ভেদরেখা মুছে যায়। কৃষ্ণ যখন কালী হন, তখন তিনি দেখান যে পরমেশ্বরের নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গ নেই। তিনি যেমন পুরুষ, তেমনই তিনি নারী; আবার তিনি এই সমস্ত কিছুর অতীত।
পদাবলি সাহিত্যে ও সাধকদের দৃষ্টিতে কৃষ্ণকালী
বাংলার সাধক কবিরা, বিশেষ করে রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত এবং পরবর্তীকালের বহু কবি কৃষ্ণ ও কালীর এই অভেদ তত্ত্বকে তাদের গানের মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটিয়েছেন।
কৃষ্ণের হাতে মোহন বাঁশি এবং কালীর হাতে খড়্গ— এগুলো লীলার প্রয়োজনে অস্ত্রের পরিবর্তন মাত্র, মূল সত্তা এক।
শাক্ত সাধকেরা কালীকে শুধু সংহাররূপিণী হিসেবে দেখেননি, তাঁরা মায়ের মধ্যে কৃষ্ণের মতো মধুর ভাবও খুঁজে পেয়েছেন। তারা বলেন, ‘কালী হল কৃষ্ণ বরণ, কৃষ্ণ হল কালী।’ রাধাপ্রেমের ব্যাকুলতা এবং কালীর প্রতি সন্তানের আকুলতা— এই দুইয়ের মধ্যে কোনো তফাত নেই। দুই ভাবই ভক্তকে অহংকারমুক্ত করে ঈশ্বরের চরণে নিয়ে যায়।
উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে শাক্ত ও বৈষ্ণবদের মধ্যে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব ছিল। বৈষ্ণবরা অহিংস, নিরামিষাশী এবং প্রেমের উপাসক; অন্যদিকে শাক্তরা ছিলেন শক্তির উপাসক এবং অনেক সময় বলিদানের মতো আচার পালন করতেন। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘কৃষ্ণকালী’ তত্ত্বটি এক বিরাট বিপ্লব ঘটিয়েছিল। লোককবি এবং উদারপন্থী সাধকরা এই রূপের মাধ্যমে প্রচার করলেন, তোমরা যারা কৃষ্ণকে ডাকছ আর তোমরা যারা কালীকে ডাকছ, সকলে আসলে একই ঈশ্বরের আরাধনা করছ। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা হ্রাস পায় এবং বাংলার সমাজমানসে এক মহান সমন্বয়ের আবহ তৈরি হয়। গ্রামীণ কবিগানের আসরে, কীর্তনে এবং যাত্রাপালায় ‘কৃষ্ণের কালীরূপ’ ধারণের পালা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে সর্বস্তরের মানুষ এক ছাতার তলায় চলে আসে। 
এই রূপই প্রেম ও শক্তির মহত্তম মহাকাব্য 
কৃষ্ণের কালীরূপ এই শিক্ষাই দেয়— জীবন যেমন সুন্দর ও মধুর, তেমনই তা কঠোর, বাস্তবও। শুধু মাধুর্য দিয়ে জীবন চলে না, শক্তি দিয়েও সৃষ্টি বাঁচে না। সৃষ্টির সুরক্ষার জন্য যেমন শক্তির প্রয়োজন (কালী), সৃষ্টির আনন্দের (দিব্য) জন্য তেমনই প্রেমেরও প্রয়োজন (কৃষ্ণ)।
কৃষ্ণকালী হলেন সত্যের প্রতীক, যেখানে ভীতি ও প্রীতি, সংহার ও সৃষ্টি, সুখ ও দুঃখ এক হয়ে গিয়েছে। তিনি বাঁশিও বাজাতে পারেন, আবার প্রয়োজনে খড়্গও ধারণ করতে পারেন। বাংলার এই নিজস্ব আধ্যাত্মিক ভাবধারা জগৎকে শেখায় ঈশ্বরের নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই। তিনি সর্বব্যাপী এবং ভক্তের ভাব অনুসারেই তিনি রূপ ধারণ করেন। তাই কৃষ্ণই কালী, আর কালীই কৃষ্ণ— এই সত্য অনুধাবন করাই মানব জীবনের সার্থকতা।