কীর্তনে কালীর বন্দনা
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কালীর বন্দনায় শাক্ত কীর্তনের ঐতিহ্য বাংলার সংস্কৃতির অতি গভীরতাপূর্ণ। বাঙালি মানসে কালী হলেন কল্যাণময়ী মা। যাঁর সঙ্গে আদর আবদার চলে। মান-অভিমান, সুখ-দুঃখের সম্পর্কে জড়িয়ে ধরা যায়। তিনি তখন আর দেবী নন, আমার ঘরের আটপৌরে মা! তাঁর পরমেশ্বরী, জগজ্জননীর রূপটি ফিকে হয়ে যায়। ভারতে এমন কোনো দেবী নেই যাঁর আরাধনা শুধুমাত্র গানে গানে সম্ভব! তিনি মা কালী! তাঁকে নিয়ে নানারকমের সংগীত সৃষ্টি হয়েই চলেছে, আজও। পরেও হবে। শ্যামা সংগীত আলাদা একটি বিভাগ আছে গানের জগতে। আছে কীর্তনও। কীর্তন বলতে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীচৈতন্যের লীলা সংকীর্তনকেই বুঝে থাকি, যা বৈষ্ণব ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু শাক্ত পদাবলির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কালীর বন্দনা বা কালী কীর্তনের এক সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসও রয়েছে। এই ধারাটি ভক্তের হৃদয়ের গভীর আকুতি, ব্যাকুলতা এবং মায়ের প্রতি সন্তানের অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কালীর বন্দনাকে কীর্তনের সুরে ও ছন্দে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে অষ্টাদশ শতাব্দীর সাধক কবিদের অবদান অনস্বীকার্য। সাধক রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত, রামকৃষ্ণ রায়, দাশরথি রায় থেকে পরবর্তীকালে রামদুলাল, গিরিশচন্দ্র, প্রেমিক মহারাজ প্রমুখের শাক্ত পদাবলি কীর্তনের রূপ ধারণ করে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। রামপ্রসাদ যখন গাইলেন, ‘আমায় দে মা তবিলদারী, আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’, তখন এটি একটি গান বা কবিতা রইল না, ভক্তের ব্যাকুল আর্তি হয়ে কীর্তনের সুরে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে গেল। কীর্তনের মূল বৈশিষ্ট্যই হল ঈশ্বরের নাম বা মহিমা কীর্তন করা। সমবেত কণ্ঠে অথবা একক কণ্ঠে সুর করে গাওয়া হয়। কালীর বন্দনায় যখন এই কীর্তন হল ভাবপ্রধান। 

Advertisement

কালী কীর্তনের সুর ও তালের মধ্যে এক অদ্ভুত আর্তি লক্ষ করা যায়। বৈষ্ণব কীর্তনে যেমন রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ ও মিলনের মাধুর্য মুখ্য, শাক্ত কীর্তনে বা কালীর বন্দনায় তেমনই মুখ্য হল সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ এবং মায়ের প্রতি সন্তানের মান-অভিমান। ভক্ত এখানে দেবীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বরী হিসেবে দেখার পাশাপাশি নিজের জন্মদাত্রী মা হিসেবে দেখেন। তাই ভক্ত মায়ের কাছে আবদার করে, রাগ করে, আবার শান্তির জন্য মায়ের চরণে আশ্রয় খোঁজে। কীর্তনে কালীর রূপের বর্ণনা যেমন একদিকে ভয়াল ও ভয়ংকর, অন্যদিকে তেমনই তা ভক্তের চোখে পরম সুন্দর ও কল্যাণময়ী। দেবীর গলায় মুণ্ডমালা, হাতে খড়্গ, পদতলে শিব—এই রূপের অন্তরালে যে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব লুকিয়ে রয়েছে, তা কীর্তনের সহজ-সরল ভাষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
কালীর এই বন্দনা গীতিগুলিতে মায়ের নাম সংকীর্তনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ভক্তের বিশ্বাস, কলিযুগে কালীর নাম জপ এবং তাঁর কীর্তন করাই মুক্তির সহজ পথ। ‘কালী কালী’ বলে চিৎকার করে ডাকলে মা আর স্থির থাকতে পারেন না, তিনি সন্তানের ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হন। এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই কীর্তনীয়ারা আসর জমিয়ে তোলেন। এই বন্দনায় দেবীর বিভিন্ন রূপ ও নামের স্তুতি করা হয়। তিনি কখনো দক্ষিণাকালী, কখনো শ্মশানকালী, কখনো মহাকালী আবার কখনো বা ভদ্রকালী। তবে রূপ যাই হোক না কেন, ভক্তের কাছে তিনি ‘মা’। কীর্তনের পদগুলিতে দেখা যায়, ভক্ত মাকে বলছেন তিনি মা হয়ে সন্তানকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছেন। এই যে ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা এবং তাঁর ওপর অধিকার খাটানো, এটাই হল শাক্ত কীর্তনের মূল শক্তি। রামপ্রসাদের পদে যেমন দেখি, মাকে বলছেন তিনি মায়ের নাম বিক্রি করে খাচ্ছেন! অর্থাৎ মায়ের নামই তাঁর জীবনের একমাত্র সম্বল।
কীর্তনে কালীর বন্দনার সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার সমাজ জীবন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে বিপর্যস্ত হচ্ছিল, তখন এই শাক্ত কীর্তন সাধারণ মানুষকে মানসিক শক্তি ও সান্ত্বনা জুগিয়েছিল। জাত-পাত ও শ্রেণিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই যখন সমবেত কণ্ঠে মায়ের নাম কীর্তন করত, সমাজে সাম্যের ভাব জাগ্রত ও একাগ্রত হত। মায়ের কাছে তো ধনী-দরিদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ সবাই সমান। তাই কালীর বন্দনা গানগুলি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। এই গানগুলির ভাষা সরল এবং গ্রামীণ জীবনের উপমায় ভরপুর, যার ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই এর ভাবার্থ উপলব্ধি করতে পারত।
কালীর বন্দনায় কীর্তনের আরেকটি দিক হল এর দার্শনিক গভীরতা। দেবীর কালো রূপকে ভক্তরা দেখেন অনাদি ও অনন্তের প্রতীক হিসেবে। যেমন সমস্ত রং কালো রঙের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, তেমনই সৃষ্টির সমস্ত উপাদান মহাকালীর মধ্যেই লয় প্রাপ্ত হয়। কীর্তনের সুরে যখন গাওয়া হয় ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’, তখন সেটি আর বাহ্যিক রূপের বর্ণনা থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক চরম সত্যের প্রকাশ। বাহ্যিকভাবে যা অন্ধকার, অভ্যন্তরীণভাবে তাই পরম প্রকাশ। এই তত্ত্বটি কঠিন শাস্ত্রীয় আলোচনার মাধ্যমে নয়, কীর্তনের সহজ সুরে হৃদয়ে ধারণ করা যায় সহজেই।
কালী কীর্তনের এই ঐতিহ্য চিরকালই ধর্ম সংস্কৃতির বুকে অম্লান রয়েছে। আধুনিক যুগের ব্যস্ততার মধ্যেও যখন কোনো কীর্তনের আসরে কালীর বন্দনা হয়, মানুষ ক্ষণিকের জন্য হলেও শান্তির খোঁজ পায়। এটি বাঙালির আত্মিক অন্বেষণ এবং ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মায়ের চরণে নিবেদিত সুর ও বাণী চিরকাল ভক্তি, প্রেম ও মুক্তির পথে অনুপ্রাণিত করে চলবে। এই বন্দনার মাধ্যমে মানুষ নিজের অহংকার ও কলুষতাকে বিসর্জন দিয়ে শুদ্ধ ও পবিত্র চেতনায় উন্নীত হতে পারে, যা কালীর আরাধনার আসল উদ্দেশ্য। আমরা সঙ্গোপনে গাইতে পারি এই পুণ্যক্ষণে—‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।’/ ‘মন রে কৃষি কাজ জানো না’/ ‘আমায় দে মা পাগল করে’ / ‘রূপ যদি তোর এতই ভালো মুণ্ডমালা কেন গলে’/ ‘জান না রে মন পরম কারণ’/ ‘মহাকালের কোলে এসে মা গো এমন করে ঘুমিয়েছিস’ / ‘বল রে জবা বল’/ ‘কোন্ সাধনায় পেলি রে তুই মায়ের চরণ-তল।’/ ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা’/ ‘কালী কালী বল রে রসনা, দিন তো গেল মিছে কাজে।’