মশালের আলোয় ডাকাত কালীর নিরঞ্জন
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বলরাম দত্ত বণিক: বীরভূমের অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন কালীমন্দির, যেগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনি। এই ধরনের প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত মন্দিরগুলির অন্যতম নলহাটি পুরসভার কামারপাড়ার ‘ডাকাত কালী’ মন্দির। সময়ের পরিবর্তন হলেও আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল বীরভূমের এই ঐতিহাসিক পুজো।

Advertisement

একটা সময় জঙ্গলময় ছিল নলহাটির কামারপাড়া। পাশেই জঙ্গলে ঘেরা ‘ডাকাত পুকুর’। জনশ্রুতি, বহু বছর আগে দুর্ধর্ষ ডাকাতদের গোপন আস্তানা ছিল এই জঙ্গল। সেই সময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তারা তালপাতার ছাউনি তৈরি করে মৃন্ময়ী কালীর পুজো শুরু করেছিল। গভীর রাতে পুজো সেরে তারা ডাকাতিতে বেরত এবং সূর্য ওঠার আগেই ফিরে এসে লুট করা সামগ্রী মায়ের চরণে অর্পণ করত। ডাকাতদের পূজিত সেই কালীই ‘ডাকাত কালী’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
পুজো কমিটির সদস্য অংশুমান দাস জানান, মাটির মন্দির ভেঙে যখন পাকা মন্দির নির্মাণ শুরু হয়, তখন তাঁর দাদু পঞ্চানন দাসের রেখে যাওয়া একটি পুরানো রসিদ পাওয়া যায়। সেই রসিদে ১২২৯ সাল উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ, তারও বহু বছর আগে থেকে এই পুজো হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে ওঠার পর এবং ডাকাতদের অবলুপ্তির পর স্থানীয় উমা দত্ত, পঞ্চানন দাস, কাশীরাম মিত্ররা এই পুজোর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। এরপর এলাকার বাসিন্দা শ্যামপ্রসাদ দত্ত ও রামশংকর দত্ত মায়ের বেদি ও পাকা মন্দির নির্মাণ করে দেন। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে চাঁদা তুলে এই পুজো পরিচালিত হয়।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পুজোর অনেক প্রথাই আজও অপরিবর্তিত। অতীতে পুজোর শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত মন্দিরে অনবরত মশাল জ্বলত। সারি সারি সেই মশালের আলোতেই দেবীকে কাঁধে চাপিয়ে নাচাতে নাচাতে শহর প্রদক্ষিণ করার পর ‘ডাকাত পুকুর’-এ নিরঞ্জন দেওয়া হত। তবে বছর দুয়েক ধরে পুলিশের নির্দেশে মশাল নিষিদ্ধ হওয়ায় এখন পুজোর শুরু থেকে প্রতিমা বিসর্জনের আগে পর্যন্ত মন্দিরে বড়ো মোমবাতি জ্বালানো হয়। নিরঞ্জন যাত্রায় ব্যবহার করা হয় জেনারেটরের আলো। তবে দেবীকে কাঁধে চাপিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করার সেই প্রথা আজও বজায় রয়েছে।
এই পুজোয় প্রচুর ছাগ বলি দেওয়া হয়। পরের দিন সকালে এলাকার সমস্ত মানুষকে বসিয়ে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ানোর প্রথা রয়েছে। পুজো উদ্যোক্তা নির্মল মুখোপাধ্যায় ও তরুণ চন্দরা জানান, এখানকার দেবী অত্যন্ত জাগ্রত, তিনি কাউকে নিরাশ করেন না। তাই পুজোর রাতে নলহাটি শহর ও লাগোয়া বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ এই মন্দির চত্বরে ভিড় জমান। দেবীর নিরঞ্জন যাত্রার সময়ও রাস্তার দু’ ধারে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।