


সোমজা দাস
সচ্চিদানন্দ ঘোষাল বৃদ্ধ হয়েছেন। তেষট্টি বছর বয়সি পুরুষকে বৃদ্ধ বলা যায় কি না সে নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকলেও সচ্চিদানন্দের ভীমরতি নিয়ে দ্বিমত নেই কারও। আর সেই কারণেই রোজ নতুন নতুন আজগুবি যেসব আইডিয়ার চাষ চলছে বাড়িতে, তা বার্ধক্যের স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে মেনে নিয়েই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মনে সান্ত্বনা খুঁজেছে এতদিন। তা সে বাড়ির ছাদে পায়রা পোষা হোক, বা ইউটিউব দেখে নিত্যনতুন বিদঘুটে সব খাবার তৈরি, কোনো ব্যাপারেই অন্যদের বিরক্তির পরোয়া করেননি। অবশ্য বাড়িতে লোক বলতে তো দু’জন মাত্র মানুষ। এক, সচ্চিদানন্দের বোন অনুপমা, একমাত্র ভাইপো সন্দীপ।
সচ্চিদানন্দ ও অনুপমা, একজন ডাকসাইটে প্রাক্তন আমলা, অন্যজন হাইকোর্টের নামজাদা ল’ ইয়ার। দুই ভাইবোনের কেউ বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের জীবনে গুরুত্ব দেননি। দু’জনেই প্রবল পরাক্রমী। মন্দ লোকে বলে, অনুপমা নাকি যৌবনে একবার প্রেমে পড়েছিলেন। এদিকে তাঁদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বাবা পোশাকেআশাকে যতই আধুনিক হন, ভেতরে ভেতরে ছিলেন অসম্ভব রক্ষণশীল। পাত্রকে না দেখেই নাকচ করে দেন শুধু জাত না মেলার অজুহাতে।
সচ্চিদানন্দ সেই সময়ে বাবার কথার প্রতিবাদ না করলেও অনুপমার ছোটদা চেয়েছিলেন বিয়েটা হোক। প্রয়োজনে বোনকে কালীঘাটের মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিতেও রাজি ছিলেন। কিন্তু পরিবারের অমতে বিয়ে করতে রাজি হননি অনুপমা। সেই অভিমানেই হয়তো বা, আর বিয়েও করেননি অন্য কাউকে।
তবে তাঁরা দুই ভাই-বোন বিয়ে না করলেও অনুপমার সেই ছোটদা বিয়ে ও সংসার দুই করেছিল। সেবারও আপত্তি উঠেছিল পরিবারের মধ্য থেকে। প্রেমিকাকে ছাড়ার চাইতে পরিবার ত্যাগ করাই শ্রেয় মনে করেছিলেন তিনি। সেই প্রেমজ বিবাহের ফলস্বরূপ সন্দীপ নামের যুবকটির ধরাধামে আবির্ভাব। মা-বাবা দু’জনকেই ছোটো বয়সে হারিয়েছে সে। জ্যাঠা ও পিসির সংসারে মানুষ। দু’জনেরই যাবতীয় গবেষণার গিনিপিগও তাকেই হতে হয় তাই।
সেসবে সন্দীপের আপত্তি ছিল না। শান্ত ও বিবেচক ছেলে সে। উপরোক্ত দুই গুরুজনকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধাও করে। কিছুটা বুঝি কৃতজ্ঞতাও মিশে থাকে সেই মনোভাবে। সংসারের দুই প্রবল প্রতাপান্বিত সদস্যের মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে সদাসর্বদা। সেসব ক্ষেত্রে সন্দীপই সেতুর কাজটা করে এসেছে বরাবর।
কিন্তু বর্তমানে যা হচ্ছে, সেটা আর নিতে পারছেন না অনুপমা। সচ্চিদানন্দ জেদ ধরেছেন, সন্দীপের বিয়ে দেবেন। অনুপমা শুনেই বলেছিলেন, ‘হোয়াট রাবিশ! সন্দীপ কি বেড়াল না তোমার পোষা পায়রা, যে তুমি ধরে বিয়ে দিয়ে দেবে? হি ইজ আ ফাইন ইয়ংম্যান। বিয়ে করার ইচ্ছে হলে করবে। নইলে করবে না। আর আজকাল বিয়ের চেয়ে ডিভোর্স বেশি হচ্ছে। তাই বিয়ে না করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।’
সচ্চিদানন্দ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বেড়াল বা পায়রার বিয়ে না দিলেও চলে। তারা নিজেরা সঙ্গী নির্বাচন করে থাকে। তোর ওই হতচ্ছাড়া হুলোটা পাড়া জুড়ে ক’টা বিয়ে করে বসে আছে, ক্যাট মাদার হিসেবে তোর খবর রাখা উচিত। কিন্তু সেই কাজেও তুই লজ্জাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছিস। সুতরাং...’
‘একদম আমার হুলো সম্পর্কে যা তা বলবে না দাদা’, গর্জে ওঠেন অনুপমা। কালো রঙের গাবদাগোবদা পুষ্যি হুলোটা তাঁর প্রাণ।
‘বলব না। আই ডোন’ট ইভেন কেয়ার। শুধু পাড়ার মেনিগুলো বাচ্চাপ্রসব করার সময় হলে পাড়ার সব বাড়ি ছেড়ে আমাদের বাড়ির সিঁড়ির তলাটাকেই প্রসূতিসদন হিসেবে নির্বাচন করে থাকে, সে যে অকারণ নয় সে তুইও জানিস, আমিও জানি। যাক গে, আপাতত হুলোকে নিয়ে কথা হচ্ছে না। তবে সন্দীপের জন্য বউ আমি নির্বাচন করব।’
অনুপমা থমথমে মুখে বলল, ‘সে তুমি করতেই পার দাদা। কিন্তু আমি বলব, আজকালকার ছেলেমেয়েদের তুমি চেনো না। আমাদের সময়ের মতো জাত-ধর্ম মেলাতে বসলে ভুল করবে।’
বিয়ের প্রসঙ্গে অনুপমার কোন লুকোনো তন্ত্রীতে টান লাগে, বুঝতে অসুবধে হয় না সচ্চিদানন্দের। গম্ভীর গলায় শুধু বলেন, ‘হুম!’
দুই
ওদিকে কলেজ স্ট্রিটের প্যারামাউন্টে সন্দীপের মুখোমুখি বসে ডাবের শরবতে চুমুক দিতে দিতে মৌনী বলল, ‘আর কতদিন এভাবে রাস্তাঘাটে, পার্কে, রেস্তরাঁয় ঘুরে প্রেম করে বেড়াবে? বাড়িতে বলছ না কেন আমার কথা?’
বিয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই শরবতের মিষ্টি স্বাদও তেতো লাগে সন্দীপের মুখে। বলে, ‘জানো তো আমাদের বাড়ির ব্যাপার। আমার বিয়ে হবে কী হবে না, সে নিয়েই প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে যুদ্ধ লাগে দুই বুড়োবুড়ির মধ্যে। তার উপর আমি যদি গিয়ে বলি যে, মেয়ে আমি অলরেডি ঠিক করে বসে আছি, কী হবে ভাবতে পারছ?’
‘বললে কী হবে জানি না,’ শরবতে চুমুক দিয়ে বলল মৌনী, ‘তবে না বলতে পারলে কিছুই হবে না। আর তুমি যে নিজের মুখে কিছু বলে উঠতে পারবে না ওদের, সেটাও আমি বেশ জানি।’
‘প্লিজ রাগ কোরো না। আমাকে আরেকটু সময় দাও।’ সন্দীপ হাত বাড়িয়ে মৌনীর হাতে হাত রাখে। মৌনী ব্যাজার মুখে বলে, ‘সময় তো দিয়েই যাচ্ছি গত দু’ বছর ধরে। আর এক মাস দিলাম। এর মধ্যে তুমি কিছু বলতে না পারলে...’
‘কী করবে? ছেড়ে চলে যাবে আমায়?’
মৌনী ওড়নার কোনা দিয়ে চশমার কাচ মুছতে মুছতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘না। আমিই তোমাদের বাড়িতে গিয়ে বলে আসব।’
‘কী বলবে?’ মুচকি হাসে সন্দীপ।
‘বলব, এই নিরেট বোকা লোকটাকে আমি বিয়ে করতে চাই।’
‘আর যদি অনুমতি না দেয়?’
ফিক করে হাসল মৌনী। বলল, ‘না দিলে আর কী? বাক্সপ্যাটরা নিয়ে ওখানেই ঘাঁটি গাড়ব। দেখি কীভাবে তাড়িয়ে দেয়!’
তিন
সচ্চিদানন্দ সকালের চা-টা বেশ সময় নিয়ে খান। দামি দার্জিলিং চা। সোনার মতো রং। অনুপমার চা আসে অসম থেকে। দুধে চিনিতে সময় নিয়ে জ্বাল করা হয়। দুই ভাই-বোন বারান্দায় বসেন খবরের কাগজ নিয়ে। ভাগাভাগি করে পড়েন। আজও বসেছিলেন। মাঝপথে কাগজটা হাত থেকে ছুঁড়ে দিয়ে বিরক্তমুখে বললেন সচ্চিদানন্দ, ‘ধ্যার ধ্যার, কোনো খবর নেই। সেই এক থোর-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোর। মনে হয় একই নিউজ এদিক ওদিক করে ছেপে দেয় রোজ। একটা ভালো খবর নেই পুরো কাগজে।’
‘কোত্থেকে থাকবে? কোর্টে গেলে বুঝতে কীসের চাষ হচ্ছে সোসাইটিতে। আমাদের সময় আর নেই। আজকাল সর্বত্র ক্রাইম, নেশা, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, উফফ! তাও ভালো আমাদের সন্দীপ তেমন ছেলে নয়। তবে বিয়ে দিলে সেই মেয়ে যে কেমন হবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আমি বলব, তোমার পাগলামি ছাড়।’
এই উক্তিটুকুর পেছনে একটা ছোট্ট প্রেক্ষাপট আছে। গত রবিবার সচ্চিদানন্দ কাউকে না জানিয়েই একটা কাণ্ড করেছেন। খবরের কাগজে সন্দীপের বিয়ের বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ দেশে ক’জন নারীপুরুষ আর নিজের জীবনসঙ্গী নিজে খুঁজে পায়! আর পেলেও বেশিরভাগ সম্পর্কই মণ্ডপ পর্যন্ত এগয় না। শেষমেষ মা-বাপে ধরে বেঁধে সঙ্গী জুটিয়ে দেয়।
তাই স্বাভাবিক বিজ্ঞাপন হলে কারও কিছু বলার থাকত না। কিন্তু সচ্চিদানন্দ ঘোষণা করেছেন, যোগ্য পাত্রীদের সামনে বসিয়ে ইন্টারভিউ নেবেন তিনি। তার জন্য দরখাস্ত দিতে হবে পাত্রীকেই, তাও নিজে হাতে লিখে। শুনে হায় হায় করে উঠেছিলেন অনুপমা। ধরে পড়েছিলেন সন্দীপকে।
‘শুনেছিস বাবা, তোর জ্যাঠামশাইয়ের কাণ্ড?’
সন্দীপ মুখচোরা ছেলে। মাথা নেড়েছিল শুধু।
‘মাথা নাড়লে হবে না। ওই লোকটার বুদ্ধিসুদ্ধিতে বিন্দুমাত্র ভরসা নেই আমার। ও যদি ইন্টারভিউ নেয়, আমিও নেব, এই আমি বলে দিলাম।’
সন্দীপ মাথা নেড়েছিল আবারও। জ্যাঠামশাই বা পিসি, কাউকে নিয়েই ভাবনা ছিল না তার। শুধু এই বিজ্ঞাপনের খবর কানে গেলে আরেকজনের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সেটা ভেবে হৃদকম্প হয়েছিল সেই মুহূর্তে। মৌনীকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবতেও পারে না সে। প্রথম পরিচয় সেই কলেজে। এক বছরের জুনিয়র। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল। তার মতো লাজুক নয় মৌনী, বরং উলটোটাই। সব ব্যাপারেই তার মতামত খুব স্পষ্ট। মিল যে একেবারেই নেই, তাও নয়। সেও শৈশবেই মাতৃহারা। বাবা নতুন করে সংসার করেছেন। মৌনী মানুষ হয়েছে দিদা ও মামার কাছে। দিদা আর নেই। মামাও বিয়ে করেননি, একমাত্র ভাগনিকে মানুষ করেছেন সবটুকু স্নেহ ছেনে।
ফ্রেশার্স ওয়েলকামের দিন প্রথম আলাপের পর মৌনী লাজুক, মুখচোরা সন্দীপের অভিভাবক হয়ে উঠেছিল অচিরেই। জানত, তার প্রেমিকটি এগিয়ে এসে কোনোদিন বলবে না কিছু। নিজের জন্য মুখ ফুটে কিছু চাইতেও তার অপরিসীম লজ্জা। তাই নিজেই এগিয়েছিল সে। বলেছিল, ‘তোমাকে ভালো লাগে আমার। তোমার আপত্তি থাকলে বল। আর বিরক্ত করব না সেক্ষেত্রে।’
সন্দীপ কিছু বলতে পারেনি। শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল মৌনীর মুখের দিকে। সেই দৃষ্টিতে বিস্ময়, বিহ্বলতার চেয়েও ছিল বেশি কিছু। মৌনী ওর থেকে কোনো উত্তর প্রত্যাশাও করেনি বোধ হয়। শুধু মুচকি হেসে বলেছিল, ‘পাগল একটা!’
চার
অমন বিচ্ছিরি বিজ্ঞাপনের কোনো উত্তর আসবে আশা করেননি অনুপমা। তাই নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু কোন এক মেয়ে নিজের বায়োডেটা পাঠিয়েছে জেনে অবাক হলেন। চোয়াল শক্ত হল মেয়েটির নির্লজ্জতার কথা ভেবে। সচ্চিদানন্দ জানিয়েছিলেন, মেয়েটিকে তিনি পরের রবিবার তাদের বাড়িতে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডেকেছেন।
রবিবার সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। সন্দেহ ছিল আদৌ আসবে কি না সেই মেয়ে। সব কথা শুনে সন্দীপ বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার নাম করে সকালেই বাড়ি থেকে পালিয়েছে। ঠিক ন’টায় এল মেয়েটি। মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রং সামান্য চাপা। মুখখানি তরতরে। সবচেয়ে আশ্চর্য তার চোখ দু’টি। ভীষণ উজ্জ্বল ও বাঙ্ময়। নাম আগেই জানিয়েছিল, মৌনী। কথা বলে বোঝা গেল, বেশ সপ্রতিভ মেয়েটি। সচ্চিদানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা মৌনী, আমাদের ছেলেকে তো দেখনি তুমি। তাহলে না দেখেই বিয়ে করতে চাইছ যে!’
মৌনী মৃদু হাসল। বলল, ‘সন্দীপকে আমি চিনি।’
সোজা হয়ে বসলেন সচ্চিদানন্দ। বললেন, ‘চেনো? কীভাবে?’
মৌনীর দৃষ্টি নত হল মুহূর্তের জন্য। তারপর বলল, ‘শুধু ওকে নয়, আপনাদেরও চিনি।’
ততক্ষণে পায়ে পায়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন অনুপমা। মৌনী উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম করল দু’জনকেই। বলল, ‘আমি আর সন্দীপ একই কলেজে পড়তাম। প্রায় ছ’ বছরের সম্পর্ক আমাদের। ও জানে না, আমি কিন্তু ওর সঙ্গে পরিচয়ের অনেক আগে থেকেই আপনাদের চিনি।’
সচ্চিদানন্দ ও অনুপমা দৃষ্টিবিনিময় করলেন নীরবে। সচ্চিদানন্দ জানতে চাইলেন, ‘কীভাবে?’
মৌনী মাথা নীচু করল। কয়েক মুহূর্তের দ্বিধা। তারপর চোখ তুলে বলল, ‘আমার মামার নাম সুপ্রতীম দাস।’
অনুপমার মাথাটা যেন টলে গেল মুহূর্তের জন্য। হাত বাড়িয়ে দেওয়াল আঁকড়ে ধরলেন তিনি। অস্ফুটে বললেন, ‘তুমি...’
‘আমাকে ক্ষমা করবেন।’ বলল মৌনী, ‘আজ আমি এখানে আমার সন্দীপের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার জন্য আসিনি। মামা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। মামারও কেউ নেই আমি ছাড়া। আমার বিয়ে হয়ে গেলে মামা একা হয়ে যাবেন, সেই চিন্তাটাই আমাকে স্থির থাকতে দেয় না। তাই অনেক ভেবে আজ এখানে এসেছি। আপনারা তাড়িয়ে দিলে চলে যাব।’ চেয়ারের উপর ধপ করে বসে পড়লেন অনুপমা। মনে পড়ে যায় কত ভুলে যাওয়া স্মৃতি। সারা জীবনই তো আজকের মতো প্রৌঢ়া ছিলেন না তিনি। যৌবন তাঁরও এসেছিল।
একটা ভীরু, লাজুক চোখ অনেক কথা বুকে চেপে চেয়ে থাকত। বুকে দোলা লেগেছিল অনুপমারও। মন দেওয়া-নেওয়া হতেও সময় লাগেনি। কিন্তু সেদিন পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস করে উঠতে পারেননি তিনি।
নিজেকে বুঝিয়েছিলেন অনুপমা, এই ভালো। ভেবেছিলেন, ভুলে গেছেন তাকে। সব মুছে গেছে। কিন্তু আজ এই মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে বেশ বুঝতে পারছেন, কিছুই হারিয়ে যায় না এভাবে। যায়ওনি। শুধু নিজেকে চোখ ঠেরেছেন এতগুলো বছর ধরে।
সচ্চিদানন্দ গলা খাঁকরে বললেন, ‘কেমন আছে সুপ্রতীম? ও তো দিল্লিতে কোন একটা কলেজে চাকরি করত বলে শুনেছিলাম।’
‘ভালো আছেন। চাকরি থেকে সময়ের কিছুটা আগেই স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন মামা। এখন কলকাতাতেই থাকি আমরা। এখানে কয়েকটা কলেজে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে পড়ান।’ বলে অনুপমার দিকে ঘুরে তাকাল মৌনী। বলল, ‘মামার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনার একটা পুরানো ছবি মামার ওয়ালেটে থাকে সবসময়, আমি দেখেছি। আজ সামনে থেকে দেখে বুঝতে পারছি কেন মামা আজও আপনাকে ভুলতে পারেননি।’
সচ্চিদানন্দ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, তার মুখরা, কঠিন-কঠোর বোনটি কাঁদছে, কে জানে কতদিন পর। অথচ যেদিন বাবার কথায় সুপ্রতীমকে ছেড়ে এসেছিল, সেদিন কাঁদেনি ও। এত বছর ধরে বেঁধে রাখা অশ্রুধারা যেন আগল ভেঙে বয়ে যাচ্ছে আজ। জিজ্ঞাসা করলেন তিনি, ‘সন্দীপ এসব জানে?’
মৌনীর চোখের তারায় উড়ে এল একরাশ মেঘ। মাথা নাড়ল সে। বলল, ‘বলিনি। বলা ভালো, সাহস পাইনি। যদি সব জেনে ও আমায় ভুল বোঝে! যদি ভাবে আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মিশেছি ওর সঙ্গে!’
‘ভাববে না। সে দায়িত্ব আমার।’ বলে হাসলেন সচ্চিদানন্দ। একটু থেমে বললেন, ‘মাঝে মাঝে ছোটোরাও বড়োদের ভুল ধরিয়ে দেয়। যে কাজটা আমার অনেক আগেই করা উচিত ছিল, অথচ করতে পারিনি। আসলে দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তুমি ছোট্ট মেয়ে হয়ে কত সহজে করে ফেললে।’
‘দাদা!’ ফুঁপিয়ে ওঠে অনুপমা।
সচ্চিদানন্দ হাসেন। বোনের কাঁধে হাত রেখে চাপ দিলেন আলতো করে। মৌনীর দিকে তাকিয়ে সস্নেহে বললেন, ‘তোমার আপত্তি না থাকলে তোমার আর সন্দীপের ব্যাপারটা নিয়ে না হয় ক’দিন পরেই ভাবছি। আজ তুমি এ বাড়িতে সন্দীপের কনে নয়, সুপ্রতীমের অভিভাবক হয়ে এসেছ। সেক্ষেত্রে ইন্টারভিউটা তোমারই নেওয়ার কথা। তুমি পাত্রীর সঙ্গে কথা বলে দেখ পছন্দ হয় কি না! আমি বরং ততক্ষণে তোমার জন্য জলখাবার বানাই। ইউটিউব দেখে একটা নতুন রেসিপি শিখেছি।’
হেসে উঠল মৌনী। চোখে জল নিয়ে লাজুক হাসলেন অনুপমাও। আকাশে মেঘ সরে গেছে কখন। মিঠেকড়া রোদ্দুরে ঝলমল করছে চারদিক।