


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে জীবনবিমা ও স্বাস্থ্যবিমায় জিএসটি মকুব করেছে কেন্দ্র। সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিমায় জিএসটির হার ১৮ শতাংশ থেকে শূন্যে নামানো হবে। স্বাভাবিকভাবেই বিমা গ্রাহকদের কাছে এটি খুশির বার্তা। বিমা বিশেষজ্ঞরা কিন্তু বলছেন, ১৮ শতাংশ জিএসটি মকুব হওয়ার পুরো সুবিধা গ্রাহক পাবেন না। কারণ, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে জীবনবিমা ও স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বাড়বে। ফলে জিএসটির পুরো সুরাহা আম আদমি পাবে না।
কেন প্রিমিয়াম বাবদ খরচ বাড়বে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমা সংস্থাগুলি যেমন গ্রাহকদের থেকে প্রিমিয়ামের উপর জিএসটি আদায় করে, তেমনই ব্যবসা চালানোর জন্য তাদের বিভিন্ন খাতে জিএসটি মেটাতেও হয়। সংস্থাগুলি যে টাকা জিএসটি বাবদ মেটায়, তার নাম ‘ইনপুট ট্যাক্স’। অন্যদিকে তারা গ্রাহকের থেকে যে জিএসটি আদায় করে, সেটা ‘আউটপুট ট্যাক্স’। এই আউটপুট ট্যাক্স থেকে ইনপুট ট্যাক্স বাদ দিয়ে নিট জিএসটি সরকারের কাছে জমা করার যে সুবিধা বিমা সংস্থাগুলি পায়, তার নাম ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট। এতদিন ওই সুবিধা পেয়ে এসেছে বিমা সংস্থাগুলি। কিন্তু এখন আউটপুট ট্যাক্স বাবদ ১৮ শতাংশ জিএসটি একধাক্কায় শূন্য হয়ে গিয়েছে। অথচ, সংস্থাগুলিকে ইনপুট ট্যাক্স বাবদ জিএসটি মেটাতেই হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কথায়, সেই খরচ সংস্থাগুলি কখনওই নিজেদের পকেট থেকে দেবে না। ফলে তা চাপবে গ্রাহকের উপরই। প্রিমিয়াম বাবদ খরচ বাড়বে। অর্থাৎ জিএসটি বাবদ আর্থিকভাবে গ্রাহকের যতটা লাভবান হওয়ার কথা ছিল, তা তাঁরা হবেন না। যে বিমা সংস্থার ব্যবসা চালানোর খরচ সবচেয়ে কম, তাদের ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের বোঝা ১ থেকে ৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জেনারেল ইনস্যুরেন্স কাউন্সিলের এগজিকিউটিভ কমিটির সদস্য লোকেশ কেসি বলেন, ‘আমার ধারণা, প্রিমিয়াম বাবদ গ্রাহকদের খরচ তিন শতাংশের কাছাকাছি বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে জিএসটি শূন্যে নামানোর পর গ্রাহকের যে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা, তা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাবে। তবে এরপরও যে গ্রাহকের আর্থিক সুরাহা হবে, তাতে সন্দেহ নেই। এর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানিয়েছি। কারণ, স্বাস্থ্যবিমার খরচ কমলে দেশের সিংহভাগ মানুষ উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। আয়ত্তের মধ্যে প্রিমিয়াম এলে, তা বিমা সংস্থা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবসা বাড়াতে সাহায্য করবে। নতুন কর্মসংস্থানের পথও খুলবে।’ কনফেডারেশন অব জেনারেল ইনস্যুরেন্স এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার যুগ্ম আহ্বায়ক সুদীপ্ত সরকার বলেন, ‘২০২১ থেকে আমরা বিমার উপর জিএসটি কমানোর জন্য লড়ছি। দাবি মেনে নেওয়ায় আমরা খুশি।’
বিমার পাটিগণিত
ধরা যাক কোনও গ্রাহকের বিমার প্রিমিয়াম ১০০ টাকা। এতদিন এর উপর ১৮ শতাংশ জিএসটি দিতে হতো। ফলে প্রিমিয়ামের অঙ্ক দাঁড়াত ১১৮ টাকা।
ব্যবসা চালানো এবং এজেন্ট কমিশন বাবদ বিমা সংস্থাটি খরচ করত ৩৫ টাকা। এর উপর প্রযোজ্য হতো ১৮ শতাংশ হারে জিএসটি। ফলে এই বাবদ সংস্থাটিকে মেটাতে হতো ৬ টাকা ৩০ পয়সা জিএসটি।
অর্থাৎ গ্রাহকের থেকে সংস্থাটি ১৮ টাকা জিএসটি বাবদ আদায় করত। যেহেতু ব্যবসা চালাতে এবং কমিশন দিতে তাদের ৩৫ টাকার উপর ৬ টাকা ৩০ পয়সা জিএসটি লাগত, তাই ওই টাকা বাদ রেখে বাকি ১১ টাকা ৭০ পয়সা তারা সরকারের কাছে জমা দিত।
এখন আর সংস্থাটি সাধারণ মানুষের থেকে ১৮ টাকা নিতে পারবে না। কিন্তু তাদের জিএসটি মেটাতে হবে ৬ টাকা ৩০ পয়সা। এই খরচ সংস্থাটি নিজে বহন করবে না। তারা তা প্রিমিয়াম বাবদ গ্রাহকের থেকে আদায় করবে। অর্থাৎ প্রিমিয়াম দাঁড়াবে ১০৬ টাকা ৩০ পয়সা।
মোট কথা, সাধারণ গ্রাহক আসলে ১৮ টাকার সুরাহা পেলেন না। তিনি সুরাহা পেলেন ১১ টাকা ৭০ পয়সার।