ফ্লোরিডা: সূর্যাস্ত হয়েছে খানিক আগেই। ফ্লোরিডার ঘড়িতে তখন মঙ্গলবার রাত প্রায় ন’টা। নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ের বাইরে দাঁড়ানো দু’টি টেসলার মডেল এক্স এসইউভিতে উঠলেন চার মহাকাশচারী। চালকবিহীন গাড়ি এগিয়ে চলল। গন্তব্য লঞ্চপ্যাড।
রাত পৌনে ১টা। কোয়ারেন্টাইন ভেঙে ‘ড্রাগন ক্যাপসুলে’র দিকে এগলেন চার মহাকাশচারী। পরনে দুধসাদা পোশাক-হেলমেট। কাউন্টডাউন চলছে ... টি মাইনাস ৪৫ মিনিট। স্পেসএক্স অ্যাক্সিয়ম-৪ মিশন অপারেটররা সঙ্কেত দিলেন, ‘গো’। শুরু হল ফ্যালকন ৯ রকেটে কেরোসিন-লিকুইড অক্সিজেন প্রপেল্যান্ট ভরার কাজ। ‘ড্রাগন ক্যাপসুলে’র ভিতরে নির্দিষ্ট আসনে বসে স্ট্র্যাপ আটকে নিলেন চারজন। বন্ধ হয়ে গেল ড্রাগনের হ্যাচ। দমবন্ধ করে তখন অপেক্ষা করছে গোটা ভারত। বিশ্বও। কাউন্টডাউন শূন্যে পৌঁছনোর আগেই চালু হয়ে গেল ফ্যালকন ৯-এর ন’টি মেরিন ইঞ্জিন। মূহূর্তে আগুনের গোলা হয়ে ফ্লোরিডার তারাভরা আকাশ চিরে ছুটে গেল ‘ড্রাগন’। ৪১ বছর পর মহাকাশে ফের এক ভারতীয়... লখনউয়ের ছেলে শুভাংশু শুক্লা। রাকেশ শর্মার উত্তরসূরি হিসেবে নজির গড়লেন ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের এই গ্রুপ ক্যাপ্টেন। মিশন সফল হলে শুভাংশুই হবেন আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে যাওয়া প্রথম ভারতীয়।
১৯৮৪। কাজাখস্তানে এক হিমশীতল ভোরবেলায় এমনই এক মহাকাশযানে পা রেখেছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার তরুণ স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মা। সয়ুজ টি-১১ মহাকাশযানে বসে সিটের নীচে দুলুনি প্রথমবার টের পেয়েছিলেন। কয়েক মিনিটে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ পেরিয়ে সেই যান তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মহাশূন্যে। ৪১ বছর পর আবার সেই রোমাঞ্চ অনুভব করলেন আরও এক ভারতীয় বায়ুসেনা ক্যাপ্টেন, যার জন্ম রাকেশ শর্মার অভিযানের ঠিক পরের বছর, ১৯৮৫।
বুধবার ভারতীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে (ফ্লোরিডায় রাত ২টো ৩১ মিনিট) সফল উৎক্ষেপণ হতেই ফিরে এল সেই স্মৃতি। উৎক্ষেপণের ১০ মিনিটের মধ্যেই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে শুভাংশুর মহাকাশযানটি। ২০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘুরতে থাকা ড্রাগন স্পেসক্র্যাফ্ট থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে হিন্দিতে বার্তা দিলেন ভারতীয় মহাকাশচারী—‘সকল দেশবাসীকে নমস্কার। আমরা ৪১ বছর পর মহাকাশে পৌঁছলাম। এটা কেবল আমার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাত্রা নয়, মহাকাশে ভারতের গগনযান মিশনেরও শুরু। জয় হিন্দ! জয় ভারত!’ ভারতের গগনযান মিশনেও মহাকাশে যাবেন শুভাংশু।
যাত্রাশুরুর আনুমানিক ২৮ ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌঁছবে ‘ড্রাগন’। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টে ৩০ মিনিট নাগাদ স্পেস স্টেশনে ডক করবে সেটি। ‘মিশন পাইলট’ শুভাংশু ছাড়াও এই মহাকাশযানে রয়েছেন নাসার মিশন কমান্ডার পেগি হুইটসন, পোল্যান্ডের স্লাওস উজানানস্কি ও হাঙ্গেরির টিবর কাপু। আগামী ১৪ দিন মহাকাশে থাকবেন শুভাংশুরা। ৬০ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবেন। মহাকাশযাত্রায় শুভাংশুর সঙ্গী হয়েছে ভারতীয় খাবারও। লখনউ থেকেই উৎক্ষেপণ পর্বে নজর রেখেছিলেন তাঁর মা। এমনকী অভিযান শুরুর আগে রীতি মেনে ছেলেকে ভার্চুয়ালি ‘দই চিনি’ও খাইয়েছেন। ভিডিও কলে মাকে আশ্বস্ত করে শুভাংশু বলেন, ‘আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।’
এর আগে অন্তত সাতবার পিছিয়ে গিয়েছে শুভাংশুর মহাকাশ অভিযান। অবশেষে সফল উৎক্ষেপণে খুশি গোটা দেশ। মহাকাশচারীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। শুভাংশুর মহাকাশযাত্রায় উচ্ছ্বসিত ভারতীয় বায়ুসেনাও।