


নয়াদিল্লি: ‘শুল্ক-মহাযুদ্ধ’ ঘোষণা আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মহা-ভুল! এতে আরও কাছাকাছি আসবে ভারত-রাশিয়া-চীন। আমেরিকাকে কোণঠাসা করতে তৈরি হবে নয়া জোট, নয়া অক্ষ! ভারতকে রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে দূরে সরাতে আমেরিকার এতদিনের যাবতীয় প্রচেষ্টা সব জলে যাবে। স্বয়ং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন আমেরিকার প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন। একদা ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। এবার তিনিই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বে।
বোল্টনের মন্তব্য বুঝতে হলে অবশ্য ফিরে যেতে হবে আড়াই দশক আগে। ঠান্ডা-যুদ্ধ ততদিনে অতীত। অতীত সোভিয়েত ইউনিয়নও। একমেরু বিশ্ব। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নয়া বিশ্বে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। অতীতের কালো মেঘ সরিয়ে সবে কাছাকাছি আসতে শুরু করেছিল বিশ্বের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ দু’টি। ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে ভারত-মার্কিন সুসম্পর্কের ভিত তৈরির পালা সেই শুরু। এরপর ধীরে ধীরে ঐতিহাসিক অসামরিক পরমাণু চুক্তি, কৌশলগত সহযোগিতা, পারস্পরিক বিনিয়োগের জোয়ার, ভারতকে ‘মেজর ডিফেন্স পার্টনার’ হিসেবে ঘোষণা থেকে কোয়াডের মতো গুরুত্বপূর্ণ চতুর্দেশীয় গোষ্ঠী গঠন। কিন্তু তিলে তিলে গড়ে ওঠা কূটনৈতিক সম্পর্কের সেই ইমারত এক মুহূর্তে নড়বড়ে ‘শুল্ক-মহাযুদ্ধে’র ধাক্কায়! আর সেজন্য স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই দায়ী করেছেন বোল্টন। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের উপর যেভাবে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়েছে, তাতে বিন্দুমাত্র সায় নেই তাঁর। বরং তিনি মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপের কারণেই আমেরিকার হাত ছাড়ল ভারত। রাশিয়া-চীন-ভারত অক্ষ তৈরি হয়ে পড়ল।
শুধু বোল্টন নন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সুড় চড়িয়েছেন খ্যাতনামা মার্কিন অর্থনীতিবিদ স্টিভ হ্যাঙ্কিও। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের বক্তব্য, গোটা বিশ্বের বিরুদ্ধে বাণিজ্য-যুদ্ধে নেমে ট্রাম্প আসলে নিজেকেই ‘ধ্বংস’ করছেন। সর্বনাশ ডেকে আনছেন আমেরিকারও। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে ‘সম্পূর্ণ আবর্জনা’ বলে কটাক্ষ করেছেন হ্যাঙ্কি। তাঁর মতে, আমেরিকার অর্থনীতিতে সবটাই ভুলভাল চলছে। একটি টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, ‘নেপোলিয়নের উপদেশ ছিল, এমন শত্রুর পাল্লায় পড়ো না যাতে নিজেই ধ্বংস হয়ে যাও। আমার মতে, ট্রাম্প নিজেকেই ধ্বংস করছেন। ভারতের কথা বলতে হলে বলব, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করের উচিত হাতের তাস গোপন রেখে আরও কিছুটা অপেক্ষা করা। কারণ, ট্রাম্পের তাসের ঘর ভেঙে পড়বে। শুল্ক আরোপের পথ অর্থনীতিতে যে কম্পন তৈরি করবে তাতে বালির বাঁধ ভেঙে যাবে।’
অর্থনীতির মতো ট্রাম্প-শুল্ক যে কূটনৈতিকভাবেও আমেরিকার কাছে বুমেরাং হচ্ছে, সেকথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বোল্টন। এক সময় ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত প্রাক্তন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাফ কথা, ‘ট্যারিফ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আমেরিকার জন্য ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে। চীনের থেকেও ভারতের উপর বেশি শুল্ক চাপানো হয়েছে। প্রত্যাশিতভাবেই ভারতের দিক থেকে প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসছে। মস্কো থেকে তেল কেনার জন্য দ্বিতীয় দফায় আরও ২৫ শতাংশ (সামগ্রিকভাবে ৫০ শতাংশ) শুল্ক চাপানোয় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে পারে ভারতের। তারা হয়তো এবার সঙ্ঘবদ্ধভাবে আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করবে। ট্রাম্প যেভাবে চীনের প্রতি অপেক্ষাকৃত নরম অবস্থান নিয়ে ভারতের উপর অত্যন্ত চড়া হারে শুল্ক চাপালেন, তাতে ভারতকে চীন ও রাশিয়ার থেকে দূরে সরাতে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের পরিশ্রম জলে চলে গেল।’ আশঙ্কার সুর মার্কিন বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার পাডিলার কণ্ঠেও। তাঁর দাবি, চড়া হারে শুল্ক ভারত-মার্কিন সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করবে।