সকলকে নিজের মন জানিও না। জ্ঞানবান ও ধর্মভীরু যিনি, এক তাঁকেই তোমরা কথা বলবে। তরুণ বয়সী ও অপরিচিতদের সান্নিধ্যে কদাচিৎ আসবে। বড়লোকের সঙ্গে খাতির জমিও না। নামজাদা মানুষের ধারে-কাছেও যাবে না। নিরভিমান সরল লোকের সঙ্গ করবে এবং নৈতিক শিক্ষার অনুকূল যা, তারই খবর রাখবে। কোনও স্ত্রীলোকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করনা তবে সাধারণভাবে সতীনারী মাত্রকেই ভগবচ্চরণে উৎসর্গ করে দিও।
শ্রীভগবান ও তাঁর দিব্য পার্ষদদের অন্তরঙ্গতা কামনা কর, মানুষের খবর রেখ না। সবার সম্পর্কেই সহৃদয়তা পোষণ করবে, তাবলে ঘনিষ্ঠতা করাটা সঙ্গত নয়। এক এক সময় এমনও হয় যে কোন অপরিচিতকে তার শুভ্র যশচ্ছটায় ভাস্বর দেখি কিন্তু তার সাক্ষাৎসম্পর্কে এলে পীড়া বোধ হয়, মানুষটি হয়ে দাঁড়ায় চোখের বালি। তেমনি, আমরাও কত সময় ভাবি আমাদের সান্নিধ্যে অন্যেরা খুসী হবে; কিন্তু নিজের অশিষ্ট ব্যবহারে বেশির ভাগ সময় পরকে উত্যক্ত করেই তুলি আমরা। নিজের ইচ্ছামত না চলে কোনও আচার্যের অধীনে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে চলাই মানুষের পক্ষে নিতান্ত সমীচীন। নিজে কর্তা না হয়ে কারও অধীন থাকাটা ঢের বেশি নিরাপদ। অনেকেই আনুগত্য স্বীকার করে দায়ে পড়ে, শুভবুদ্ধির প্রেরণায় নয়। তারা ওতে পীড়া বোধ করে, দুদিন পরে একটুকুতেই অনুযোগ করে। কিন্তু সর্বান্তঃকরণে ভগবৎপাদপদ্মে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত মনের স্বাচ্ছন্দ্য কখনও পাবে না তারা।
এখানে ওখানে যতই ছুটাছুটি কর না কেন, কোনও একজন কর্তাব্যক্তির কাছে নিরভিমান বশ্যতা স্বীকার না করলে কোন দিন শান্তি পাবে না। মনের খেয়াল ও স্থান পরিবর্তনের ঝোঁকে কত জন যে ঠকেছে! মনের মিল হয় যার সঙ্গে, নিজের জ্ঞানবুদ্ধিমত মানুষ তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু ভগবানকে পেতে হলে চিত্ত স্থির হওয়া চাই। চিত্তস্থৈর্য্যের জন্য মাঝে মাঝে নিজের পছন্দ-অপছন্দ বাতিল করা দরকার। পুরোপুরি সব জানে এত বিজ্ঞ কে? সুতরাং নিজের মনোবৃত্তির উপর খুব বেশি আস্থা রেখনা বরং খুসী হয়ে অন্যের মনের কথা শুনতে চাইবে। অন্যের মন রাখতে গিয়ে ঈশ্বরপ্রীত্যর্থে নিজের কোন সদ্বৃত্তি বলি দিতে হয় যদি, তাতে তোমার আরও কল্যাণ হবে।
আমি বহুবার একথা শুনেছি যে উপদেশ দেওয়ার চেয়ে উপদেশ শোনা বা নেওয়াটা বেশি নিরাপদ। প্রত্যেকের মনেই যদি সৎ চিন্তা থাকে সে ভাল কথা। কিন্তু অবস্থা গতিকে ও যুক্তির দিক থেকে যখন অপরের মতামত মেনে নেওয়া দরকার, তখনও তাতে গররাজি থাকাটা অহংকার ও জিদের লক্ষণ। যতদূর পার লোকের ভিড় ও গোলমাল এড়িয়ে চলবে। সাদা মনে যতই সদুদ্দেশ্য নিয়ে চল না কেন, সাংসারিক ব্যাপারে চর্চা বা ও-নিয়ে আলাপ করলেও ধর্মপথে বিঘ্ন ঘটে। কারণ আমাদের একটুকুতেই দুরাচারী ও বাসনাসক্ত হয়ে পড়ার ভয় আছে।
‘ঈশানুস্মরণ’ টমাস আ কেম্পিস অনুবাদ শ্রীনারায়ণী দেবী থেকে