Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

হুগলির বৈঁচিগ্রামে সাবেক সওদাগর পরিবারে শ্রীপতি উদ্ধারক হিসেবেই পূজিতা হন দশভুজা

দেবী দশভুজার সঙ্গে পৌরাণিক মতে রাম, রাজা মান্ধাতার যোগাযোগ অনেকখানি স্পষ্ট। কিন্তু মঙ্গলকাব্য? না, দেবী চণ্ডী সেখানে থাকলেও সরাসরি দশভুজার যোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

হুগলির বৈঁচিগ্রামে সাবেক সওদাগর পরিবারে শ্রীপতি উদ্ধারক হিসেবেই পূজিতা হন দশভুজা
  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অভিজিৎ চৌধুরূী  চুঁচুড়া

Advertisement

দেবী দশভুজার সঙ্গে পৌরাণিক মতে রাম, রাজা মান্ধাতার যোগাযোগ অনেকখানি স্পষ্ট। কিন্তু মঙ্গলকাব্য? না, দেবী চণ্ডী সেখানে থাকলেও সরাসরি দশভুজার যোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু বহু শতাব্দী ধরে মঙ্গলকাব্যের অন্যতম নায়ককে একচালায় ধরে রেখেছে হুগলি জেলার এক বনেদি পুজো। হুগলির পাণ্ডুয়ার বৈঁচির দাঁ বাড়ির দেবী অভয়াদুর্গা। দেবী এখানে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের ধনপতি উপাখ্যানের শ্রীপতি বা শ্রীমন্ত সওদাগরের উদ্ধারকারী হিসেবে পুজো পেয়ে আসছেন। একদিকে পুরাণের মঙ্গলকাব্য, অন্যদিকে সওদাগরের বাড়ির পুজো, দু’য়ের মেলবন্ধনেই সৃষ্টি হয়েছে দশভুজার আবাহনের এক বিরল ধারা।
দেবী দশভুজার আরাধানায় সময়ের সঙ্গে মিশেছে পারিবারিক সংযোগসূত্র। তাতেই দেবীর চালায় এসেছেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীরা। কিন্তু দাঁ-বাড়িতে দেবীর রূপে পারিবারিক চেতনার আদল আসার আগে থেকেই শ্রীপতি বা শ্রীমন্ত সওদাগর বিরাজমান। যা মঙ্গলকাব্য ধারার এক মহাকাব্যিক উত্তরণ বললেও কম বলা হয়। সঙ্গে দাঁ-বাড়ির ক্ষয়িষ্ণু কড়ি-বরগা, বেলজিয়াম ঝাড়ের মলিন স্ফটিকের কণায় কণায় লুকিয়ে আছে সওদাগরি কালের নিভৃত আখ্যান। পুজো তার সাবেক জৌলুস হারিয়েছে বটে, কিন্তু ধরে রেখেছে এক বিরল ঐতিহ্যকে, বনেদিয়ানার শক্তপোক্ত শিকড়কে।
দাঁ বাড়ির সওদাগরি জমানার লোকশ্রুতিও মঙ্গলকাব্যের মতোই। গল্প মনে হলেও নিখাদ সত্যের ভিতে দাঁড়িয়ে আছে সেই সাবেক বনেদি কাঠামো। জল-জঙ্গলের পাণ্ডুয়ায় দাঁ বাড়ির পূর্বপুরুষরা হতদরিদ্র জীবনযাপন করতেন। খড়ের ছাউনি দেওয়া চাতালে তখন অভয়াদুর্গার পুজো হতো। জনশ্রুতি, একবার অনটনে পুজো বন্ধ হতে বসেছিল। দেবীর নির্দেশেই সেদিন কুমোর প্রতিমা গড়ে দিয়ে গিয়েছিল। আর মঙ্গলকাব্যের অলৌকিকের মতো জুটে গিয়েছিল পরিত্যক্ত ঘড়ায় রাখা মোহর। পুজো যেমন সেবার নিয়মনিষ্ঠায় হয়েছিল, তেমনই কপাল ফিরেছিল দাঁ পরিবারের। এর পরের ঘটনা নাটকীয়। রাতারাতি সওদাগরি ব্যবসায় নামেন দাঁ বাড়ির কর্তারা। ঘিয়ের সওদাগর হয়ে তখন তাঁদের আঙুল ফুলে কলাগাছ। রূপকথার সেই রেশ ধরেই পত্তন হয় জমিদারি। দেবী অভয়াদুর্গা তাঁর সাবেক রূপ বজায় রেখেই হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে। হুগলির সপ্তগ্রাম বন্দরের জৌলুসের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই নহবত বসিয়ে, ভিয়েন সাজিয়ে, পাড়া জাগিয়ে পুজো পেতে থাকেন দেবী অভয়া। আজ সেসব অতীত। তবু যেন চোখের সামনে তা দেখতে পান দাঁ বাড়ির উত্তরপুরুষ উদয়চাঁদ দাঁ। তিনি বলেন, সাবেক জৌলুস আজ নেই। কিন্তু নিষ্ঠা আর নিয়ম তেমনই আছে। সওদাগর বাড়ির পুজো বলেই হয়তো শ্রীপতি উদ্ধারক হিসেবে দেবী অভয়ার পুজো শুরু হয়েছিল। সেসব ইতিহাসের বিশেষ খোঁজ আর মেলে না। তবে আমাদের দেবী যে কাঠামোয় যে রূপে পুজো পান, তা বিরল।
১১০০ সালের মঙ্গলকাব্যের ধারা আজ প্রাচীন হতে হতে বইয়ের পাতাতেই মুখ লুকিয়েছে। যেমন বৈঁচির দাঁ সওদাগরদের সেই উজ্জ্বল দিনও আজ ইতিহাস। দাঁ বাড়ির চাতালে আজ সময়ের শেওলা জমাট বেঁধে কালচে রং নিয়েছে। নিচু হয়ে আসা দেবদেউলে শুধু রয়ে গিয়েছেন অভয়াদুর্গা, বাঙালিয়ানা আর মঙ্গলকাব্যের লুপ্ত যোগসূত্র হয়ে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ