সংবাদদাতা, রামপুরহাট: দুর্ঘটনার পরই নলহাটির অভিশপ্ত অবৈধ পাথর খাদানে প্রশাসনিক নজরদারি এড়াতে রাস্তা বিচ্ছিন্ন করল কারবারিরা। খাদান যাওয়ার শর্টকার্ট রাস্তা কোথাও কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও উঁচু করে পাথরের গুঁড়ো ফেলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার রাতেই খাদান মালিকের নামে এফআইআর করা হয়েছে। বিলাসবহুল বাড়ি ছেড়ে পরিবার নিয়ে সে চম্পট দিয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার আমনদীপ বলেন, অভিযুক্তের খোঁজ চলছে।
শুক্রবার দুপুরে নলহাটির পাথর শিল্পাঞ্চল বাহাদুরপুর ও ভোলা গ্রামের মাঝে অবৈধ পাথর খাদানের ধসে ছ’জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। চারজন শ্রমিক জখম হয়েছেন। জখমদের মধ্যে দু’জন বর্ধমান মেডিক্যালে, একজন কলকাতার একটি নার্সিংহোমে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। আর একজন রামপুরহাট মেডিক্যালে ভর্তি। ওই শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছিলেন নলহাটির বাগানপাড়ার এসারফ হোসেন। তিনি বলেন, মোট ১৩ জন শ্রমিক ছিল। তার মধ্যে আমরা ছ’জন একটি পাথরের স্তরে ড্রিল করছিলাম। বাকিরা শাবল দিয়ে পাথর ছাড়াচ্ছিল। হঠাৎই ধস নামায় ১০জন শ্রমিক পাথর চাপা পড়ে। আমি কোনওরকমে এযাত্রায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছি। গতবছর এই খাদানে একইভাবে দাদা মোশারফ হোসেনের মৃত্যু হয়। এখানে সুরক্ষা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই।
ওই খাদান যাওয়ার শর্টকার্ট রাস্তা কোথাও কেটে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও উঁচু করে পাথরের গুঁড়ো ফেলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে কেউই ওই খাদানে যেতে না পারেন। ঘুরপথে অভিশপ্ত সেই খাদানে পৌঁছে দেখা যায়, একের পর এক বিশাল এলাকাজুড়ে খাদান। শুক্রবার শ্রমিক ও লরি যাতায়াতে এলাকা গমগম করছিল। এদিন সেই এলাকায় হাতে গোনা দু’-চারজনকে দেখা যায়। এলাকার খাদান, ক্র্যাশার সবই বন্ধ। ওই খাদানটি প্রায় ১৫০ ফুট গভীর। খাদানে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য যত্রতত্র তার ও মেশিন, শ্রমিকদের হেলমেট ও জুতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। স্থানীয় একজন বলেন, ঘটনার পরে পুলিস এসেছিল, তারপর আর দেখা নেই।
খাদানের উপর দাঁড়িয়েছিলেন নলহাটির কুখুড়া গ্রামের নুরুল ইসলাম। তিনি ১৯বছর ধরে খাদানে শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি বলেন, চোখের সামনে এতজন শ্রমিক বেঘোরে মারা গেল। এখানে শ্রমিকদের অত্যন্ত নিম্নমানের হেলমেট দেওয়া হয়। শ্রমিকদের কোনও সুরক্ষা নেই। পেটের তাগিদে কাজ করতে হয়। কার কখন মৃত্যু হবে কেউ জানি না। এলাকার কয়েকজন শ্রমিক বলেন, মালিকারা শুধু টাকার পিছনে ছুটছেন। শ্রমিকদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই। অবৈধ খাদান থেকে প্রতিদিন টন টন পাথর লুট হচ্ছে, অথচ পুলিস-প্রশাসন নিশ্চুপ।
শুক্রবার রাতে অবৈধ খাদান মালিক ভুলু ঘোষের নামে থানায় এফআইআর দায়ের করেন নলহাটি-১ ব্লকের বিএলএলআরও রক্তিম ঘোষ। তারপর থেকেই পরিবার নিয়ে বেপাত্তা ভুলু। এদিন বাহাদুরপুরে তার বিলাসবহুল বাড়িতে তালা ঝুলতে দেখা যায়। বাড়ির চারপাশে সিসি ক্যামেরা লাগানো। এলাকার বাসিন্দারা জানান, ভলু একসময় পাথরের চিপস সরবরাহ করত। বছর দশেক আগে অবৈধ খাদান করে ফুলেফেঁপে ওঠে। বর্তমানে খাদান ছাড়াও ক্যাশার ও একাধিক ডাম্পারের মালিক। জেলাশাসক বিধান রায় বলেন, রাতে ওই খাদান এলাকার কাছাকাছি গিয়েছিলাম। খাদান মালিকের নামে এফআইআর হয়েছে। ওখানে অবৈধভাবে যাতে কোনও খাদান না চলে সেজন্য পুলিস ও স্থানীয় প্রশাসনকে নজরদারি চালাতে বলা হয়েছে। দ্রুত মৃত ও জখমদের পরিবার সরকারি ক্ষতিপূরণ পাবে।