নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: দলিল জাল করে সরকারি জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে কাঠা প্রতি চার থেকে সাত লক্ষ টাকা দরে। বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের পিলারের নীচের অংশ বিক্রি করা হচ্ছে স্কোয়ার ফুট হিসেবে। বেলঘরিয়ার রাজীবনগরে শ্যুটআউটের পিছনে সরকারি জমি নয়ছয়ের এই মধুভাণ্ডই অন্যতম কারণ বলে জানতে পারছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ, এসব কাজে সেভাবে কোনও বাধা না আসেনি, কারণ নিয়মিত বখরা পৌঁছে যেত শাসক দলের কেষ্টবিষ্টুদের কাছে। এখনও ওই এলাকায় যেসব নয়ানজুলি ও ফাঁকা জমি রয়েছে, সেগুলি বিক্রির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়েই শুরু হয়েছিল লড়াই। তাতেই খুন হতে হয়েছে এলাকার ‘নিয়ন্ত্রক’ মহম্মদ এনায়েতুল্লা ওরফে রেহানকে। এখনও এক অভিযুক্তের খোঁজ পায়নি পুলিস। তাঁর খোঁজে ভিন রাজ্যেও হানা দিলেও সাফল্য মেলেনি।
কামারহাটি পুরসভার ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের রাজীবনগরে গত মঙ্গলবার রাতে তৃণমূল কর্মী রেহানকে গুলি করে খুন করা হয়। রাজীবনগরের উপর দিয়ে বা গা ঘেঁষে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ছাড়াও গিয়েছে শিয়ালদহ-বারাকপুর, শিয়ালদহ-ডানকুনি রেললাইন এবং দক্ষিণেশ্বর মেট্রো। রেল ও জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের ওই ফাঁকা জমি ঘিরেই যাবতীয় লড়াইয়ের সূত্রপাত বলে জেনেছে পুলিস। এক্সপ্রেসওয়ের পিলারের নীচে টিনের ঘুপচি ঘরে থাকেন এক আয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘স্কোয়ার ফুটের হিসেবে আমার থেকে টাকা নিয়েছে। কয়েক হাত জায়গার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’ পাশের চালার বাসিন্দা একজন জানালেন, তাঁর থেকে নেওয়া হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। কে টাকা নিয়েছে? দু’জনেরই জবাব, ‘দাদারা নিয়েছে!’ তবে কোন দাদা, তা তাঁরা বলতে চাননি নিজেদের নিরাপত্তার সার্থেই। ফ্লাইওভারের অদূরে জমি কিনেছেন দক্ষিণ দমদম পুরসভা এলাকার এক ব্যক্তি। তিনি বললেন, ‘এই জমি আমি রেহানদের মাধ্যমে চার লক্ষ টাকা কাঠা দরে কিনেছি। আমরা কাজ করে খাই। এখানে কম টাকায় পেয়েছি জমিষ একটা টিনের চালা বানিয়েছি।’ কিন্তু জমিতো সরকারের! ওই ব্যক্তির দাবি, ‘তা বলতে পারব না। আমাদের কাগজ দিয়েছে।’ স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, মাছ ছয়েক আগ রেহান নিজের বাড়ি তৈরি করেছেন কয়েক বিঘা নয়ানজুলির একাংশ ভরিয়ে। এমনকী, প্রতিটি বাড়িতে আলো ও কেএমডিএর জলের লাইনের অস্থায়ী ব্যবস্থাও হয়ে গিয়েছে।
এহেন ‘লাভজনক’ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই আরেক প্রভাবশালী সুশান্ত রায়ের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়েছিল রেহানের। কয়েক বছর আগে ট্রাকচালক রেহানকে আশ্রয় দিয়েছিলেন সুশান্ত। তারপর স্থানীয় কাউন্সিলারের আশ্রয় ও পশ্রয়ে রেহান ‘আশ্রয়দাতা’ সুশান্তকেই এলাকা ছাড়া করেন বলে অভিযোগ। সুশান্তের সরকারি জমি দখলের চেষ্টা রেহান আটকে দিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, তারই বদলা নিতে এই খুন। স্থানীয় কাউন্সিলার দেবযানী মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘রেহান আমাদের সক্রিয় কর্মী ছিল। রেললাইনের ধারে তো প্রচুর বাড়িঘর থাকে। এক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে বলে ভেবেছি। সরকারি জমি বিক্রির বিষয়ে আমার জানা নেই।’