


‘ম’ শব্দটার ডান পাশে একটা ফুলদানি দিয়ে দিয়েছিলাম সেই কবে। মা ছবি হয়ে গিয়েছিলেন সেই ১৯৭৭ সালে। মায়ের যেই ছবিটা এখানে দিয়েছি, এমন হাসিমুখ আমার স্মৃতিতে নেই। মায়ের মুখে একটা করুণ কুয়াশা লেগে থাকত।
আমাদের ছিল বড় পরিবার। একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম, আরো অনেক ভাড়াটিয়া ছিল। একটা কয়লা রাখার ঘর ছিল, ওখানে অন্য ভাড়াটিয়াদেরও কয়লার বস্তা রাখা থাকত। ওখানে ঘুঁটের বস্তাও রাখা হত। সব ভাড়াটিয়াদের আলাদা আলাদা ঘুঁটের বস্তা। এই কয়লার বস্তা আর ঘুঁটের বস্তা রাখা নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া ঝামেলা হত। আমার মা ঝগড়া করতে পারত না একদম। খালি কাঁদতে পারত একা একা। আমার দাদু ছিল, ঠাকুরমা ছিল, আবার এক কাকা, একজন পিসি, আমরা ভাই বোন, বিরাট পরিবার। কত কাজ সামলাতে হত মাকে। পাঁচ ঘর ভাড়াটিয়া, একটা মাত্র কলঘর। ওই কলঘর বাদে একটা চৌবাচ্চা, একটা জলের কল, কর্পোরেশনের জল আসার সময় নির্দিষ্ট আছে। ঠিক সেই সময় কলসি নিয়ে জল আনতে যেতে হত। ভাড়াটিয়াদের স্নানের সময় নির্দিষ্ট করা ছিল। সেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাপড় কাচাকুচিও করতে হত। অবাক হয়ে ভাবি কী করে সম্ভব হত এসব। কয়লা ভাঙতে হত, সেই কয়লা দিয়ে ঘুঁটে সাজিয়ে উনুন ধরাতে হত। উনুনের ধোঁয়া বোতল দৈত্যের মতো বেরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বড়োরা কাশছে। সেই কাশির শব্দে মায়ের লজ্জা। মা কেন উনুনটা ধরাল? ডাল করার জন্য শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়েছে মা। ঝাঁজ, বড়োরা কাশছে। সেই কাশির শব্দে মায়ের লজ্জা। মায়েরই তো দোষ। ফোড়ন দিয়েছে মা। কাকা মুলো খায় না, দাদু মুলো ভালোবাসে। শুক্তোতে দেওয়া মুলোগুলো কাকার বাটি থেকে দাদুর বাটিতে তুলে রাখতে ভুলে গেছে মা। মাকে বকেছে ঠাকুরমা। আজ ত্রয়োদশী, বার্তাকু ভক্ষণ নিষেধ, সকালবেলা বলে গিয়েছে দাদু, তা সত্ত্বেও মা মাছের ঝোলে বেগুন দিয়েছে। ঠাকুরমা বকেছে মাকে। পিসিরা কুঁচি দেওয়া শাড়ি পরে সেলাই শিখতে যেত, মায়েরও শখ ছিল সেলাই শেখার। মা ভরতি হওয়ার বাসনাকে মুচড়ে দিয়ছিল এভাবে, নানাভাবে। নানারকমভাবে কষ্ট পেত আমার মা। আমার মা একা একা কাঁদত।
সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলে একটা বটগাছ, তার লাল লাল ফল নিয়ে ছাদের কোনায় ঝুঁকে থাকত। আমার মা একা একা ওই বট গাছটার কাছে মনের কথা জানাত। খুব ছোটোবেলাতেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার মায়ের বড় কষ্ট। আমার মায়ের নাকি মা ছিল না, ছোটোবেলায় মরে গিয়েছিল। মা মায়ের এক কাকার বাড়িতে মানুষ। সেই সময় কী করে রবীন্দ্র সংগীত শিখেছিল কে জানে, ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল, আর একটু সময় পেলেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করত মা। ‘ওই আসন তলে মাটির পরে লুটায়ে রব...’, ‘আরও আরও প্রভু আরও, এমনি করে আমায় মারো...’, মা গান করছে আর আমার ছোটো বোনটা বারান্দায় হাগু করে ফেলেছে, ছি ছি ছি এখন কি গান মানায়? অথবা মা গান করছে আর দাদু কথামৃত পড়ছে। ছি ছি এখন গান করতে আছে?
আমাদের একটা বারান্দা ছিল, কালো খড়খড়ে মেঝে। আমার বাবা ছিল স্কুলের মাস্টারমশাই। বাবার কাছে মাঝে মাঝে চকের টুকরো পেতাম। ওই চকের টুকরো দিয়ে খড়খড়ে মেঝেতে কিছু লিখতাম। তখন সদ্য সাক্ষর আমি। অক্ষরের সঙ্গে অক্ষর জুড়তে শিখেছি। কোনো বাক্য তৈরি করতে শিখেছি। কী লিখতাম আমি খড়খড়ে মেঝেতে? মায়ের কষ্টের কথা লিখতাম? মায়ের দুঃখের কথা লিখতাম? নইলে কেন মা তাড়াতাড়ি একটা জল ন্যাকড়া দিয়ে আমার সেই লেখা মুছে দিত? মা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলত, এসব লিখতে হয় না। পিসির বিয়ে হল, কাকা চাকরি পেল, আমিও কলেজে। বাগবাজারের বাসা বাড়ি থেকে আমরা চলে গেলাম বিরাটিতে, একটা উদ্বাস্তু কলোনিতে। সে বাড়িতে মাটির মেঝে, টিনের চালা। ঝড় হলে বাড়িটা কাঁপে। বৃষ্টিতে ঝমর ঝমর শব্দ, সেই সঙ্গে ঘরেও টুপটাপ জল। আমাদের নিজেদের টিউবওয়েল ছিল না তখনও। কলোনির এজমালি টিউবওয়েল থেকে খাবার আর রান্নার জল আনতে হত, আর কাছেই একটা পুকুর। সেই পুকুরে স্নান, কাপড় কাচা, বাসন মাজা। বাগবাজারের বাসায় বাসন মাজার জন্য সন্তোষের মা ছিল। এখানে কেউ নেই। একা মা। এখানে মায়ের হাসি দেখেছি তবু। পাড়া পড়শিদের সঙ্গে গল্প গাছা, কে কী রান্না করেছে, কড়াইশুঁটির কচুরি কী করে করতে হয়, নারকোল পচে গেলে তা দিয়ে কী করে বড়া বানাতে হয়, ছাগলের নাদি লাউ গাছের গোড়ায় দিলে লাউ কত বড়ো হয়, বেগুন কী করে ভাজলে তেল কম লাগে, বজরার আটা দিয়ে কীভাবে রুটি করা যায়— এইসব কত কথা। তখন চালের টানাটানি। রেশনে চাল কম, গম বেশি। তাও মাঝে মাঝে গমেরও আকাল। তাই বজরার আটা। বাবা চাল নিয়ে আসতেন বারাসত কিংবা হাবড়া থেকে, লুকিয়ে-চুরিয়ে। কারণ তখন চালের কর্ডনিং। সময়টা ১৯৬৬। খাদ্য আন্দোলন, গুলি।
এই কলোনির বাড়িটা আমরা কিছুদিনের জন্য নিয়েছিলাম। কারণ কাছেই একটা জমি কিনেছিলেন বাবা। ওখানে আমাদের বাড়ি হচ্ছিল। হ্যাঁ, নিজেদের বাড়ি। নিজেদের বাড়িতে নিজেদের টিউবওয়েল, নিজেদের হাঁসের ডাক, নিজেদের উঠোন, নিজেদের কামিনী ফুলের গাছ, কামিনী ফুলের নিজেদের গন্ধ। নিজেদের উঠোনের এক কোণে নিজেদের মানকচু গাছ। দুটো ঘর হয়েছিল, একটা মেঝের সিমেন্টের, আরেকটার নীচে হয়নি, ওটা মাটির। এই মেঝে না হওয়ার ঘরটাকে মাটির ঘর বলতাম। পরে মেঝে হয়েছিল, কিন্তু মাটির ঘর নামটা থেকেই গিয়েছিল। এমব্রয়ডারি করে সাদা সুতো দিয়ে তাজমহল তৈরি করেছিলেন মা, ওখানে লাল সুতোয় লেখা ছিল তাজমহলের মর্মরে গাঁথা কবির অশ্রু জল। পুব দিকের জানালায় সকালবেলায় সুখের রোদ্দুর। একটা বড়ো পুকুরে হাঁসেদের সুখভ্রমণ।
বড়ো অল্পেই সুখী মা। চায়ে ডুবিয়ে কড়কড়ে টোস্ট বিস্কুট খেতে খেতে মায়ের মুখে সুখে থাকা ফুটে উঠত। মুড়ির সঙ্গে একটু চানাচুর, রুটির সঙ্গে একটু পাটালি গুড়, ব্যস— আর কী চাই। ফুলদানি সাজাত, এত ফুল কোথায়? কুলগাছের শুকনো ডালপালা, বাঁশের কঞ্চি, নারকোলের ছোবড়া, এসব ধূসরতার সঙ্গে একটা কলাবতী ফুলের ডাল, অথবা কামিনী ফুলের পাতার সবুজ মিশিয়ে কী একটা ম্যাজিকসুন্দর ব্যাপার তৈরি করত। মা নিশ্চয়ই জানত না একে ‘ইকাবানা’ বলে। আমিও জেনেছি পরে। একটা রেডিমেড টেবিল, তাতে ঢাকনি, চার কোনায় সূচ সুতোয় ফুটে উঠত ফুল। টোপা কুলগাছের গা বেয়ে সন্ধে নামত। মা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ডাকত আয় আয় আয় চই চই...। শীতকালে সকালের রোদ্দুর ছাগলছানা হয়ে উঠোনে লাফাত। মায়ের হাসিমুখ দেখেছি তখন। আমার পরের বোনের বিয়ে হল, আমিও চাকরি পেলাম। উইমকো কোম্পানিতে। দেশলাই কাঠি তৈরি করে এরা, সুইস কোম্পানি। বিক্রির সঙ্গে জড়িত কাজ, কিন্তু বিক্রির সমস্যা ছিল না কোনো। ঘোরাঘুরি ছিল। বিহারের একটা বড়ো অংশে। সপ্তাহের সাতদিনই কাজ। মাস গেলে পরপর পাঁচদিন ছুটি। প্রথম মাস কাজের শেষে বাড়ি এলাম, মায়ের হাতে ৫০০ টাকা তুলে দিলাম।
পাঁ-আ-আ-আ-চ-শো? এত টাকা?
তখন সত্যিই অনেক টাকা। বাবা হয়তো সাড়ে তিনশো পেতেন। তখন খাসির মাংসের কেজি পাঁচ টাকা, দু’টাকায় এক দিনের বাজার হয়।
মায়ের মুখে শাপলা হাসি।
বেশি দিন করতে পারিনি এই চাকরিটা। নিজের দোষেই। কাজে ফাঁকি দিয়েছিলাম। বিহার শরিফে ডিউটি পড়েছিল, আমি করলাম কি ১৬ কিলোমিটার দূরে নালন্দায় সারাটা দিন কাটালাম। আমার উপরওয়ালা বিহার শরিফে এসে আমায় পেলেন না। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কোথায় ছিলে তুমি সারাদিন? আমি বলেছিলাম নালন্দা। ‘কেয়া, উধার কুছ মার্কেট হ্যায়, কেয়া?’ কী করে বোঝাই ওদের যে মার্কেট নয়, নালান্দা দেখতে গিয়েছিলাম। চাকরিটা চলে গিয়েছিল। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল কিচ্ছু ভাবিস না তুই আবার পাবি চাকরি। মায়ের কথা মিলে গিয়েছিল, কিছুদিনের মধ্যেই আবার চাকরি পেলাম। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি রাজস্ব দপ্তরে। যদিও মাইনে আগের চেয়ে অনেক কম। আমাদের সব ঘরে ফ্যান ঘুরল। মাটির ঘর সিমেন্টের হল। মা সেলাই শিখতে সেলাইয়ের ইশকুলে ভরতি হল। চাউমিন রান্না শিখে বাড়িতে বানাল। পাশের বাড়ির মোটা কাকিমা বলল, আজব জিনিস। দেখতে কেঁচোর মত হইলে কী, খাইতে ভালো। বাড়িতে মা বোঁদে করল, পাশের বাড়ির কাকিমা বলল, কী ধৈর্য গো দিদি, একটা একটা কইরা গুল্লি পাকাইছেন?
আমাকে চাকরির কারণে বর্ধমান জেলার গ্রামে থাকতে হত। আসার সময় বর্ধমান থেকে গোবিন্দভোগ চাল নিয়ে আসতাম, পায়েসের মধ্যে মায়ের আনন্দ সর হয়ে লেগে থাকত। মা-বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলাম একবার, আমার কর্মগ্রামে। বিরাট ধানখেতের দিকে তাকিয়ে দু’হাত মেলে দিয়ে খুব আস্তে আস্তে বলেছিলেন, ইশশ, আমি যদি ধানখেত হইতাম, হলুদ, হলুদ...।
এবার অন্য চাকরি। হাওয়া অফিস, দমদম এয়ারপোর্টে। বাড়ি থেকে যাওয়া আসা সাইকেলে। অ্যালুমিনিয়ামের বাক্সে মায়ের দেয়া টিফিনে মালপোয়া বা মুলোর পরোটা। বাড়ির সামনে পুকুরে মায়ের পোষা হাঁস। আয় আয় আয় চই চই...।
মায়ের জ্বর। কমছেই না। গায়ের রং হলুদ। জন্ডিস। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় যতক্ষণ সম্ভব পিছনে ফিরে তাকানো। আমরা তখন বিরাটিতে। বাড়িতে উপরে উঠছে লাউগাছ। মায়ের দৃষ্টি লাউগাছটির দিকে।
১৯৭৭ সাল, আগস্ট। শ্মশান। শ্মশানের দেওয়ালে তখনও লেখা— কমল তোমায় লাল সেলাম। মুক্তি ছিনিয়ে আনব কথা দিলাম। মা পুড়ছে। ধোঁয়ায় মা পোড়া গন্ধ। এরপর যতবার শ্মশানে গিয়েছি, এই গন্ধে মা চলে আসে। আর ধানখেতের দিকে তাকালেও সেই হলুদে মা আমার শুয়ে থাকে।