জেরুজালেম: উত্তাপ শুধু ইরান বা ইজরায়েল সীমান্তে থেমে নেই। আমেরিকা সরাসরি আসরে নামার পর আঁচ এখন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পশ্চিমি দুনিয়ায়। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি জানিয়ে দিলেন, ইরানের শাসক খামেনেইকে সরাবই। আর অন্যদিকে পূর্ব হুঁশিয়ারি মতোই কাতার ও ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। আমেরিকার বিরুদ্ধে এই প্রত্যাঘাতের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন বেশারাত ফাহতা’। ইরানের সরকারি টেলিভিশন জানিয়েছে, কাতারের আল উদেইদ এয়ার বেস লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইরাকে আমেরিকার এইন আল আসাদ বেসকে টার্গেট করে ছোড়া হয়েছে রকেট। যদিও কাতার জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তারা মাঝ আকাশেই প্রতিহত করেছে। এই অবস্থায় কাতার, ইরাক, বাহরিন ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি তাদের এয়ারস্পেস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে যাওয়া সব বিমান বাতিল করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। এছাড়া, এদিন সিরিয়ার পশ্চিম হাসাকাহ প্রদেশেও মর্টার হানার খবর মিলেছে। এই অবস্থায় রাতেই হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জরুরি বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘আগে থেকে জানিয়ে হামলা করার জন্য ইরানকে ধন্যবাদ। সেই হামলা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ফলে কোনও ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি। ওদের ১৪টি মিসাইলের ১৩টিই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বাকি একটি ছিল দিশাহীন। ’
মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে ইরানের হামলা শুরুর আগেই অবশ্য এদিন তেহরানে পালাবদলের ডাক দেন ট্রাম্প। নিজের ‘ট্রুথ’ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ শব্দটা ব্যবহার করা রাজনৈতিকভাবে ঠিক নয়। কিন্তু ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা যদি ইরানকে আবার মহান করে তুলতে না পারে, তাহলে কেন পালাবদল হবে না?’ অথচ, ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ হামলার পর আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স জানিয়েছিলেন, তাঁদের এই যুদ্ধ তেহরানের বিরুদ্ধে নয়। শুধুমাত্র ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে। কিন্তু একদিনের মধ্যেই ট্রাম্প সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটায় ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরানের যাবতীয় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলে থাকেন খামেনেই। তাই শাসনব্যবস্থা বলতে ট্রাম্প যে নাম না করে খামেনেইয়ের কথাই বলতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’-এর আদলে ‘মেক ইরান গ্রেট এগেন’-এর ডাকও দিয়েছেন ট্রাম্প। রবিবারের হামলার পর ইরানের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকই তাঁদের নিশানায় রয়েছেন। আর তারপরই মার্কিন নাগরিকদের প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে ওয়াশিংটন। কাতারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তরফে আমেরিকার নাগরিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়, যাঁরা পশ্চিম এশিয়ার ওই দেশে আছেন, নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। পরবর্তী নোটিস না জারি হওয়া পর্যন্ত বাইরে বেরবেন না।
ইরান-ইজরায়েলের সংঘাতের মাত্রাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। আর তার প্রধান লক্ষ্য ইরানের পরমাণুকেন্দ্র ফোরদো। রবিবার রাতে এই পরমাণুকেন্দ্রে ১২টি বাঙ্কার বাস্টার ফেলেছিল আমেরিকা। সোমবার ফের ফোরদোকে টার্গেট করে ইজরায়েলি সেনা। এদিন সেখানে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে বলে ইরানের সংবাদমাধ্যমের দাবি। নতুন করে আক্রমণের ফলে সেখানে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানা না গেলেও রাত পর্যন্ত সেখান থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ হয়নি বলে দাবি করেছে তেহরান। রাজধানী শহরেও এদিন পরপর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইরানের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যে ভিডিও প্রকাশ করেছে, তাতে তেহরানের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিরাট ধোঁয়া-ধুলোর কুণ্ডলী দেখা গিয়েছে। ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা শুধুমাত্র ইরানের সেনা এলাকাকেই টার্গেট করেছে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড, গোয়েন্দা দপ্তর, কুখ্যাত এভিন কারাগারও রয়েছে। এদিন ইজরায়েলি সেনা ছ’টি বিমানবন্দরকে নিশানা করে আক্রমণ চালায়। ইরানের সেনা ওই বিমানবন্দরগুলি ব্যবহার করে থাকে। ওই হামলায় ১৫টি ফাইটার জেট ও হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে এফ-১৪, এফ-৫ এর মতো যুদ্ধবিমানও রয়েছে। ইজরায়েলি সেনার দাবি, গুঁড়িয়ে গিয়েছে ইরানের বহু মিসাইল লঞ্চারও। তবে হাল ছাড়তে নারাজ ইরান। এদিনও তারা পাল্টা জবাব দিয়েছে। ইজরায়েলের হাইফা, আসদোদ ও রাজধানী তেল আভিভ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। জেরুজালেমেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে।