নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘টিভিতে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, কতগুলো পরিবারে কী বিপদ নেমে এল! তাঁদের মধ্যে একটি পরিবার যে আমারই জামাইবাবুর, স্বপ্নেও ভাবিনি। এই যে ট্রমা সেন্টারে এলাম, বারবার মনে হচ্ছিল, অন্য কারও খোঁজ নিতে এসেছি। আমার জামাইবাবুর জন্য এসেছি, ভাবতে পারছি না!’ বুধবার বিকালে এসএসকেএমের ট্রমা সেন্টারের সবাইকে উদভ্রান্তের মতো একটা কথাই জিজ্ঞাসা করছিলেন বীরেন মাহাত—‘কৃষ্ণ চৌধুরীর কোনো খবর দিতে পারবেন?’ একটু থিতু হওয়ার পর কল্যাণীর বাসিন্দা বীরেনবাবু বললেন, ‘জামাইবাবুর বাড়ি জগদ্দল। বাড়িতে ওর মা, স্ত্রী মানে আমার দিদি এবং ওঁদের তিন সন্তান। হাসপাতালের স্টাফদের জামাইবাবুর ছবি দেখালাম। কাগজপত্র দেখিয়ে শনাক্ত করলাম। জানেন, ওর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছিল, রাখী পূর্ণিমার দিন ওরা আমার বাড়িতে আসবে। এলে আর দেখতে হত না …রাজ্যের গল্প-আড্ডা। এই কাজের জন্য ও তো রোজ বাড়ি ফিরতে পারত না। ১৫ দিন অন্তর যেত। ওই জন্য ইচ্ছা থাকলেও সবসময় দেখা হত না। এবারে একেবারে ফাইনাল হয়ে গিয়েছিল কথা। বলেছিল আসবেই।’ তারপর বললেন, ‘দিদিকে কিছু বলিনি এখনও। কীভাবে জানাব এই খবর, ভাবতে পারছি না।’ ট্রমা সেন্টারে তখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা। পুলিশকর্মীরা র্যাম্পে ওঠার রাস্তা ফাঁকা করে রাখছেন, যাতে গ্রিন করিডরে তারাতলা থেকে এখানে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলির এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না হয়। পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের ব্যবধানে ঢুকছে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স। যাঁদের নামানো হচ্ছে, তাঁদের সারা শরীর ঢালাইয়ের সিমেন্টে সাদা হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালের স্ট্রেচারে তুলে দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে তিনতলার ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্ডে। স্বাস্থ্যসচিব, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, প্রাক্তন পুরমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিকর্তা, স্বাস্থ্য অধিকর্তা (শিক্ষা) পরপর ঢুকলেন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে। সন্ধ্যায় হাসপাতালে আসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। একদিকে যখন এসব চলছে, তখন সুদূর বিহারের মুঙ্গের থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছেন রোহিত কুমার। আসার পথে পিজিতে উপস্থিত তাঁর প্রতিবেশীকে ফোন করে যাচ্ছিলেন। কারণ, এক-দু’জন নয়, তাঁর পাঁচ ভাই ও বাবা— সবসুদ্ধ এক পরিবারের ছ’জন ভিডিএফ ফ্লোরিংয়ের কাজ করছিলেন তারাতলার এই গোডাউনে। একতলার কাজ চলছিল। মনু, মানিক, সোহিত, শিরচন্দ, প্রেম ও তাঁদের বাবা রাজেন্দর রাম। চারজন ভর্তি পিজিতে। দু’জনের কোনো খোঁজ নেই। বিহার থেকে পরিজনদের নিয়ে রোহিত তখন মাঝরাস্তায়, আসানসোলে।



