


অরূপ দে, বরানগর: ‘বরানগরের এনার্জি, সায়ন্তিকা ব্যানার্জি...।’ ২০২৪ সালে উপনির্বাচনের প্রচারে এই স্লোগানে ঝড় তুলেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সেবার ৪৩.৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে বরানগর দখল করেছিল ঘাসফুলের প্রার্থী। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির সজল ঘোষের সঙ্গে ব্যবধান ছিল ৮ হাজার ১৫০ ভোটের। এসআইআরে সাড়ে ৩৪ হাজার ভোটার হারিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের মুখোমুখি দু’জন। রাজ্য রাজনীতিতে বরানগর বরাবর আলোচিত আসন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, টানা ৬ বার এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন স্বয়ং জ্যোতি বসু। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯১, টানা চারবার আরএসপির প্রথম সারির নেতা মতীশ রায়কে নির্বাচিত করেছে এই কেন্দ্র। আরএসপির অমর চৌধুরীও বরানগর থেকে জিতে রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই অর্থে বাম দুর্গ হিসাবেই পরিচিত ছিল এই কেন্দ্র। ছন্দপতন ঘটে ২০১১ সালে। পালাবদলের সাক্ষী ছিল গঙ্গার পূর্বপারের এই শহরও। মানুষ নির্বাচিত করেছিল তৃণমূল প্রার্থী তাপস রায়কে। ২০২১ পর্যন্ত টানা। কিন্তু চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগে দলবদল করে পদ্ম শিবিরে নাম লেখান তিনি। ফলে লোকসভা ভোটের সঙ্গেই উপনির্বাচনের লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল বরানগরবাসীকে। বেছে নিয়েছিল স্বয়ং ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী’ অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই থেকে বরানগরের মাটি কামড়ে পড়ে আছেন তিনি। জয়ের পর টলিউড সংস্রব দূরে সরিয়ে রোদ-জলে পুড়ে রাজনীতির ময়দানেই এখন বেশি স্বচ্ছন্দ। দলীয় কর্মীর জন্মদিন হোক, কিংবা পাড়ার প্রবীণদের পিকনিক— পাশের বাড়ির মেয়ের মতোই হাজির সায়ন্তিকা।
এই জনসংযোগ এবং আত্মবিশ্বাসের জেরেই জয় বা জয়ের ব্যবধান নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই তাঁর। বরং বরানগরকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সেই পরিকল্পনাতেই ব্যস্ত সায়ন্তিকা। ‘জিতলে কী করবেন বরানগরের জন্য?’ এই প্রশ্নে খানিকটা অসন্তুষ্টই হয়েছিলেন তিনি। ভরদুপুরে টবিন রোডের নির্বাচনি কার্যালয়ের একচিলতে ঘরে দলীয় বৈঠকের মাঝেই সটান জবাব, ‘জিতলে নয়। জিতবই।’ তারপর বলতে শুরু করলেন বরানগর ঘিরে তাঁর আগামীর প্ল্যান। ‘দেড়-দু’বছর সময় পেয়েছি। তার মধ্যে রাস্তা মেরামতির জন্য ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ আনতে পেরেছি। অলিগলিতে ঢালাই রাস্তা হয়েছে। বরদা বসাক স্ট্রিটের মতো কয়েকটি বড় রাস্তায় ম্যাস্টিক অ্যাসফল্টের কাজ হয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে আলো লেগেছে। এবার আমার টার্গেট জল জমার সমস্যা মেটানো। অনেক বড়ো কাজ। অনেক টাকার ব্যাপার। কিন্তু আমার বিশ্বাস এটাও পারব... ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা হয়ে আছে ইতিমধ্যে। ডিপিআরও তৈরি। ভোট মিটলেই সেটা প্লেস করব রাজ্যের কাছে। দিদি বরানগরকে ফেরাবেন না।’ কিন্তু লড়াইটা কি এতটা সহজ এবার? ষষ্ঠীতলা, বরানগর বাজার কিংবা সোনালি সিনেমা হলের মতো কিছু পকেটে সান্ধ্য বৈঠকে জোর আলোচনা, ‘আগেরবার সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্য ২৭ হাজারের মতো ভোট না পেলে জিতত না তৃণমূল।’ যদিও সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, বর্তমানে বরানগরের ৩৪ ওয়ার্ডের মাত্র ২টি সিপিএমের কব্জায়। বাকিটা সবুজে সবুজ। গেরুয়ার তো লেশমাত্র নেই। তাহলে কোন ভরসায় টক্কর দেওয়া যাবে তৃণমূলকে? বিজেপি প্রার্থী সজল ঘোষের দাবি, ‘বরানগর বদল চাইছে। এখানে নর্দমা তৈরি করলেও কাটমানি খায় শাসক দল। ওগুলো কার পয়সা? জনগণের। যে নেতারা তৃণমূল প্রার্থীকে ঘিরে রয়েছেন, তাঁদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।’ ছোট হ্যান্ড মাইক নিয়ে প্রচারে একই কথা বলছেন গলার শিরা ফুলিয়ে। কিন্তু আর্তিও রয়েছে একটা—‘একবার আমাদের সুযোগ দিয়ে দেখুন। একবার...’। আর সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্রের বক্তব্য, ‘আমাদের ভোট ব্যাংক যে অটুট, গত নির্বাচনই তার প্রমাণ। এবার আরও ভালো ফল করব। মানুষ বিরক্ত তৃণমূলের উপর। ওদের বিরুদ্ধে এবার সুনামি হবে।’
বিরোধীদের এসব ‘আজগুবি’ দাবি নিয়ে অবশ্য মাথা ঘামাচ্ছেন না সায়ন্তিকা। কারণ, লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে বরানগরে তৃণমূল এগিয়ে ১১ হাজার ৯৭৭ ভোটে। এর উপর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা-দেড়টা, আবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বরানগর চষে বেড়াচ্ছেন তৃণমূল প্রার্থী। সমানতালে পাল্লা দিচ্ছেন কর্মীরাও। এক ঝলকে দেখলে বরানগরের সব দেওয়াল এখন তৃণমূলের দখলে। প্রার্থীর দাবি, ‘এটাই হচ্ছে তৃণমূল। বিজেপি তো এজেন্সি দিয়ে দেওয়াল লেখায়। কিন্তু আমাদের সম্পদ কর্মীরাই। দেওয়াল লেখার জন্য দলের ফান্ড এসেছে। কিন্তু তা নিতে পর্যন্ত আসেননি তাঁরা! বিরোধীরা বদলের কথা বলছেন! আমিও বদল চাই। বরানগরের নিকাশি ব্যবস্থার, পানীয় জল সমস্যার। আর সেটা করবই।’