Bartaman Logo
২১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শাসক আমি, বিরোধীও আমি...

বাংলার রাজনীতিতে ডবল ইঞ্জিনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা। বিরোধী দল ভাঙার অপারেশন ও ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে বিস্তারিত জানুন।

শাসক আমি, বিরোধীও আমি...
  • ২১ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজনীতির ওঠাপড়া

Advertisement

হিমাংশু সিংহ: বাংলা এখন ডবল ইঞ্জিনের কামাল দেখছে! সেই মাহাত্ম্যে যাঁদের উলটো করে ঝোলানোর কথা তাঁদের কেউ কেউ আজ জেলে থাকলেও বাকিরা গেরুয়া শক্তির সৌজন্যে বঙ্গ রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি! তৃতীয় অংশটা সংসদে মোদিজির দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন জেতার অস্ত্র। অভিযোগ যাই থাক, তাঁদের ছুঁয়ে দেয় এমন সাধ্য কোন এজেন্সির আছে! যতদিন সমর্থন ইডি, সিবিআই সব দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। এর নাম কি গণতন্ত্র!
সংসদীয় দলে বিক্ষুব্ধদের আচরণও দু’রকম। রাজ্যসভার তৃণমূল সদস্যরা দলের সঙ্গে পদও ছেড়েছেন। সুখেন্দুশেখর, সুস্মিতা দেব…। নৈতিকতার মানদণ্ডে তাঁদের বাড়তি পাঁচ নম্বর দিতেই হবে। কিন্তু লোকসভার মহামান্য সুদীপ, দেব, রচনা, জুন, কাকলিদেবীরা দল ছাড়লেও এমপি পদ ছাড়তে নারাজ। ছাড়া না ছাড়া তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আইন আইনের পথেই চলবে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, মহান দেশসেবার কোন তাগিদে তাঁরা গেরুয়া নেতৃত্বের বেছে দেওয়া অজানা দলের ছাতার নীচে ভিড় করলেন? এঁদের কেউ এনসিপিআইয়ের প্রতীকে জিতে আসেননি। সাঁকরাইলে অনামী দলটার অফিসেও আগে যাননি। বিজয়ার পর কস্মিনকালে দলের প্রতিষ্ঠাতা শিউলি কিংবা উত্তীয় কুণ্ডুর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ও হয়নি। কিন্তু এই সংকটকালে ডবল ইঞ্জিন দেখাল কত সহজে ‘পর আপন, আর আপন পর’ হয়ে যায় বেচাকেনার রাজনীতিতে! ভোজবাজির মতো বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেসকে দশ গোল দিয়ে এনসিপিআইয়ের হাতে আজ ২০ জন এমপি। লোকসভায় রাজ্যের বৃহত্তম দল। সংখ্যাটা বাড়বে! কিন্তু এরাজ্যের রাজনীতির প্রেক্ষিতে বিগত চব্বিশের সাধারণ নির্বাচনটাই অর্থহীন হয়ে গেল না কি? আসন্ন উনত্রিশের লোকসভা ভোটে ওই দলবদলু ২০ জন এনসিপিআইয়ের প্রতীকেই দাঁড়িয়ে জেতার শপথ নিতে পারবেন তো? গণতন্ত্রের এই নৃশংস হত্যার সঙ্গে কোন দলের স্বার্থ জড়িয়ে?
বঙ্গ রাজনীতির সফলতম গেরুয়া সভাপতি শমীকবাবুও কি আঁচ করতে পেরেছিলেন এরকমটা হবে! ভালো আর মন্দের দ্বন্দ্বে তিনি দরজায় খিল এঁটে সেই ৪ মে দুপুর থেকে ঠায় বসে আছেন। কিন্তু তাঁর গোচরে কিংবা অগোচরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মদতে ফাঁকফোকরের অভাব যেমন নেই, তেমনি সুযোগসন্ধানীরাও সংখ্যায় কম নয়। বিজেপিপন্থী এই ব্লকের আত্মপ্রকাশও দিল্লির প্রশ্রয়েই! বার্তা একটাই, সমর্থন দাও ডিম থেকে বাঁচো। তৃণমূলের একটা অংশ পুছতাছ শেষ হলেই জেলে। দ্বিতীয় অংশ দল ভেঙে কখনো ভূপেন্দ্র যাদব আবার কখনো লোকসভার স্পিকারের বাড়িতে। ‘আমরা খারাপদের সঙ্গে থাকব না, সৎ পথে মাথা উঁচু করে চলব’, এমন ভাব দেখিয়েই শাসকের নয়নের মণি। কলকাতা থেকে দিল্লি আপাতত তাঁদের জামাই আদর! গাছের খেয়ে তলার কুড়োচ্ছে।
ভেবেছিলাম বাংলায় বিজেপির ক্ষমতা দখল যখন সম্পূর্ণ হয়েছে দলবদলুদের নেগেটিভ রাজনীতিরও বুঝি ইতি। একুশের ভোটের আগে যিনি দল ছেড়েছিলেন তিনিই যখন মুখ্যমন্ত্রী, তখন মোক্ষলাভ হয়ে গিয়েছে। এবার সব ভালো হবে! দল ভাঙাভাঙির কুনাট্যেরও সমাপ্তি ঘটবে। সংঘ পরিবার আগমার্কা নতুন নতুন মুখ নিয়ে আসবে সামনে। নতুন শিল্প, সেতু, রেলপথ এবং দু’শো উজ্জ্বল প্রকল্পের মতোই বাংলার রাজনীতিতেও নতুন প্রতিভাবান সংগঠক, নীতিনিষ্ঠ নেতার আবির্ভাব হবে পুরানোদের বিদায় দিয়ে। সরকারের দেড় মাস পেরতে না পেরতেই আক্কেল গুড়ুম! আগাপাছতলা পাঁকে নিমজ্জিত দলটার এমপি-এমএলএদের নিয়েই পারমিউটেশন কম্বিনেশন চালাচ্ছে গেরুয়া শক্তি। দেড় মাসে মানুষের প্রত্যাশাপূরণ কতটা হয়েছে, হকারদের পেটে লাথি মারার পরিণাম কী, ১৩ পাতার ফর্মের জাঁতাকলে সওয়া দু’কোটি লক্ষ্মীর সবাই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পাবেন কি না, শিল্পের জোয়ার কবে আসছে টাটাদের হাত ধরে... এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের আগেই বিরোধী দল ভাঙার অপারেশন মধ্যগগনে। উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। অমিত শাহদের গালভরা সংকল্প পত্রে এসবের উল্লেখ না থাক, এটাই সোনার বাংলায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায়। 
বাংলার জনগণ গেরুয়া শক্তিকে সমর্থন জানানোর প্রশ্নে কোনো কার্পণ্য করেনি। মমতার সাজানো বাগান ছারখার করে ২০৮ আসনে জিতেছে বিজেপি। ক্ষমতা এমনই ভয়ংকর বস্তু যে সহজে মন ভরে না। যত পাওয়া যায় মন ততই বলে, আরও চাই। অথচ একতরফা রাজনীতির অবসান ঘটাতেই মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে। তবুও বঙ্গ রাজনীতির একপেশে কলঙ্ক ঘুচল কি? স্পিকার সাহেব ঋতব্রতবাবুকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দিয়েছেন। হাইকোর্টও স্পিকারের সিদ্ধান্তের পক্ষেই রায় দিয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে লেখা থাকবে বিরোধী দল ভেঙে পছন্দের বিরোধী নেতা বেছে নেওয়ার কাজটি সুসম্পন্ন হয়েছে শাসক দলের প্রশ্রয়েই! গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে কি এটা সুস্থ নিদর্শন। গণতন্ত্রে হাউস বিলংস টু অপোজিশন। এটাই সংবিধানেরও স্পিরিট। শাসকের অঙ্গুলিহেলনেই যদি বিরোধীদের প্রতিবাদের সুর কখন চড়া আর কখন নরম তা নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে তো সেই থোড় বড়ি খাড়াই ভবিতব্য। শাসকের আইন চলছে না, আইনের শাসন বলার লোক রইল কোথায়? 
ভরাডুবির দিনে বিদ্রোহ যেকোনো দলেই সংক্রামক ব্যাধি। যদি তা দিল্লির শাসকের প্রশ্রয় পায় তাহলে সার জল পেয়ে দ্বিগুণ গতিতে তর তর করে বাড়তে বাধ্য। সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ করতে দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন চাই। সেই লক্ষ্যপূরণেই ছুটছে বিজেপি। সেখানে নীতি নৈতিকতার পাঠ ব্রাত্য। এমপি-এমএলএদের কাছে টেনে আইনসভাকে বিরোধীহীন করার কুনাট্য মঞ্চস্থ হচ্ছে সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে। তখন দুর্নীতি, নৈতিকতা আর ইস্যুই নয়। ওই ফরমুলাতেই ঋতব্রতর গুরুত্ব আজ শোভনদেবের চেয়ে বেশি। বিধানসভায় এই মুহূর্তে বিজেপির ২০৮ জন বিধায়ক। আর বিজেপিপন্থী ঋতব্রত তৃণমূলের ৬৫ জন। দুটো যোগ করলে কী দাঁড়াল? ২৭৩। কালীঘাট তৃণমূলের ১৫ জনও সীমানায় দাঁড়িয়ে। দেনা পাওনার রাজনীতিতে প্রত্যাশিতভাবেই আজ রাজ্য বিধানসভা কার্যত বিরোধী শূন্য হওয়ার পথে। 
তৃণমূলের পর উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনায় ভাঙন ধরানোর কাজটাও শুরু হয়ে গিয়েছে। ৯ জনের মধ্যে ৬ জনই গেরুয়ামুখী। এবার কি পালা অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির? মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে আসন পুনর্বিন্যাস, এক দেশ এক ভোট, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি—পর পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল লোকসভায় পাশ করাতে চলেছে বিজেপি। এজন্য দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন দরকার। এই মুহূর্তে এনডিএ ‘ম্যাজিক ফিগারে’র অনেকটাই দূরে। সেকারণেই বেছে বেছে বিরোধী দলগুলিকে ছত্রখান করার চেষ্টায় বিজেপি। সঞ্জয় রাউত বলেছেন, উদ্ধবের এমপিদের ভাঙাতে ৫০ কোটি খরচ করেছে গেরুয়া শিবির। এ বক্তব্যের সত্যি মিথ্যে আমরা জানি না। যদি সঞ্জয়ের দাবি ঠিক হয়, তাহলে একই অভিযানে বাংলায় কত খরচ করছে তা জানার আগ্রহ রইল। 
বাজপেয়ি আদবানিদের সময় থেকেই বিজেপির পরিচয় পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স হিসাবে। সেই শাসনেই যদি বিরোধীরা রাষ্ট্রের হাতে খতম হয়ে যায় তাহলে গণতন্ত্র, সংবিধান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোও বিপন্ন হতে বাধ্য। যার ফল হবে সুদূরপ্রসারী।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ