পরামর্শে অবসরপ্রাপ্ত সহকারী ড্রাগ কন্ট্রোলার এবং ড্রাগ কন্ট্রোলের প্রাক্তন নোডাল অফিসার সুকুমারচন্দ্র দাস।
পরামর্শে অবসরপ্রাপ্ত সহকারী ড্রাগ কন্ট্রোলার এবং ড্রাগ কন্ট্রোলের প্রাক্তন নোডাল অফিসার সুকুমারচন্দ্র দাস।
বাজারকৃত নিম্ন মানের ওষুধ অথবা নকল ওষুধ, তথাকথিত জাল ওষুধ স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এক আন্তর্জাতিক সমস্যা। অতএব সমস্যাটিকে শুধুই ভারতের সমস্যা বলে ভাবলে চলবে না।
তবে ভারতে প্রভাব অবশ্যই পড়বে। কারণ রোগী সঠিক চিকিৎসা পেলে, সঠিক সময়ে সুস্থ না হয়ে উঠতে পারলে ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়লে তা দেশের অর্থনীতিতেও যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে।
সংবাদপত্রে রোজই বাজারে জাল ওষুধের উপস্থিতি আসছে শিরোনামে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁরা ভুগছেন প্রবল দ্বন্দ্বে! যে ওষুধগুলি তাঁরা দোকান থেকে কিনলেন, সেগুলি আসল না জাল! এই যে দোকানদার অতিরিক্ত ছাড় দিল, সেগুলি কি নকল অথবা নিম্ন মানের? দোকানদার কী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এইসব ওষুধ বিক্রি করছে? ওষুধের কার্যকারিতা কী ব্রান্ড নির্ভর?
আসুন প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা যাক। ভারতে ওষুধ ও প্রসাধনী আইন তৈরি হয়েছিল ১৯৪০ সালে যা প্রাক স্বাধীনতা আমলের আইন। এই আইনের ধারা ১৭, ১৭-এ এবং ১৭বি তে নিম্নমান এবং নকল ওষুধের ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১) ধারা ১৭: ‘মিসব্রান্ডেড ড্রাগ (Misbranded Drugs)’-এর অর্থ হল মিথ্যাকৃত ওষুধ। যে ওষুধ ভুলভাবে লেবেল করা হয় বা প্রতারণামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২) ধারা ১৭-এ: অ্যাডাল্ট্রেটে়ড ড্রাগ: এর অর্থ হল ভেজাল ওষুধ, অন্য কোনও নিম্নমানের বা ক্ষতিকারক পদার্থের দ্বারা তৈরি হয়। তার ফলে গুণগতমান সঠিক থাকে না।
৩) ধারা ১৭-বি: স্পুরিয়াস ড্রাগ বা নকল ওষুধ। ওষুধ যে পদার্থ দ্বারা তৈরি হওয়ার কথা তার অনুপস্থিতি।
— ওষুধটির প্রকৃত নির্মাতা দ্বারা তৈরি নয়। কোনও নকল নির্মাতা দ্বারা প্রস্তুত।
যে নির্মাতার নাম লেবেলে থাকে তার কোনও অস্তিত্ব নেই।
কিন্তু সাধারণ মানুষ তা বুঝবেন কীভাবে? সাধারণত ওষুধের গুণগতমান বৃদ্ধিতে অথবা নকল ওষুধ রোধে উন্নতমানের টেকনোলজি ব্যবহৃত হয়। অথচ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নকল ওষুধ তৈরিতেও উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। না হলে ‘কিউ আর কোড (QR Code)’ কীভাবে নকল হতে পারে! চিন্তার কথা, এই নকল ওষুধ অত্যন্ত সুচারুভাবে বাজারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। দেশের ভেষজ নিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে এই সমস্যার সমাধান করা কতটা সম্ভব তা এখন প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে! ওষুধ ব্যবসায় যুক্ত সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, তথা সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই প্রয়োজন।
বর্তমানে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিমাসে কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রকাশিত নিম্নমানের ওষুধের তালিকা প্রতিটি দোকানে প্রদর্শন করতে হবে। এই নিম্নমানে ওষুধগুলি আবার নকলও হতে পারে। তবে তা অনুসন্ধান যোগ্য।
অভিজ্ঞতা থেকে এও লক্ষণীয় যে, নকল ওষুধের গুণমান অনেক সময় নিম্নমানের হয় না। এই সমস্ত ওষুধগুলি কোনও নকল প্রস্তুতকারকের দ্বারা উন্নতমানের পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রস্তুত করা হয়। এরপর ওষুধ ব্যবসায় যুক্ত নানা মানুষের সাহায্যে বাজারকৃত করা হয়।
এই সব সংস্থার তৈরি ওষুধের তালিকায় বহু প্রচলিত বা বহুবিক্রিত ওষুধও থাকে যাতে সাধারণ মানুষের মনে কোনও সন্দেহের উদ্রেক না ঘটে এবং ডিসট্রিবিউশন চ্যানেল (Distribution Channel) তথা বিপণন সিস্টেমের মধ্যে ওষুধগুলিকে সহজে প্রবেশ করানো যায়।
ওষুধ ব্যবসায় যুক্ত সবারই সচেতন অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন। ভেষজ নিয়ন্ত্রণ অধিকার সর্বদাই তাদের পরিদর্শনের সময় তার কাগজপত্র পরীক্ষা করে। বিভিন্ন সময় তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মশালারও আয়োজন করে। অতীতে ওষুধ ব্যবসায়ীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ করা গিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি বর্তমান এই সমস্যায় কিছুটা হলেও সমাধান যোগ্য।
আপাতত সাধারণ মানুষের কী কী করা উচিত?
নিম্নমানের অথবা জাল ওষুধের ঝুঁকি
ওষুধও যে মনে একটা ভয় নিয়ে কিনতে হবে, সেটা কখনও ভাবিনি। ডাক্তার যা প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন, সেটা দোকানে দেখিয়ে যা ওষুধ দেয়, তাই কিনে নিই আমরা। কিন্তু জীবনদায়ী ওষুধও যে ভেজাল করা হচ্ছে, তা খবরে দেখার পরই একটা চাপা ভয় মনে ঢুকে গিয়েছে। ওষুধের নাম ভালো করে খুঁটিয়ে দেখছি। ওষুধের রং বা স্ট্রিপ একটু অন্য রকম দেখলেই ভাবনা হচ্ছে, এটা খাঁটি তো?
-----সৌমী বন্দ্যোপাধ্যায়, বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত
বাড়িতে বাবা, মা তো বটেই, আমাকেও নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। খবরে দেখছি যে ওষুধ আমরা খাই, সেটারও নাকি ভেজাল ধরা পড়েছে। চিন্তায় পড়ে গিয়েছি, এতদিন যেটা খেলাম, সেটা ভালো না খারাপ? তাই চেনা ফার্মেসি ছাড়া অন্য কোনও দোকান থেকে কিছু কিনছি না। যে দোকানে বেশি ছাড় দেয়, সেখান থেকে কিনতেও কেমন একটা দ্বিধা হচ্ছে। ভালো করে ওষুধের ব্যাচ নম্বর, তারিখ মিলিয়ে নিচ্ছি। নিয়মিত সুগার, প্রেশারও মাপাচ্ছি।
------প্রীতম ভড়, আইটি কর্মী
বয়স হয়েছে। সুগার, প্রেশারের ওষুধ তো নিত্যসঙ্গী। অবসর জীবনটা কোথায় ভালো ভাবে কাটাব, তা না এসব উৎকট ঝামেলা। আমাদের তো আর ওতো সব পরীক্ষা করে ওষুধ খাওয়া হয় না। দোকান থেকে যা দেয়, তাই বিশ্বাস করে খেয়ে নিই। এখন এতেও যদি শুনি জীবনদায়ী ওষুধেই বিষ, তা হলে এই বয়সে আর যাই কোথায়!
-----মানবেশ চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী
আমাদের দেশে সবার পক্ষে অত ব্যাচ নম্বর খুঁটিয়ে দেখে, কম্পোনেন্টসের কম্বিনেশন, এক্সপায়ারি ডেট দেখে ওষুধ কেনা সম্ভব নয়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষই তা করেন। কারণ, আমাদের এটা বিশ্বাস যে ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কেউ ছেলেখেলা করবেন না। কিন্তু সেটাই হচ্ছে। এখন ওষুধের যা দাম বেড়েছে, সাধারণ মানুষ ওষুধ কিনতেও কোথায় বেশি ছাড় মিলছে, তা দেখেন। কিন্তু এই ভেজাল ওষুধের কারবার চলায় সেটাতেও তো ভয় ধরেছে। এক্ষেত্রে সরকারের আরও কড়া পদক্ষেপ করতে হবে। পাশাপাশি যাঁরা ওষুধ বিক্রি করছেন, তাঁদেরও আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
-------অংশুমিত্রা মুস্তাফি, অধ্যাপিকা
কোথায় জানাবেন অভিযোগ?
রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তর একটি ফোন নম্বর এবং ই-মেল আইডি জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে জানিয়েছে।
মোবাইল: ৭৯০৮০৭৭৬১৫
ই-মেল: [email protected]
কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল (সিডিএসসিও) তাদের ওয়েবসাইটে ওষুধের গুণমান সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর জন্য দু’টি ইমেল আইডি প্রকাশ করেছে।
সেগুলি হল— [email protected], [email protected]