Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর যখন যেভাবে ভবতারিণীর পূজা করিতেন

দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর যখন যেভাবে ভবতারিণীর পূজা করিতেন
  • ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর যখন যেভাবে ভবতারিণীর পূজা করিতেন

Advertisement

অগ্রজের মৃত্যুর পর ঠাকুর শ্রীশ্রীজগদম্বার পূজায় অধিকতর মনোনিবেশ করিয়াছেন এবং তাঁহার দর্শনলাভের জন্য যাহাই অনুকূল বলিয়া বুঝিতেছেন তাহাই বিশ্বস্তচিত্তে ব্যগ্র হইয়া সম্পন্ন করিতেছেন। এই সময়ে যথারীতি পূজা সমাপনান্তে দেবীকে নিত্য রামপ্রসাদ প্রমুখ সিদ্ধ ভক্তদিগের রচিত সঙ্গীত সমূহ শ্রবণ করান তিনি পূজাঙ্গের অন্যতম বলিয়া ধারণা করিয়াছিলেন। হৃদয়ের গভীর উচ্ছ্বাসপূর্ণ ঐসকল গীত গাহিতে তাঁহার চিত্ত উৎসাহপূর্ণ হইয়া উঠিত। ভাবিতেন—রামপ্রসাদ প্রমুখ ভক্তেরা মার দর্শন পাইয়াছিলেন; জগজ্জননীর দর্শন তবে নিশ্চয়ই পাওয়া যায়; আমি কেন তবে তাঁহার দর্শন পাইব না? ব্যাকুল হৃদয়ে বলিতেন—‘‘মা, তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, আমায় তবে কেন দেখা দিবি না? আমি ধন, জন, ভোগসুখ, কিছুই চাহি না, আমায় দেখা দে!’’ প্রার্থনা করিতে করিতে নয়নধারায় তাঁহার বক্ষ ভাসিয়া যাইত এবং ঐরূপ কাতর ক্রন্দনে হৃদয়ের ভার কিঞ্চিৎ লঘু হইলে বিশ্বাসের মুগ্ধ প্রেরণায় কথঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইয়া পুনরায় গীত গাহিয়া দেবীকে প্রসন্না করিতে উদ্যত হইতেন। এইরূপে পূজা ধ্যান ও ভজনে দিন যাইতে লাগিল এবং ঠাকুরের মনের অনুরাগ ও ব্যাকুলতা দিন দিন বর্দ্ধিত হইতে থাকিল। 
অদ্ভূত পূজকের দেবীর পূজা ও সেবা সম্পন্ন করিবার নির্দ্দিষ্ট কাল এই সময় হইতে দিন দিন বাড়িয়া যাইতে লাগিল। পূজা করিতে বসিয়া তিনি যথাবিধি নিজ মস্তকে একটী পুষ্প দিয়াই হয় তো দুইঘণ্টাকাল স্থানুর ন্যায় স্পন্দহীন ভাবে ধ্যানস্থ রহিলেন, অন্নাদি নিবেদন করিয়া, মা খাইতেছেন ভাবিতে ভাবিতেই হয় তো বহুক্ষণ কাটাইলেন, প্রত্যুষে স্বহস্তে পুষ্পচয়ন করিয়া মালা গাঁথিয়া দেবীকে সাজাইতে কত সময় ব্যয় করিলেন, অথবা অনুরাগপূর্ণ সন্ধ্যারতিতেই বহুক্ষণ ব্যাপৃত রহিলেন। 
আবার অপরাহ্নে বা আরতির অন্তে জগন্মাতাকে যদি গান শুনাইতে আরম্ভ করিলেন তবে এমন তন্ময় ও ভাববিহ্বল হইলেন যে, সময় অতীত হইতেছে একথা বারম্বার স্মরণ করাইয়া দিয়া তাঁহাকে আরাত্রিক বা সান্ধ্য শীতলাদি কর্ম্মে নিযুক্ত করিতে হইল! —এইরূপে কিছুকাল পূজা চলিতে লাগিল। পূজা ধ্যানাদি করিতে বসিয়া তিনি ইতিপূর্ব্বে বহুযত্নে দেখিতেন, কোন দিন মার হাতখানি, বা কোমলোজ্জ্বল পাখানি, বা ‘সৌমাৎসৌম্য’ হাস্যদীপ্ত মধুর স্নিগ্ধ মুখখানি—এখন, পূজাধ্যানকাল ভিন্ন অন্য সময়েও দেখিতে পাইতেন, সর্ব্বাবয়বসম্পন্না জ্যোতির্ম্ময়ী মা, হাসিতেছেন, কথা কহিতেছেন, ‘এটা কর, ওটা করিস্‌ না’, বলিয়া তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতেছেন। পূর্ব্বে মাকে অন্নাদি নিবেদন করিয়া দেখিতেন, মার ‘‘নয়ন হইতে অপূর্ব্ব জ্যোতিঃরশ্মি ‘লক্‌ লক্‌’ করিয়া নির্গত হইয়া নিবেদিত আহার্য্য সমুদায় স্পর্শ ও তাহার সারভাগ সংগ্রহ করিয়া পুনরায় নয়নে সংহৃত হইতেছে!’’ —এখন দেখিতে পাইতেন, ভোগ নিবেদন করিয়া দিবার পূর্ব্বেই সেই মা শ্রী-অঙ্গের প্রভায় মন্দির আলো করিয়া সাক্ষাৎ খাইতে বসিয়াছেন। হৃদয়ের নিকট শুনিয়াছি, পূজাকালে একদিন সে সহসা উপস্থিত হইয়া দেখে ঠাকুর জগদম্বার পাদপদ্মে জবাবিল্বার্ঘ্য দিবেন বলিয়া উহা হস্তে লইয়া তন্ময় হইয়া চিন্তা করিতে করিতে সহসা—‘রোস্‌, রোস, আগে মন্ত্রটা বলি তার পর খাস্‌’—বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন, এবং পূজা সম্পূর্ণ না করিয়া অগ্রে নৈবেদ্য নিবেদন করিয়া দিলেন! 


ব্রহ্মচারী জ্ঞান মহারাজের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব’ থেকে 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ