এখন আর নিছক আশঙ্কা নয়, নির্মম বাস্তব সত্য। একেই বোধহয় বলে ত্রাহি মধুসূদন দশা। কেন্দ্রের তরফে একের পর এক সতর্কবার্তা। যার জেরে আম জনতার জীবনধারণ করাটাই ক্রমশই দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। পেট্রল-ডিজেলের খরচ কমানোর বার্তার পর এবার বুঝে-শুনে বিদ্যুৎ ব্যবহার করার বার্তা এল কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রকের তরফে। তাও আবার এই হাঁসফাঁস করা গরমে। এমনিতেই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে জেরবার দেশবাসী। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগছে, এমনই কি ‘আচ্ছে দিন’ চেয়েছিলেন তাঁরা? জনমনে জেগে ওঠা অনেক প্রশ্নেরই সদুত্তরও মিলছে না। একদিকে জ্বালানি তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহারে রাশ টানার বার্তা দিচ্ছে কেন্দ্র, অন্যদিকে বলা হচ্ছে এখনও তেমন সংকট নেই। আসল সত্যটা ঠিক কী তা জানতে চায় দেশবাসী। গত ৪ মে পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর গত ১০ মে জ্বালানি তেল ব্যবহার কমানো, খুব প্রয়োজন ছাড়া এক বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখার কথা বলে দেশবাসীকে কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তখনই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আঁচ পেয়েছিলেন মানুষ। আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে কেন্দ্র। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডিজেলের দামও। পরিণতিতে মূল্যবৃদ্ধি। এক ধাক্কায় পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি। কিন্তু এখানেও থামা নেই। জ্বালানির পর এবার এল বিদ্যুৎ-এর ব্যবহারে রাশ টানার বার্তা। ফের আশঙ্কার কালো মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। তাহলে কি এবার বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়েছে দেশ? এ যেন ক্রমশ প্রকাশ্য ব্যবস্থা! কেন্দ্রের নয়া কৌশল। এর পর কী বার্তা আসতে চলেছে তা অবশ্য কারও জানা নেই।
বলার অপেক্ষা রাখে না পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী ব্যবহারে সংকটের জের এসে পড়েছে ভারতের অভ্যন্তরে। জ্বালানি সংকট ও চাহিদা মতো রান্নার গ্যাসের অভাবে দেশজুড়ে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে যেমন কয়লার দাম বেড়েছে, অন্যদিকে কমছে সাপ্লাই। যার জেরে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে কয়লার স্টক কমছে। সোজাসুজি এই সহজ সত্যটাকে সামনে না এনে বিদ্যুৎ মন্ত্রক শুক্রবার বলেছে, বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সরকার অবশ্যই চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এমন আশ্বাস তো জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের তরফে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দেশে জ্বালানি সংকট নেই ঠিকই, তা সত্ত্বেও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন। এবার একই কায়দায় দেশবাসীকে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে। অর্থাৎ আবার সেই সংযত হওয়ার আবেদন। একের পর এক ‘সংযত’ হওয়ার বার্তায় আতঙ্কে দিন কাটছে আম জনতার। প্রতি মুহূর্তে তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগছে এরপর আর কী কী হতে পারে। জল্পনা তুঙ্গে।
এমনিতেই মোদিজির দেওয়া ‘আচ্ছে দিনের স্বপ্ন’ ভেঙে চুরমার হয়েছে। মানুষ ভালো নেই, স্বস্তিতে নেই। দুর্দশার শেষ নেই। দু’দফায় পেট্রল ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পরও বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির নাকি দিনে ৭৫০ কোটি টাকা করে লোকসান হয়েই চলেছে। এর অর্থ ফের বাড়তে পারে পেট্রল ডিজেলের দাম। এর জেরে এক ধাক্কায় পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের একাধিক পরিবহণ সংগঠন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের পক্ষে পরিবহণ মাশুল বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। যার নিট ফল হতে পারে ফের মূল্যবৃদ্ধি। জ্বালানি সংকট, ডিজেলের অভাবে পণ্য পরিবহণে সমস্যা, টাকার পতন অব্যাহত থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার এই নানা সমস্যার সমাধানে ঠিক কী পদক্ষেপ করছে তা কিন্তু স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে না। তাই সংগত কারণেই বিরোধীরা দাবি করেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনীতি ঠিক কোন অবস্থায় আছে তা স্পষ্ট করে জানাক কেন্দ্র। কিন্তু কে করবে মানুষের কষ্টের লাঘব? মূল্যবৃদ্ধির আগুনে দেশবাসী ঝলসে গেলেও বঙ্গজয়ের আহ্লাদে আটখানা হয়ে এখন কেন্দ্রের শাসকদলের বহু নেতা আনন্দে বিভোর। তাই দিনের শেষে সাধারণ মানুষের দুর্দশা কমার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। সংযত জীবনযাপন করেও জ্বালানি বিদ্যুতের মতো একের পর এক ধাক্কায় জেরবার হয়ে আগামী দিনগুলিতেও আম জনতাকে জীবনযাপন করতে হবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। সেই দিনগুলি হয়তো বা আরও ভয়ঙ্কর হতে চলেছে। পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে তাতে মানুষকে দিতে হবে ধৈর্যের পরীক্ষা।