


পরামর্শে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য।
আড্ডা বাঙালির একটি নির্ভেজাল ‘পেটেন্টহীন’ হ্যাঙ্গআউট, যা সারা বিশ্বের দরবারে বন্দিত। স্বয়ং গুন্টার গ্রাসও স্বীকার করেছেন বঙ্গমননের সংস্কৃতির এই চর্চা আদি ও অকৃত্রিম, যার কোনো অংশীদারিত্ব হবে না। প্রভাতী চায়ের কাপে, সংবাদ শিরোনামের তুফানে, রাজনীতি, রঙ্গমঞ্চ বা ক্রীড়াঙ্গনে সর্ববিষয় নিয়ে শুরু হতে পারে আড্ডা। আড্ডার জল যে কোথায় গড়াতে পারে, তা স্বয়ং দেবা না জানন্তি, কুত্রাপি মনুষ্যা! গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিলম্ব হয়। সময়ের হুঁশ থাকে না। বাড়ির লোকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই চলতে থাকে প্রভাতী, দ্বিপ্রাহরিক, অপরাহ্নিক, সান্ধ্য কিংবা রাত্রিকালীন আড্ডা। পাঁচিল, রোয়াক, বেঞ্চ, চেয়ার, বৈঠকখানা—যে কোনো স্থানে চলতে পারে বিরামহীন আড্ডা। অ্যাড্রিনালিন রাশ হয়, সেরোটনিন বা ‘হ্যাপি হরমোন’ ও ডোপামিন বা ‘প্লেজার হরমোন’ এর ক্ষরণও বাড়ে নির্ভেজাল আড্ডায়।
অধিকাংশ আড্ডাই একদিনে অসমাপ্ত ও অতৃপ্ত থেকে যায় ছোটোগল্পের মতো, যার রেশ বঙ্গ সিরিয়ালের এপিসোডের মতো চলমান থাকে। ‘কফি হাউসের আড্ডা’ তো কিংবদন্তি হয়ে আছে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়, সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে আর মান্না দে-র গায়কিতে। সুজাতা, নিখিলেশ, মইদুল, রমা রায় নামাঙ্কিত গানটি বাঙালির স্মৃতির মণিকোঠায় অমলিন হয়ে আছে। যদিও প্রকৃত সাত বন্ধু ছিলেন অম্লান, সুকান্ত, নিখিল, নিতাই, ডি শর্মা, রমা ও গায়ক নিজে।
‘বাঙালি আড্ডা মারে’ না ‘আড্ডা বাঙালিকে মারে’ এনিয়ে অবাঙালি-বাঙালির মতবিরোধ চলতে পারে। কিন্তু একথা সর্বজনীন যে আড্ডাচক্র থেকেই জন্ম নেয় বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সংযোগ, সৃজনশীলতা, গতানুগতিক ছকবাঁধা একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি। কথিত আছে, মহান দার্শনিক ও শিক্ষক সক্রেটিস ২৫০০ বছর আগে আড্ডার সূচনা করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি যেমন প্লেটো, আরিস্টটলরাও সক্রেটিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। আড্ডাবাজ মানুষের কদর সর্বত্র। সে বিয়েবাড়ি হোক বা শ্বশুরবাড়ি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদারদের আড্ডা তো সর্বজনবিদিত। শেষরাতে, ঠিক ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হওয়ার আগে পর্যন্ত আড্ডা চলত।
বাঙালি ও ফরাসিদের মধ্যে কিছু বৈচিত্রগত মিল আছে। বাঙালি কিন্তু ‘দার্শনিক’ হয় আবেগগত কারণে। মস্তিষ্কে আবেগ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রস্থল হলো অ্যামিগডালা। অতিসক্রিয় হয়ে উঠে যা কোনো সিগন্যাল মানে না, স্থান-কাল-পাত্র বিচার-ভেদ করে না। ফ্রন্টাল লোব ও অ্যান্টিরিয়র সিঙ্গুলেট জাইরাস প্রাণপণে ব্রেক চেপে রাখে। তবুও বাঙালিকে আড্ডা দিতে যাওয়া থেকে মায়ের গরম খুন্তি বা বাবার বেল্টও আটকাতে পারেনি। এখন সবকিছুই ডিজিটাল, তাই অনলাইনের আড্ডা গেললাইন থেকে ড্রিমলাইনে চলে আসে। সাইবার ক্রাইম থেকে আশাভঙ্গের প্রাইমটাইম হল নেটদুনিয়ার অন্তর্জাল। অক্ষরেখা-দ্রাঘিমারেখা না দেখে বন্ধুত্বস্থাপনে নেমে আসতে পারে বিপদ। সপ্তাহান্তে অলস বাঙালি আড্ডা দেয় বেশি। আড্ডার মধ্য দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপিও করা যায়। যুক্তি-তর্ক-গল্প-এর মধ্য দিয়ে আস্তি-নাস্তিমূলক পদ্ধতিতে (ডায়েলেক্টিক থেরাপি) নেতিবাচক মনোভাব ও বস্তাপচা ধ্যানধারণাও বদলানো সম্ভব।
নির্মল-নির্ভেজাল আড্ডা থেকে মতৈক্য থেকে মতানৈক্যের জন্ম নিতে পারে। গলাগলি বা হাতাহাতিও হতে পারে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-বিনোদন, সংগীত, ক্রীড়া, ভ্রমণ, সাহিত্য, কবিতা, পুজো, রাজনীতি, পেশা বা খুনসুটির আড্ডা যাই হোক না কেন, মনে দেয় প্রশান্তি, ভুলিয়ে দেয় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক, সাংসারিক জীবনের টেনশন।
শেষে মনে হয়— ‘শেষ হয়ে হইলো না শেষ।’
অনুলিখন: অয়ন দত্ত
কী বলছে সমাজ
পড়াশোনার চাপ, সঙ্গে কেরিয়ার গড়ার টেনশন। তাই মাথাটা মাঝে মাঝে যেন ‘হ্যাং’ করে যায়। তা থেকে রিলিফ দেয় আড্ডা। বন্ধুদের সঙ্গে হোক, আত্মীয়দের সঙ্গে হোক, একটু আড্ডা দিলেই মনটা ফ্রেশ হয়ে যায়। তবে ক্লোজ কেউ থাকলে, তার সঙ্গে আড্ডাটা বেশি জমে। মন খুলে কত কথা বলা যায়। তাতে একদিকে মনটা যেমন ফুরফুরে হয়ে যায়, তেমনই আবার নিত্যদিনের জীবনে এগিয়ে চলার এনার্জিটাও পাওয়া যায়।
যশোধরা চট্টোপাধ্যায়, পড়ুয়া
সৈয়দ মুজতবা আলি আড্ডা সম্পর্কে লিখেছেন “যেন পুরীর মন্দির। জাতফাত নেই, সব ভাই, সব বেরাদর।”
নিঃস্বার্থ আড্ডার প্রথম মানসিক লাভ এটাই! বয়স, জাতপাত,ধর্ম, শিক্ষিত, অশিক্ষিত ভেদাভেদ মুছে মানুষ উদারমনস্ক হয়। রান্নাঘর থেকে ট্রাম্প, পাঁচমিশালি ভাবনার আদানপ্রদান হয়। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। গণতান্ত্রিক হতে শেখায়। মানসিক স্বাস্থ্যও ধরে রাখে।
ঐন্দ্রিলা দাশগুপ্ত, শিক্ষিকা
আড্ডাটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবাই তো মোটামুটি একটা বদ্ধ জীবনই কাটাই। আড্ডা খোলা জানালা আমার কাছে। হালকা চালের গল্প তো থাকেই, তেমনই রাজনৈতিক থেকে সামাজিক, নানা মত বিনিময়ও হয়। কোনো বিষয়ে আমার মতটা কী, আর আমার সামনের মানুষটা কী ভাবে তা দেখছে, তাও জানতে পারি।
সৈকত হাজরা , বেসরকারি কর্মচারী
লিখেছেন সায়ন মজুমদার
কী বলছেন সেলেবরা?
ভালো থাকার জন্য দরকারি
আড্ডা হল নির্মল আনন্দ। আমাদের আড্ডা মানেই গান। সঙ্গে গল্প, কত বিষয়ে আলোচনা। আড্ডা ভালো হরমোনগুলির ক্ষরণ হতে সাহায্য করে। তা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত উপকারি। এখন তো আর কেউ সেভাবে আড্ডা দেন না। সকলে যে যাঁর নিজের মতো বসে মোবাইল দেখেন। তবে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে এখনও আড্ডা দিই। স্কুলে কী করেছিলাম, রবি ঠাকুরের গান, ধর্মগ্রন্থের কথা, সাহিত্যচর্চা, নানা বিষয়ে কথা হয়।
অপরাজিতা আঢ্য, অভিনেত্রী
স্ট্রেস মুক্তির উপায়
সকলেই ইঁদুর দৌড়ে শামিল। পেশায় প্রচুর স্ট্রেস, চাপও রয়েছে। আড্ডা হল স্ট্রেস থেকে মুক্তির উপায়। বন্ধুবান্ধব, ভাই-বোনের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা মারি। ওইটুকু সময় মনে হয়, সবকিছু থেকে যেন মুক্তি পেলাম। আড্ডার সময় ফোনে নজর দিই না। আসলে একসঙ্গে বসে আড্ডা মারার ব্যাপারটাই আলদা।
অঙ্কুশ হাজরা, অভিনেতা
মন ভালো রাখার ‘ওষুধ’
আড্ডা মন ভালো রাখার ‘ওষুধ’। আড্ডা মানে তর্কবিতর্ক। যেখানে হেরেও শান্তি। ওটা তো আর লড়াইয়ের জায়গা নয়, ভাব বিনিময়ের জায়গা। আড্ডা মানেই নানা ভাবনার সৃষ্টি। কোনোদিন পুরানো হবে না বাঙালির আড্ডা। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজেকে ওইদিনের জন্য সংস্কৃতিগত দিক দিয়ে আরও সমৃদ্ধ করা।
পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিনেতা