


পায়রার দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা অসাধারণ। উড়িয়ে দিলে ঠিক চেনা স্থানে ফিরে আসতে পারে! কীভাবে পথ চেনে পায়রা, সেকথাই জানালেন কালীপদ চক্রবর্তী
অনেকেই শুনলে অবাক হবে যে পায়রার মস্তিষ্কে কয়েক লক্ষ কোষের মধ্যে ৫৩টা কোষের একটি গ্রুপ আছে। এই কোষগুলো শুধুমাত্র বস্তুর অবস্থানই নির্দেশ করে না, এগুলো ভূপৃষ্ঠের চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করে। এখানেই শেষ নয়, এই কোষগুলো উত্তর-দক্ষিণ নির্ণয় করে অঞ্চল সম্বন্ধেও একটা সাধারণ ধারণা দেয়।
একসময় নাকি পায়রাকে চিঠিপত্র আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হত। পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হত। এরপর সেটি উড়ে উড়ে চলে যেত গন্তব্যস্থলে। প্রাপক চিঠিটি পড়ে তাঁর উত্তর আরও একটি চিঠিতে লিখে সেটির পায়ে বেঁধে দিতেন। এভাবেই প্রাচীনকালের লোকজন যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
অবশ্য এ নিয়ে অনেকেই খুব সন্দিহান। তাঁদের বক্তব্য, পায়রার মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদানের বিষয়টি কাল্পনিক। এর বাস্তব কোনো সত্যতা নেই। অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পায়রারা চিঠি আনা-নেওয়া করতে পারুক বা নাই পারুক, স্থানের অবস্থান নির্ণয়ে তারা সিদ্ধহস্ত। এ বিষয়ে পক্ষীবিদরা নিশ্চিত। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, পায়রার মস্তিষ্কে ৫৩টি কোষের একটি গ্রুপ আছে। এই নিউরনগুলি স্থানের অবস্থান নির্ণয় এবং ভূপৃষ্ঠের চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। শুধু তাই নয়, এই কোষগুলো উত্তর-দক্ষিণ দিক নির্ণয়ও করতে পারে। এমনকি, পৃথিবীর বিষুব অঞ্চল সম্বন্ধেও একটা সাধারণ ধারণা দিতে পারে। এজন্য এগুলিকে জিপিএস স্নায়ুও (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) বলা হয়। তবে অন্যান্য সংকেতের মধ্যে পরিযায়ী পাখির দিক নির্ণয় বিশেষ করে চৌম্বক ক্ষেত্রে যোগাযোগ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। যদিও নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জিপিএস স্নায়ুগুলি সত্যিকার অর্থেই চৌম্বক ক্ষেত্র সম্বন্ধে অনুভূতি তৈরি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের ডেভিড ডিকম্যান ও তার সহকর্মীরা এ নিয়ে গবেষণা করেন। এই পরীক্ষা করার জন্য তারা বেশ কয়েকটি পায়রাকে আটকে রাখেন। অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় পাখিগুলোর চারপাশের চৌম্বক ক্ষেত্রও ভিন্ন ছিল। বিজ্ঞানী ডিকম্যান ও তার সহকর্মী কিং উয়ু মনে করেন, সেন্সরের জন্য দায়ী পায়রার মস্তিষ্কে থাকা লক্ষ লক্ষ কোষের মধ্যে ৫৩টি স্নায়ু কোষ। তারা প্রতিটি পায়রার অবস্থান পরিবর্তনে বৈদ্যুতিক সংকেত পরিমাপ করতে সফল হন।
ডিকম্যান জানান, তারা মস্তিষ্কের একটি অংশে দেখেছেন সেটি চৌম্বক ক্ষেত্রকে আকর্ষণ করে। এর ফলে সংকেত গ্রহণ সম্পর্কিত গবেষণা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি আরও জানান, চৌম্বক ক্ষেত্রে আকর্ষণের জন্য প্রতিটি স্নায়ুর পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য আছে। আরও আশ্চর্যের হল, এগুলো প্রতিটিই থ্রি-ডি কম্পাসের মতো কাজ করে উত্তর-দক্ষিণ ও ওপর-নীচ নির্ণয় করে। এ কোষগুলো শুধুমাত্র দিক নির্ণয়ই করে না, এগুলো কোনো বস্তু বা জিনিসের সঠিক অবস্থানও নির্ণয় করতে পারে। তাছাড়াও এই বিশেষ কোষগুলো সূক্ষ্ম পরিবর্তন করতেও পারে। সর্বোচ্চ পরিবর্তনই হয় প্রাকৃতিক চৌম্বক ক্ষেত্রে। শুধু তাই নয়, কম্পাসের মতো স্নায়ুগুলোর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও আছে। এ ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের খুব অবাক করেছে। কারণ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাখির মস্তিষ্ক চৌম্বক ক্ষেত্রের মেরুর বৈপরীত্যে কাজ করে না।
এর আগে মনে করা হত, পাখির দিক নির্ণয় কোষ থাকে নাক, ঠোঁট অথবা কানের অভ্যন্তরে কোনো মাংসপিণ্ডে। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পায়রার ঠোঁটে থাকে আয়রন সমৃদ্ধ কোষ। সেগুলি কোনো চৌম্বক সংবেদনশীল নিউরন নয়। অন্য এক তত্ত্ব অনুযায়ী, পাখির সেন্স গ্রাহক হল চোখ। এ ক্ষেত্রে চোখে আলো ঢুকে অনুভূতি অল্পসময়ের জন্য বদলে যায়। এটি নির্ভর করে চৌম্বক ক্ষেত্রে
রাখা বস্তুর ওপর। পায়রার পথ চলা নিয়েও অনেক রহস্য জড়িয়ে আছে। এদের অভ্যন্তরীণ কম্পাসের সাহায্যে এরা পথ চলে।