স্বরূপ কুলভী: চলে এসেছে শীতকাল। চটচটে ঘাম থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি। আলমারি থেকে বেরিয়ে পড়েছে সোয়েটার, টুপি, জ্যাকেট। হিমেল হাওয়ায় সুয্যিমামার ছোঁয়া বেশ ভালো লাগে। আর এই সময়ই আমাদের দেশে ভিড় করে অচেনা দেশের অতিথিরা। কোনও পাসপোর্ট বা ভিসা দরকার হয় না। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ওরা চলে আসে। ওদের কোনও সীমান্ত নেই। শীতের মোহময় প্রকৃতিকে ওরা আরও রঙিন করে তোলে। ওরা পরিযায়ী পাখির দল। পৃথিবীতে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখি রয়েছে। এদের প্রায় কুড়ি ভাগই হল পরিযায়ী পাখি। ইংরেজিতে বলে মাইগ্রেটরি বার্ডস। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তে বরফঢাকা অঞ্চলের বাসিন্দা ওরা। গরমকালে সেখানে খাবার বা জলের অভাব হয় না। কিন্তু শীত এলেই জল জমে বরফ হয়ে যায়। খাবারে টান পড়ে। সেই সময় প্রাণের তাগিদে সেখানকার লক্ষ লক্ষ পাখি দক্ষিণে ভারতের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের দিকে পাড়ি দেয়। সেখানে শীতকালটা তারা কাটিয়ে দেয়। তারপর শীতের শেষে আবার উড়ে যায় নিজের দেশে। এভাবে বছরের পর বছর পরিযায়ী পাখিরা উড়ে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ চিনে উড়ে বেড়াতে তাদের কোনওই অসুবিধা হয় না। স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে, এতটা পথ কীভাবে ওরা পাড়ি দেয়? আর পথ কীভাবে চিনতে পারে? ওদের কাছে তো কোনও মানচিত্র বা কম্পাস নেই। জিপিএসও নেই। তাহলে? প্রতি বছরই নির্দিষ্ট জায়গায় হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে পৌঁছয় কীভাবে?
শীতের সময় আসা, তারপর আবার ফিরে যাওয়া। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, এই দু’দফায় কোনও কোনও পরিযায়ী পাখিকে প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পেরতে হয়। আর্কটিক টার্ন প্রজাতির পাখি বছরে প্রায় ৯০ হাজার কিলোমিটার পথ পেরয়। তা প্রায় এক মেরু থেকে অন্য মেরুর দূরত্ব। এত দীর্ঘ পথ পেরতে গেলে অনেকটা সময় ওদের আকাশে ডানা মেলে থাকতে হয়। আমরা কতটা দৌড়তে পারি? এক কিলোমিটার? পাঁচ কিলোমিটার? খুব বেশি হলে ১০ কিলোমিটার? খুব বেশি ফিট হলে সহজেই হাফ ম্যারাথন বা পুরো ম্যারাথন দৌড় সম্পূর্ণ করতে পারি। তা যত বেশিই হোক না কেন, কোনও কোনও পাখির কাছে তা নস্যি। পরিযানের সময় কোনও কোনও প্রজাতির পাখি টানা কয়েকশো কিলোমিটার উড়তে পারে। একবারও খাওয়া-দাওয়ার জন্য না থেমেই। এই সব পাখিদের এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পরিযায়ী পাখিদের এই ক্ষমতা, পথ খুঁজে নেওয়ার সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। আর এতে নিত্য নতুন চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসছে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পরিযায়ী পাখিরা সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করে নির্ভুলভাবে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। আর এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র। এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্র কী? আর কীভাবেই বা পাখি তা অনুভব করে? আসলে এই পৃথিবী একটি বড়সড় চুম্বক। পৃথিবীর কেন্দ্রে থাকা প্রচুর গলিত লোহা এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎস। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি অনুভব করে পাখিরা যাত্রাপথে তাদের অবস্থান বুঝতে পারে। সেই অনুসারে যাত্রার দিশা স্থির করে তারা। এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি এতটাই ক্ষীণ, তা মানুষ অনুভব করতে পারে না। কিন্তু পাখিরা পারে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় জানতে পেরেছেন, পাখিদের শরীরেই রয়েছে এই চৌম্বকীয় শক্তি অনুভবের ব্যবস্থা। তাদের মস্তিষ্ক, চোখে রয়েছে বিশেষ কোষ ও সেন্সর। পাখিদের চোখে থাকে ক্রিপটোক্রোম নামে এক ধরনের প্রোটিন। তা আলোর উপস্থিতি ও তীব্রতা চিহ্নিত করতে পারে। আলোর সংস্পর্শে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সামান্য পরিবর্তনও ক্রিপটোক্রোম ধরে নিতে পারে। সেই অনুসারে পাখিরা উত্তর ও দক্ষিণের দিশা বুঝতে পারে। এর সাহায্যেই সুদীর্ঘ যাত্রায় পরিযায়ী পাখিরা তাদের পথ খুঁজে নিতে পারে। অন্য কিছু পাখি আবার তাদের ঠোঁটে থাকা ম্যাগনেটাইট নামে খনিজের সাহায্যে চলাচল করতে পারে। এনিয়ে গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসবে।