বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: ছ’মাস, বড়জোর বছর যেতে না যেতেই ‘পুরানো’ হয়ে যাচ্ছে মোবাইল। মাস পেরতে না পেরতেই ব্যাকডেটেড লাগছে হেয়ার কাট! ফ্যাশন ট্রেন্ডও পাল্টাচ্ছে রোজ। ডারউইনের স্ট্রাগল ফর এগজিসট্যান্সের নিয়ম খাটছে সবক্ষেত্রেই। ৭০-৭৫ বছরের মনুষ্যজীবনেই কতবার যে শুনতে হয়, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার কথা! সেখানে ৩৫০ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে এককোষী জীবাণু—আর্কিয়া। কোন জাদুমন্ত্রবলে? সেই আশ্চর্য রহস্যই ভেদ করলেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরের (বোস ইনস্টিটিউট) বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ অভ্রজ্যোতি ঘোষ। অভ্রজ্যাোতি সহ আটজন বিজ্ঞানীর এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ববন্দিত জার্নাল আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজিতে।
আজকের তুলনায় শতগুণ কঠিন পৃথিবীতেও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়ে টিকে গিয়েছে আর্কিয়া। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যতবারই হঠাৎ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে বা পরিবেশ বাঁচার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে, ততবারই এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিজেদের সুপ্ত ও নিষ্ক্রিয় করেছে এই জীবাণু। কিন্তু শক্তি নষ্ট করেনি। সে কারণেই কয়েকশো কোটি বছর ধরে পরিবেশে টিকে আছে আর্কিয়া। কিন্তু এই রহস্যভেদে মানুষের কী লাভ? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। জীবজগতের কাছে অন্যতম বড় উদ্বেগ গ্লোবাল ওয়ার্মিং। এই অবস্থার আর্কিয়ার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সভ্যতার কাছে বড় শিক্ষা। প্রতিকূল সময়ে তার টিকে থাকার ক্ষমতা জিন এডিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবকোষে যুক্ত করার কথাও ভাবা যেতে পারে। আর্কিয়ার আশ্চর্য গুণ কাজে লাগানো সম্ভব রোগ মোকাবিলাতেও।
দেখা যাক, কোন কোন প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে আছে এই এককোষী জীবাণু? ‘বর্তমান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভ্রজ্যোতিবাবু বলেন, ‘আন্দামানের ব্যারেন দ্বীপ, আমেরিকার ইয়েলো স্টোন ন্যাশনাল পার্ক, ইতালির সলফাটারা, রাশিয়ার কামচাটকা প্রভৃতি আগ্নেয়গিরিতেও দিব্যি বেঁচে আছে আর্কিয়া। ৯০-৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও এদের শেষ করতে পারেনি।’ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীতে দু’ধরনের প্রাণী রয়েছে। প্রোক্যারিয়োটস এবং ইউক্যারিয়টস। প্রোক্যারিয়োটস এককোষী, নিউক্লিয়াসবিহীন সরল জিনগত গঠনের। এর দু’টি ভাগ। ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া। অন্যদিকে ইউক্যারিয়টস বহুকোষী, জটিল জিনগত গঠনের প্রাণী। এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে পশুপাখি, গাছপালা, মানুষ, ছত্রাক ইত্যাদি। এককোষী আর্কিয়ার শরীরে টক্সিন ও অ্যান্টিটক্সিন নামের দু’টি প্রোটিন থাকে। পরিবেশ যখন বেঁচে থাকার পক্ষে অসহনীয় হয়ে ওঠে, আর্কিয়া নিজের কোষে অ্যান্টিটক্সিন নষ্ট করে দেয়। আর টক্সিন অংশটি তখন জীবাণুকে ডরম্যান্ট বা সুপ্ত করে শক্তিক্ষয় বাঁচায়।