২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। দু-দফায় ভোট নেওয়া হয়েছে মোট ২৯৩ আসনের। ভোটগ্রহণ সাঙ্গ হওয়ার কথা ছিল ২৯ এপ্রিল। কিন্তু ভোটে মারাত্মক কারচুপির অভিযোগ পেয়ে ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে ইসিআই। ওই একটিমাত্র কেন্দ্রের ২৮৫টি বুথের সবকটিতেই ভোট নেওয়া হবে নতুন করে আগামী ২১ মে। তার ফল ঘোষণা হবে ২৪ তারিখ। তার আগে পূর্বঘোষণা মতোই ২৯৩ আসনের গণনা ও ফলাফল ঘোষিত হয়েছে সোমবার। রেজাল্ট হয়েছে এইরকম: বিজেপি ২০৭, টিএমসি ৮০, কংগ্রেস ২, এজেইউপি ২, সিপিএম ১ এবং আইএসএফ ১। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় টিএমসি, ৭৭ আসন পেয়ে বিরোধী আসনে বসে বিজেপি। সেবার দুই প্রাক্তন শাসক দল কংগ্রেস এবং সিপিএম (বামফ্রন্ট) পুরো শূন্য হয়ে যায়। একুশের ভোটে বাংলা দখলে মরিয়া গেরুয়া শিবির ‘দুশো পার’ আওয়াজ তুলেও হতাশ হয়। অন্যদিকে, সরকার গঠনে হ্যাটট্রিক করেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কোমর বেঁধেই নেমেছিলেন নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা। বলা বাহুল্য, এবার তারই ফসল ঘরে তুলেছে বিজেপি।
বস্তুত তাদের এই জয় দেশজুড়ে যথার্থই ‘গেরুয়া ঝড়’ আখ্যা পেয়েছে। আমরা জানি, বিজেপি হল হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল জন সংঘের (পরে ভারতীয় জন সংঘ) উত্তরসূরি। জন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বঙ্গসন্তান শ্যাম্যাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেই হিসাবে বিজেপির সঙ্গে বাংলা ও বাঙালির সম্পর্কটি শুধু নিকট নয়, একেবারে ঘরের। আর এখানেই ছিল বিজেপি নেতৃত্বের আসল খেদ। শ্যামাপ্রসাদের ভাবশিষ্য অটলবিহারী বাজপেয়ীর হাত ধরে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ভারতের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠান হয় বিজেপির। মাঝে এক দশকের বিরতির পর ২০১৪ সালে ফের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তারা। সেই থেকে টানা চলছে মোদিযুগ, এমনকি দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেও বিজেপি/এনডিএ/ডবল ইঞ্জিন সরকার চলছে। কিন্তু পার্টির স্রষ্টার রাজ্যই অধরা তাঁদের। ‘অঙ্গ, কলিঙ্গ’ জয় করেছেন তাঁরা আগেই। অথচ এই সঙ্গেই উচ্চারিত হয় যে ‘বঙ্গ’ কথা সেটির নাগাল কিছুতেই পাচ্ছিলেন না তাঁরা। এবার সেই খেদ দূর হল তাঁদের। এই জয় তাই অবশ্যই ঐতিহাসিক, শুধু বিজেপির জন্য নয়, সারা দেশের রাজনীতির জন্যও। পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। রক্তক্ষয়, প্রাণহানি রুখে দেওয়ার চ্যালেঞ্জও নিয়েছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। সেই চ্যালেঞ্জে তাঁকে জয়ীই বলতে হবে। কারণ গত কদিনে বিক্ষিপ্ত কিছু গন্ডগোল হলেও, ভোটগ্রহণ এবং ভোটগণনা পর্বে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। বরং ফলতা কেন্দ্রের কিছু বুথে ভোট কারচুপির অভিযোগ পেয়ে কমিশন তদন্তসাপেক্ষে যে কঠোর পদক্ষেপ করেছে তা বাংলার নির্বাচনি ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। আশা করা যায়, ফলতার ভোটও যথাসময়ে শান্তিপূর্ণভাবে সাঙ্গ হবে। বাকি ২৯৩টি আসনের মতো সেখানেও মানুষ নিজের ভোট নিজেই দেবে।
তবেই তো তৈরি হবে মানুষের সরকার। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ঘোষণা করেছেন, বাংলার পরবর্তী সরকার শপথ নেবে আগামী ২৫ বৈশাখ। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সুচিন্তিত। কারণ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির প্রিয়। বাংলা ও বাঙালির প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সমস্ত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। সেই জন্যই তিনি বিশ্বকবি। আশা করা যায়, নতুন সরকার বিশ্বকবির বহুত্ববাদ এবং সবার বিকাশের আদর্শ মেনে কাজ শুরু করবে। বিজেপির ঘোষিত সমস্ত সংকল্প রক্ষায় ব্রতী হবে অর্ধশতকের প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকার। শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্য প্রভৃতি সবেতেই বাংলা ও বাঙালি ভারতকে বহুকাল নেতৃত্ব দিয়েছে। আমরা আগামী দিনে ফিরে পাব বাংলার সেই হৃতগৌরব। মনে রাখতে হবে, সবধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্তরিক লড়াই ছাড়া ওই মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব নয়। আর তার জন্য শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের বিশেষভাবে ব্রতী হওয়া দরকার। বাংলার মানুষের বহুকালের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণই সরকারের কাছে নিশ্চয় অগ্রাধিকার পাবে প্রথম দিন থেকেই।