Bartaman Logo
২১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সুরাহার আশা বৃথা

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুরেশ গোপী জানালেন, তেলের দাম কমবে না। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও সাধারণ মানুষের আশা পূরণ হবে না। বিস্তারিত পড়ুন।

সুরাহার আশা বৃথা
  • ২১ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কোনো রাখঢাক নেই। সোজা কথাটা সহজ করে বলে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী সুরেশ গোপী। এতে দেশের আম জনতা বিস্মিত হলেও তাঁরা আর কোনো প্রত্যাশা যে রাখবেন না— তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ শুরুর কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে দেশবাসীকে জ্বালানি ব্যবহারে ‘সংযমী’ হওয়ার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয় ধাপে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার ভোট মিটতেই বাড়ানো হয় পেট্রল-ডিজেলের দাম। চার দফায় প্রায় আট টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় পাইকারি ও খুচরো বাজারে কার্যত যাবতীয় নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। তেলের দাম বাড়লে তো এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু সম্প্রতি যুদ্ধ শেষের কথা আসতেই হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অশোধিত তেলের দামও এক ধাক্কায় অনেকটাই নেমে এসেছে। এই ‘সুখবরে’ পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের দাম কমবে বলে ভাবতে শুরু করে দেশবাসী। কিন্তু তাদের ভাবনা যে নিতান্তই ‘নির্বোধের’ মতো, তা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রীমশাই। আম জনতার আশায় জল ঢেলে দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এখনই তেলের দাম কমবে না। আগে হরমুজ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হোক, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক। তারপর ওসব ভাবা যাবে। 

Advertisement

পশ্চিম এশিয়ায় এই যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চ মাসের একটা সময় বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম পৌঁছে গিয়েছিল ব্যারেল পিছু প্রায় ১২০ ডলার। কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় ৪২ ডলার কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮ ডলারে। গত তিন মাসে যা সর্বনিম্ন। সাধারণ নিয়মে তাহলে জ্বালানি তেলের দামও সেই অনুপাতে কমা উচিত। কিন্তু মন্ত্রী জানিয়েছেন, পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের ‘সামান্য’ দাম বাড়িয়েও গত কয়েকমাসে যথেষ্ট নাকি লোকসান হয়েছে। ‘প্রিয়’ ভারতবাসীকে বাঁচাতে এই লোকসানের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা। এখন সেই লোকসানের বোঝা কমাতে হবে। তাই জ্বালানির দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই অন্তত নিকট ভবিষ্যতে। ভাবা যেতেই পারে মন্ত্রীর যুক্তি একেবারে অকাট্য। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম এক ডলার কমলেই ভারতে পেট্রল সস্তা হতে পারে ৫০-৬০ পয়সা। তার মানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল পিছু প্রায় ৪২ ডলার কমায় লিটারে পেট্রলের দাম কমার কথা ২০ টাকা। তা কিন্তু হচ্ছে না। কারণ নিজেদের ও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলির মুনাফা কমাতে নারাজ মোদি সরকার। বিরোধীদের অভিযোগ অন্তত তেমনই। অতীতেও একাধিকবার দেখা গিয়েছে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম কমলেও ভারতে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর চেষ্টাই করেনি মোদি সরকার। এখনও তাই লোকসানের অজুহাতে অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই সেই পথে হাঁটতে রাজি নয় কেন্দ্র। আসলে আম জনতাকে সুরাহা দেওয়ার চেয়ে রাজকোষ ভরানো ও ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করাটাই মোদি সরকারের ‘প্রায়োরিটি’। ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে বা মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় মানুষ জেরবার হলেও নির্লিপ্ত থাকাটাই শ্রেয়! 
ইতিহাস বলছে, নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার বছরে অর্থাৎ ২০১৪-তে অশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৮ ডলার। তখন পেট্রল-ডিজেলের দাম ছিল লিটার প্রতি যথাক্রমে ৭১.৫১ টাকা এবং ৫৬.৭১ টাকা। এখন অশোধিত তেল হয়েছে প্রায় ৭৮ ডলার। কিন্তু পেট্রল ডিজেলের দাম যথাক্রমে ১০২ এবং ৯৫ টাকা (কলকাতায় নয়)। এইভাবে অতিরিক্ত লাভ বা মুনাফা পাচ্ছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এবং তেল কোম্পানিগুলি। যেমন, কেন্দ্রীয় সরকার এক্সাইজ ডিউটি বসিয়ে গত কয়েক বছরে ৩০ লক্ষ কোটি টাকার বেশি আদায় করেছে। রাজ্য সরকার ভ্যাট আদায় করে। কলকাতায় পেট্রলের উপর ভ্যাটের পরিমাণ সম্ভবত ২৫ শতাংশ। আর তেল কোম্পানিগুলি শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষেই তেল বেচে লাভ করেছে ৭৭ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ অশোধিত তেলের দাম কমলেও এই তিন পক্ষের লাভালাভে হাত পড়ছে না। তাই তেলের দাম কমারও কোনো সম্ভাবনা নেই। মন্ত্রী আজ লোকসানের কথা বলছেন। কিন্তু অশোধিত তেলের দাম কম থাকার সময় জ্বালানির দাম না কমিয়ে গত কয়েক বছর অতিরিক্ত মুনাফা ঢুকেছে সরকারি কোষাগারে। সেটাও তো হিসাবের মধ্যে রাখা যেত। কিন্তু মোদি জমানায় সাধারণ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার সদিচ্ছার অভাব বারবার প্রকট হয়েছে। তাই বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম কমলে মানুষ তার সুফল পাবে এমন প্রত্যাশা করাই বৃথা। কিন্তু উলটোটা হলে অর্থাৎ অশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার ধাক্কা এসে লেগেছে পেট্রল ডিজেলের দামে। সব মিলিয়ে তাই মানুষের একটু সুরাহা পাওয়ার আশা দূর অস্ত।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ