শ্যামলেন্দু গোস্বামী, হিঙ্গলগঞ্জ: হিঙ্গলগঞ্জে রাজনীতির গল্প শুরু হয় ভোট দিয়ে নয়, ভয় দিয়ে! শামসেরনগরে আজও সন্ধ্যা নামলে ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হয় ঘরের দরজা। রায়মঙ্গলের ওপারেই সুন্দরবন। আর সেই জঙ্গল দক্ষিণরায়ের নিরাপদ আস্তানা। তবে মাঝেমধ্যেই তাদের আনাগোনা দেখা যায় লোকালয়ে! তাই এখানে মানুষ ঘুমায়, কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারে না। এই যেখানে কঠোর বাস্তব, সেখানে রাজনীতি মানে কেবল ফাঁপা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের ভাষ্য। আর এই জায়গাতেই শুরুতে এগিয়ে তৃণমূল। এমনটাই দাবি এলাকার মানুষজনের। কারণ, হিঙ্গলগঞ্জে উন্নয়ন কেবল রাস্তা বা ব্রিজের দৃশ্যমান উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়, তা ছুঁয়ে রয়েছে জীবনের ভয়কেও। ইছামতী, ডাঁসা, রায়মঙ্গল— এই তিন নদীর ভাঁজে গড়ে ওঠা এই জনপদে একসময় ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাই ছিল বিপদ। হাসনাবাদে ইছামতীর উপর সেতু না থাকায় নৌকা ছিল যাতায়াতের একমাত্র উপায়। ভাটায় নৌকা আটকে পড়া, একটু রাত হলেই পারাপারের অনিশ্চয়তা ছিল দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। কিন্তু আজ সেই ‘অভিশপ্ত’ ছবিটা পালটেছে। ইছামতীর উপর কংক্রিটের সেতু, ডাঁসা নদীর উপর কাঁটাখালি ব্রিজের সংস্কার—সব মিলিয়ে নদী আর বাধা নয়, বরং সহজ পথ। লেবুখালির দিকে যেতে যেতে আশা দাস নামে এক বৃদ্ধা বলছিলেন, ‘আগে জল আলাদা করত। এখন জলই জুড়ে দিয়েছে।’ আর এই পরিবর্তনই ভোটের ময়দানে তৃণমূলের সবচেয়ে বড়ো শক্তি।
গতবারের বিধায়ক দেবেশ মণ্ডলকে সরিয়ে এবার তৃণমূল প্রার্থী করেছে আনন্দ সরকারকে। প্রার্থী হিসাবে নতুন হলেও এলাকায় তিনি অপরিচিত নন। ১৯৯৮ সাল থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন সংগঠনের কাজ করেছেন। সাহেবখালির মাঝি রামেশ্বর মাইতির কথায়, ‘এখন নদী পেরতে যেমন ভরসা লাগে, তেমন নেতা দরকার, যাকে ভরসা করা যায়।’ পাটলির এক কৃষক বললেন, ‘দল কাকে টিকিট দিল, সেটা বড়ো কথা নয়। মানুষ কাকে চেনে, সেটা বড়ো। আনন্দ সরকাররে সবাই চেনে।’
অন্যদিকে, শামসেরনগরে আলো মানে কেবল পথচলার সুবিধা নয়, গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাও বটে। তাই জঙ্গলের ধারে আলোর ব্যবস্থা, বনদপ্তরের জাল পাতা—সব মিলিয়ে বাঘের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উদ্যোগ বেড়েছে। এলাকার বাসিন্দা দীপক কাহার বলেন, ‘আগে সন্ধে হলেই ভয় লাগত। এখন অন্তত বাইরে আলো থাকে। রাতপাহারা চলে। এখন ভয় কমেছে।
তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বনবিবির মন্দির—বিশ্বাসের প্রতীক। জঙ্গল আর মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেবী যেন এই জনপদের মানসিক সুরক্ষার অংশ। উন্নয়ন আর বিশ্বাসকে একসঙ্গে ধরেই এগচ্ছে তৃণমূল। এই প্রেক্ষাপটে হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্রকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। ২০২৪ সালে বসিরহাট লোকসভায় প্রার্থী হয়েছিলেন সন্দেশখালির গৃহবধূ রেখা পাত্র। লোকসভা ভোটে হারার পর নিজের এলাকাতেই তাঁকে দেখা যায়নি বলে একাধিকবার বিক্ষোভ হয়েছে। ‘প্রতিবাদী মুখ’ রেখার সঙ্গীরাও এখন তাঁর সঙ্গে নেই। আগামীতেও যে এলাকায় তাঁর উপস্থিতি থাকবে না, মানছে স্থানীয়দের একাংশ। টেংরা মোড়ের যুবক সুফল মণ্ডলের দাবি, ‘এই এলাকা দূর থেকে বোঝা যায় না, এখানে থাকতে হয়। হিঙ্গলগঞ্জে থাকাটা বড়ো কথা। নদীর ভাঙন, বাঘের আতঙ্ক, সীমান্তের টানাপোড়েন—এসবের মাঝে যে পাশে থাকে, মানুষ তাকেই বিশ্বাস করে।’ এই জায়গায় আনন্দ সরকারের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি তাঁকে এগিয়ে রাখছে। দেওয়াল লিখনেও সেই সুর। গ্রামেগঞ্জে তৃণমূলের বার্তা—উন্নয়ন আর নিরাপত্তা। বিজেপির উপস্থিতি তুলনামূলক কম, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। রাত গভীর হলে শামসেরনগরের আকাশে তারা জ্বলে। দূরে জঙ্গলের অন্ধকার। তার ভিতর লুকিয়ে থাকে বিপদ। সেই বিপদ দূর করতে এখন গ্রামে জ্বলছে আলো। হিঙ্গলগঞ্জের রাজনীতিও যেন সেই ছবির মতো—ভয়ের ভিতরেই গড়ে ওঠা আস্থা। সেই আস্থার স্রোত কোন দিকে, তার ইঙ্গিত মিলছে নদীর উপর সেতু থেকে গ্রামবাংলার দেওয়ালে। তৃণমূল প্রার্থীর কথায়, ‘মানুষ উন্নয়নের পক্ষেই আছে। আমাদের আমলে যে অনেক কাজ হয়েছে, তা অতি বিরোধীও স্বীকার করবেন। জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা।’ বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্রের কটাক্ষ, ‘আসলে তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি নেই। মানুষ তৃণমূলের দুর্নীতি থেকে বাঁচতে আমাদের ভোট দেবে। অপেক্ষা করুন, কী হয় দেখবেন!’