সোহম কর, কলকাতা: ‘ডাকাত ধরতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান ১৮ বছরের যুবক’-৯৪ বছর আগে পরের দিনের শিরোনামটি নিশ্চয় এরকমভাবেই লেখা হয়েছিল।
সোহম কর, কলকাতা: ‘ডাকাত ধরতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান ১৮ বছরের যুবক’-৯৪ বছর আগে পরের দিনের শিরোনামটি নিশ্চয় এরকমভাবেই লেখা হয়েছিল।
আগের দিনের ঘটনাটি মর্মান্তিক। এক গৃহস্থের সর্বস্ব লুট করে পালাচ্ছিল ডাকাতরা। একটি ফাঁকা মাঠে তখন বসেছিলেন সেখ দৌলত হোসেন (১৮)। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, দলটি ডাকাতি করতে গিয়েছিল গাড়িতে চেপে। পালানোর সময় পাড়ার লোকের চিৎকার শুনে ছুটে গিয়ে গাড়ির পাদানিতে উঠে পড়েছিলেন দৌলত। জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে চালককে বাধা দেন। তখন ডাকাত সর্দার হাত বাড়িয়ে গুলি চালায়। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে আসা গুলি দৌলতের বুক এঁফোড় ওঁফোড় করে দিয়েছিল। প্রাণ হারান তৎক্ষণাৎ। তখন কলকাতার পার্কসার্কাস প্রায় জঙ্গলের মতো ছিল। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটি মাত্র বাড়ি। দৌলত সেরকম একটি বাড়িতেই থাকতেন ১৯৩১ সালের সাত অক্টোবর পর্যন্ত। ডাকাতরা পরে ধরা পড়ে। কিন্তু দৌলত কোনওদিন ফিরে আসতে পারেননি। পাকাপাকিভাবে আশ্রয় নেন কবরে।
বীর ছেলেটিকে কিন্তু ভোলেনি কলকাতা। ২০২৫ সালের পার্কসার্কাসে গেলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ চোখে পড়বে। তাতে দৌলতের বীরত্বগাথা লেখা। এখনও এলাকার বাসিন্দাদের মুখে বেঁচে দৌলতের নাম। কয়েক মাস বাদে, দৌলতের দেহ যেখানে পড়েছিল সেখানে স্থানীয়রা একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেন। ১৯৩২ সালে ২৯ মে তার উদ্বোধন করেন বিচারপতি টি আমির আলি। তিনি সইদ আমির আলির পুত্র। দৌলতের মাকে দেড় হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। স্মৃতিস্তম্ভটিতে বাংলা, ইংরেজি, উর্দুতে লেখা ঘটনার বর্ণনা। ‘এই স্থানের বিশগজ উত্তর পূর্ব্বে ১৮ বৎসর বয়স্ক সেখ দৌলত হোসেন ১৩৩৮ সালের ২০ শে আশ্বিণ তারিখে অসীম বীরত্বের সহিত সশস্ত্র একদল দস্যু ধরিতে গিয়া তাহাদের গুলিতে জীবন উৎসর্গ করায় সর্ব্বসাধারণ কর্তৃক এই স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হইল।’
আজকের পার্কসার্কাসে ঝাঁ চকচকে শপিং মলের পাশ দিয়ে শামসুল হুদা রোড ধরে একটু হেঁটে গেলে পাওয়া যায় স্মৃতিস্তম্ভটি। কয়েক মাস আগে সেটি হেরিটেজ গ্রেড ওয়ান স্বীকৃতি পেয়েছে বলে স্থানীয়রা জানালেন। দৌলতের নামে আমান মহল্লা সোসাইটি কোচিং সেন্টার শুরু করেছে। সোসাইটির কর্মকর্তা শেখ রাজা, শেখ ইফতেকার, শেখ ওয়াসিম বললেন, ‘এ বছর এলএলবির প্রবেশিকা পরীক্ষার কোচিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। ৪০ জন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ৩৩ জন পাশ করেছেন।’ ইফতেকার বলেন, ‘এখানে বাড়ি বাড়ি সকলে দৌলতের কথা জানেন। তাঁর পরিবার এখন কোথায় থাকে কেউ জানে না। তবে এক সদ্য তরুণের বীরত্ব নিয়ে এলাকার গর্বের শেষ নেই। তাঁর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে চান সকলে।’
গুলিবিদ্ধ দৌলতের রক্তের উপর দিয়ে গড়ে ওঠা শামসুল হুদা রোডে এরপর অনেকবার পিচ পড়েছে। মানুষ হাঁটে, গাড়ি চলে। বাড়ি তৈরি হয়। তবে স্মৃতিস্তম্ভটি অনর্গলই শুনিয়ে চলে ৯৪ বছর আগের সে দিনটির কথা।