স্বর্গ-নরকের দরজা
আমাদের রক্ত-মাংস-চামড়ায় ঢাকা শরীরটা সতেরোটি উপাদান দিয়ে গঠিত। আমরা এ নিয়ে কখনও ভাবি না। ভাবি আমাদের গড়নটা নিয়ে। কে কতটা ফর্সা, শ্যামবর্ণ, কালো, রোগা, মোটা, লম্বা, নাক টিকালো না থ্যাবড়া, মুখশ্রী সুন্দর না সাধারণ। এইসব নিয়ে ভাবনা। আমাদের ভাবনা- চিন্তাগুলোকে মুনি-ঋষি-মহর্ষি-বেদান্তীরা বলেছেন, ‘স্থূলশরীরের ভাবনা।’
মৃত্যুর পর জীবাত্মা স্থূলশরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তখনও একটা শরীর থাকে। মহাত্মারা একেই বলছেন, ‘সূক্ষ্মশরীর।’ মানুষের এই সূক্ষ্মশরীরটাই সতেরোটি অবয়বযুক্ত। গীতায় মানুষের স্থূলশরীরটাকে বলা হয়েছে, ‘পঞ্চভূতের শরীর’।
পঞ্চভূতের যে শরীর, তার জন্ম হচ্ছে ও মৃত্যু আছে, কিন্তু যা নিত্য আত্মা —তার কোনও পরিবর্তন নেই, তা অবিনশ্বর ও কূটস্থ। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কূটস্থ কী?’ শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমার শরীরটা তো আজ আছে, কাল নেই, অনিত্য।’
বার বার আমাদের শরীরটাই পরিবর্তিত হচ্ছে, সুন্দর-কুৎসিত, লম্বা-খাটো নানান অবয়বই ধারণ করছে, জন্ম নিচ্ছে, বড় হচ্ছে, বৃদ্ধ হচ্ছে, শেষে পঞ্চভূতের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শরীরটা পার্থিব বস্তু। সংসারের মধ্যে রয়েছে শরীর। সংসারে যেমন নানারকম উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ, শরীরটাও তেমনই আজ ভালো তো কাল মন্দ। কত রোগ-শোক-ঝামেলা-দুর্বিপাক ভোগ করছে শরীর। যখন যৌবন তখন কত হম্বিতম্বি, দাপাদাপি, ঝগড়া-লড়াই — যেই কালের নিয়মে সে ন্যুব্জ হল, দাঁত গেল, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে পড়ল, তখনই প্রিয়জনদেরই নানান অসহযোগ আর অসহিষ্ণুতায় চলমান সংসারকে ভ্রম বলে মনে হতে লাগল। আগে মনে হয়নি সেসব। তখন রক্তের জোর, যৌবনের উন্মাদনা —সমস্ত কিছু গ্রাস করবার মানসিকতা। তখন মনে হয়নি অনিত্য এই শরীরটার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলে যাবে।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সচেতন করলেন, ‘তোমার শরীর পরিবর্তিত হতে হতে একদিন জাগতিক নিয়মে চলে যাবে, কিন্তু তোমার মধ্যে যে আত্মা— তার কোনও পরিবর্তন হবে না, যার কোনও বিকার নেই, পরিবর্তন নেই, তার নামই কূটস্থ।’
সাধুসন্তদের সর্বক্ষণ নজর থাকে কূটস্থের দিকে। তাঁরা স্থূলশরীর নিয়ে অত ভাবিত নন, কেমন পোশাকে আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে বা মানাচ্ছে — এই নিয়ে এঁদের হেলদোল নেই। এঁরা জেনে গিয়েছেন সূক্ষ্মশরীরটার কথা। যার মধ্যে রয়েছে পঞ্চপ্রাণ— পাঁচ ধরনের বাতাস। কণ্ঠ থেকে নাভি পর্যন্ত বইছে প্রাণবায়ু, যা খাবার দাবারকে হজম করছে। নাভির নীচে রয়েছে অপান বায়ু, এর মাধ্যমে শরীরটার পুষ্টিসাধন হচ্ছে। গোটা শরীরে বইছে সমান বায়ু, যা কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য— এই সমস্ত বাড়বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। অস্থি-হাড়ে রয়েছে উদান বায়ু, যা শরীরটাকে তরতাজা রাখছে। চোখ-নাক-জিভে রয়েছে ব্যান বায়ু, যা উৎসাহ উদ্দীপনা এনে দিচ্ছে আমাদের। এই পাঁচটি বায়ুকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেন সর্বত্যাগী সাধুরাই। এজন্যই তাঁদের শরীর বার্ধক্যেও সবল থাকে। স্থূলশরীরের ভাবনা থেকে দূরে বলেই দীর্ঘায়ুর অধিকারী হন এঁরা। সাধারণ মানুষের মতো স্বর্গ-নরক নিয়ে এঁদের অত ভাবনা-চিন্তা নেই। ভগবানের ইচ্ছাই তাঁদের ইচ্ছা। তাঁরা শরণাগতি প্রাপ্ত হয়েছেন।
পঞ্চপ্রাণের পর সূক্ষ্মশরীরের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়— কান-চোখ-জিভ-নাক-ত্বক। আমরা এই সমস্ত দিয়ে ভালো-মন্দ দেখি শুনি, খাইদাই, মজা করি, হিংসা-দ্বেষে ডুবে থাকি। সাধুরা এর অপার্থিব ব্যবহারটা জানেন। চোখকে তাঁরা দিব্যনেত্রে পরিণত করেন। জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটিয়ে তাঁরা কত মানুষের দৈব-দুর্বিপাকের বর্ণনা দিতে পারেন। কান, নাক, জিভ, ত্বককেও এঁরা অপার্থিবভাবে ব্যবহার করেন। বিষয়কর্মের ছোঁয়া এঁদের জ্ঞানেন্দ্রিয়ে লাগে না বলেই এগুলো সব বেঁচে থাকতেই সূক্ষ্ম হয়ে পড়ে।
জ্ঞানেন্দ্রিয়ের পর পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়— হাত-পা এই সমস্ত প্রত্যঙ্গ। মানুষের প্রত্যঙ্গগুলোর অস্থিসন্ধিতে থাকে চক্রাবেশ। গোটা শরীরের পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়ের জায়গাতে রয়েছে পাঁচ-পাঁচটি চক্রের আবেশ —মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ। এই চক্রগুলোকে সক্রিয় করে সাধুসন্তেরা জন্ম-মৃত্যুর অতীত হতে চেষ্টা করেন। এঁরা স্বর্গ-নরকের কথাবার্তা বলেনও না। বলেন মোক্ষ ও মুক্তির কথা। শ্রীরামকৃষ্ণকে যতবারই পরলোক সম্বন্ধে ভক্তেরা প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি ততবারই এড়িয়ে গেছেন। বলেছেন, ‘আম খেতে এসেছ আম খাও, গাছে কটা পাতা আছে গোনবার কী আছে।’
পনেরোটি সূক্ষ্ম অবয়বের সঙ্গে আরও দুটি উপাদান যুক্ত হয়ে সূক্ষ্মশরীর তৈরি হয়। এক, মন। দুই, বুদ্ধি। আমাদের মনে থাকে কাম-কামনা, যা নিয়ে আমরা সবাই অধিকার আর প্রাপ্তির জন্যে লড়ে মরি। কত অতৃপ্ত বাসনা, খেদ, হতাশা, ব্যর্থতা নিয়ে শেষে রোগে-শোকে ভুগে মরে যাই। যাতে বেঁচে থাকতে ভালো ও শুভ কর্মের পথে এগই, এর জন্য মহর্ষি, ঋষি, আচার্যরা স্বর্গ-মর্ত্য-নরক নিয়ে কত কত গভীর অনুধ্যানের কথাবার্তা আমাদের জন্য লিখে রেখে গিয়েছেন শাস্ত্র হিসেবে। সাধুরা এইসব অনুশীলনের মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকতে স্থূলশরীরটাকে মেরে ফেলেন।
মরমিয়ারা বলেন, ‘জ্যান্তে মরা’। বেঁচে থাকতেই মরে যাওয়া। মৃত্যু থেকে অমৃতের পথে চলে যান সন্তেরা। তাঁরা জাগতিক বুদ্ধি দিয়ে জমি-বাড়ি-সম্পত্তি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন না। এঁদের পাপ-পুণ্যের কোনও বালাই নেই। স্বভাবতই স্বর্গ-নরক নিয়ে এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই আলাদা রকমের হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সামুরাই ছিলেন জাপানের একজন যোদ্ধা। তিনি গিয়েছেন রিন-ঝাই সম্প্রদায়ের প্রবক্তা হাইকুনের কাছে। সামুরাই যুদ্ধ করতে গিয়ে মৃত্যু ও হত্যার সম্মুখীন হতে হতে শেষে এসে পৌঁছলেন বিরাট এক জীবন জিজ্ঞাসা নিয়ে সাধু হাইকুনের কাছে। সামুরাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘মহাত্মা, স্বর্গ-নরক বলে সত্যিই কি কিছু আছে?’
হাইকুন বললেন, ‘তুমি এ সমস্ত জানবার কে হে?’
আঁতে ঘা লেগে গেল সামুরাইয়ের। তৎক্ষণাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি একজন ক্ষত্রিয়। যোদ্ধা।’
হাইকুন বললেন, ‘আরে তাই নাকি! কিন্তু তোমাকে একটা ভিখিরির মতো দেখতে লাগছে। তবে তোমার একটা তরোয়াল আছে বটে। তবে ওটা খুবই ভোঁতা। আমি নিশ্চিত ও দিয়ে তুমি আমার মাথা কাটতে পারবে না।’
সামুরাই রেগে গিয়ে খাপ থেকে তলোয়ারটা খুলে ফেললেন। হাইকুন মৃদু হেসে বললেন, ‘এই দেখ, তুমি নরকের দরজা খুলে ফেললে।’ যোদ্ধা সামুরাই এবার লজ্জায় আচার্যের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর এই অবস্থা দেখে সাধু হাইকুন বলে উঠলেন, ‘এই তো, এবার তুমি নিজেই দেখ কীরকম করে স্বর্গের দরজা খুলে দিলে।’
সৃষ্টি হচ্ছে, ধ্বংসও হয়ে যাচ্ছে
মানুষ বেঁচেবর্তে আছে ‘আমি’ ও ‘আমার’ এই বুদ্ধিরূপ মোহকে আশ্রয় করে। ঋষিরা বললেন, ‘শরীরটাকে মানুষ ভাবে আমি। আর শরীর সংক্রান্ত যা কিছু সেসবকে মনে করে আমার।’ মানুষের সর্বক্ষণ ‘আমি আমি’ করে চলাকে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,‘কাঁচা আমি’। ও যে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ নয়। প্রকৃত স্বরূপ হল আত্মা। ‘কাঁচা’ আমি যতক্ষণ না ‘পাকা’ হচ্ছে ততক্ষণ সংসারে জীবের যাতায়াত চলতেই থাকে।
শরীরকে আশ্রয় করে মানুষের যাবতীয় বেড়ে ওঠা। মোহের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে আত্মা। মোহ রয়েছে স্থূলশরীরে লেগে। ওই শরীর-ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই সূক্ষ্ম অবস্থাটা ধরা পড়বে। শরীরটা যে আকাশ-বায়ু-অগ্নি-জল ও মাটি এই পঞ্চভূতে গড়া— এই বোধ মনে উঠলেই, মোহ সরতে থাকবে। মনের আয়নায় তখন ফুটে উঠতে শুরু করে নিজের প্রকৃত স্বরূপ। বেদান্তীরা একেই বলছেন, ‘আত্মজ্ঞান’। আত্মজ্ঞান না হলে আত্মার অভিব্যক্তি ফুটবে না মনশ্চক্ষে। এই দৃষ্টি না হলে স্বর্গ-নরকের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা জন্মাবে না কখনও।
আমাদের অস্থি-চামড়া দিয়ে ঢাকা স্থূলশরীরে রয়েছে পাঁচটি কোষ। পঞ্চকোষ দিয়ে ঢাকা মানুষের আত্মা। মরমিয়াবাদীরা বলেন, ‘মানুষের শরীর আদতে একটা কৌটো, তার মধ্যে প্রাণ-মন-বুদ্ধি এরা সব একটার ভেতর আর একটা কৌটো পরপর বসানো আছে। পাঁচটি কোষ রয়েছে পাঁচখানা কৌটোতে আটকে। ঢাকনা খোলাটাই সাধনা।’
অন্নময়কোষ হচ্ছে অন্নের দ্বারা পুষ্ট স্থূলশরীর, প্রাণময়কোষ হচ্ছে পঞ্চপ্রাণ, মনোময়কোষ হচ্ছে মন। যখন সূক্ষ্মশরীরের ভাবনারাশি প্রবেশ করবে গুরু বা আচার্যের সহায়তায়, তখনই একমাত্র প্রাণময় ও মনোময়কোষ সম্পর্কে অবগত হওয়া যাবে। প্রাণের মধ্যে রয়েছে বায়ুস্তর, এগুলোকে সাধুসন্তেরা ব্যবহার করে থাকেন। দম ও শ্বাসের নানা কাজ দিয়ে শরীরটাকে তাঁরা অতীন্দ্রিয় অনুভূতির ধারক করে ফেলেন বলেই তাঁরা স্থূলশরীরের কৌটোর ঢাকনা খোলার পর বাকি দুটো কৌটোও খুলে নেন। এই পর্যন্ত সাধকের কাজ। সূক্ষ্মশরীরের পর আরও একটি স্তর আছে সাধনরাজ্যে। যাকে বলা হচ্ছে, কারণশরীর। কারণশরীরে কোষ দিয়ে ঢাকা থাকে আত্মা। মরমিয়ারা বলেন, ‘শ্যাওলায় ঢাকা জলের উপর থেকে শ্যাওলার আস্তরণগুলো সরিয়ে দিলেই দেখা যায় কাকচক্ষু জল টলটল করছে, এও তেমনই। কারণ শরীর প্রকট হলেই বিজ্ঞানময় কোষের কৌটো পাওয়া যায়, তারপরই মিলবে আনন্দময় কোষের কৌটো। সেটি খুলতে পারলেই আত্মা স্বমহিমায় প্রকাশিত হবেন। সমস্ত আবরণ খসে না গেলে তাঁকে যে কোনওভাবেই দেখা যায় না।’
মানুষের যে শরীর যখন সক্রিয় থাকে, তখন সে সেই ভাব পোষণ করে। সন্তেরা থাকেন কারণ শরীরে বলেই সেখানে আত্মা-পরমাত্মার প্রতিফলন ঘটে।
স্থূলশরীরটাকে যখন আমরা আর ব্যবহার করতে পারি না, তখনও কামশরীরে প্রকট থাকি। স্থূলশরীরের সঙ্গে অন্নময়, প্রাণময়কোষ চলে গেল ঠিকই কিন্তু আচার্যরা বলছেন, ‘মানুষের মনোময়কোষ বর্তমান থাকে।’ মনোতুষ্টি তো কারও হয় না। অতৃপ্ত বাসনা রেখে মানুষ পৃথিবী ছাড়ে। মনোময়কোষটাই কামের। একেই সাধু-মরমিয়ারারা বললেন, ‘কামদেহ’। কামদেহে মানুষ ততক্ষণ থাকে, যতক্ষণ কামনা পুরণের প্রবৃত্তি আছে মনে। এই জগতকে অধ্যাত্মবাদীরা বলছেন, ‘ভুবর্লোক’। মানুষের ভুবর্লোকের অবস্থানকাল শেষ হয়ে গেলে, কামনাপূরণের অবস্থাটা আর না থাকলেও বাসনাটা তখনও মরে না বলেই স্বর্গলোকে বাস করবার কথাটা বলা হয়।
তৈত্তিরীয় উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, এই জগতে যত প্রাণী আছে সব খাদ্য থেকে উৎপন্ন। খাদ্য দ্বারাই জীব পুষ্ট হয়ে খাদ্যতেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর পর সবই খাদ্য হয়ে যাচ্ছে।
প্রাণের স্তরে থাকে উর্জা। উর্জা হল আধ্যাত্মিক স্তর। মানুষের সূক্ষ্মশরীরের মধ্যে রয়েছে উর্জাশক্তি। শরীর আমাদের বায়ু দিয়েও তৈরি। উপনিষদের ঋষিরা পাঁচটি পাখির উপমা দিয়ে পঞ্চপ্রাণ বা বায়ুর নামকরণ করে কার্যবিধি বলে দিয়েছেন। মরমিয়ারা শরীরটাকে বলেন, ‘প্রাণপাখি—খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়!’
প্রাণের মধ্যেই রয়েছে মন। মনেই যাবতীয় চিন্তা ও বিড়ম্বনা। এই তিন কোষ নিয়ে মানুষের ভৌতিকশরীর। কর্মবন্ধনে আটকে আছে ভৌতিকশরীর। যতক্ষণ চাওয়াপাওয়া ঘেরা জাগতিক কর্ম ততক্ষণই কামদেহ। শ্রীকৃষ্ণ এই কারণেই নিষ্কাম কর্ম করবার উপদেশ দিয়েছেন। মানুষের বাসনা ও বন্ধন মুক্তির এই একমাত্র উপায়। শ্রীকৃষ্ণ বারে বারে এ কথা স্মরণ করাচ্ছেন শিষ্য অর্জুনকে। ভৌতিকদেহেই যত কামনা আর বাসনা। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘করে যেতে হবে তোমাকে নিষ্কাম কর্ম।’ অর্থাৎ, যে কামনায় কোনও প্রতিদান থাকবে না। যে বাসনায় কোনও বন্ধন থাকবে না।
বিজ্ঞানময়কোষে ভৌতিকশরীরের সঙ্গে সম্পর্কসূত্র থাকে না। এখানে আত্মার সঙ্গে সম্পর্কসূত্র তৈরি হয়। মানুষের মধ্যকার আধ্যাত্মিক স্তরটিই বিজ্ঞানময়। এর পর পুরোপুরি অভৌতিক একটা স্তর। আনন্দময়কোষের রাজ্য।
উপনিষদের ঋষিরা বললেন, ‘জীবাত্মাই আনন্দময়। সাধনায় আনন্দময় ব্রহ্মেরই প্রকাশ ঘটলে আত্মা ও ব্রহ্ম একীভূত হয়ে পড়ে।’
ভৌতিকশরীরটা নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু বিজ্ঞানময়শরীরটা আনন্দময়শরীরের সঙ্গে মিশে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে থেকে যায়। মৃত্যুর পর ভৌতিকশরীর পঞ্চভূতে বিলীন হলেও কর্মবন্ধন কাটে না বলেই আবার মানুষ শরীর ধারণের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে। সাধুরা বন্ধন থেকে মুক্ত বলেই জন্মমৃত্যুর চক্রে আর আসেন না, স্বর্গ-নরক নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই।
ব্রজবিদেহী মোহন্ত স্বামী সন্তদাস বাবাজির মানসকন্যা শোভা মা গুরুকে স্থূলশরীরে পেয়েছিলেন কয়েকমাস। এরপর সন্তদাস বাবাজি তাঁকে সূক্ষ্মশরীরে দর্শন দিতেন। কাশীতে তিনি পরিচিতা ছিলেন ব্রহ্মবালিকা নামে। পনেরো বছর বয়সে শোভা মায়ের ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হয়। ১৯৩৮ সালে কাশী থেকে তাঁকে দেখতে ত্রিপুরার বরকান্তায় ছুটে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত গোপীনাথ কবিরাজ। মা আনন্দময়ী পর্যন্ত ব্রহ্মবালিকা শোভা মাকে দর্শন করতে কনখল থেকে কলকাতা ছুটে আসেন।
শোভা মাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘মৃত্যুর পর সূক্ষ্মদেহী আত্মার কী অবস্থা হয়?’
মা উত্তর করলেন, ‘আত্মার সাধনা কতটা ছিল তার উপরে সব নির্ভর করে। স্বর্গের সাতটি স্তর আছে। যত ঊর্ধ্বগতি হবে ততই সূক্ষ্মদেহের সংস্কার ক্ষীণ হতে থাকে। স্বর্গেও সুখ-দুঃখ আছে এবং ভোগ আছে— তপলোক পর্যন্ত এগুলি থাকে, তবে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। সত্যলোকে খুবই ক্ষীণ হয়ে যায়। মৃত্যুর পরে আত্মা প্রথমে যায় চন্দ্রলোকে। উন্নত আত্মা সূর্যলোক ভেদ করে আরও উন্নতলোকে যায়। বৈকুণ্ঠ-ধ্রুবমণ্ডল থেকে দূরে বা ঊর্ধ্বে মুক্ত আত্মারা যান। ধ্রুবমণ্ডল একটা পথের নির্দেশ, ব্যক্তিবিশেষে এর উত্তর দেওয়া যায়, সর্বসাধারণের জন্য বলা যায় না। এইটুকু জেনে রাখ, ধ্রুবমণ্ডল সত্যলোকের আশপাশে কোথাও। ধ্রুব-প্রহ্লাদ— যাঁদের জন্য সত্যলোকের কাছাকাছি একটা লোকই সৃষ্টি হল তাঁরা কোন পর্যায় এর থেকেই বুঝে নাও। তবে এরকম অসংখ্য লোক আছে— সৃষ্টি হচ্ছে, আবার ধ্বংসও হয়ে যাচ্ছে।’
টোকা দাও, খুলে যাবেই
মৃত্যুতে শরীরটা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও যোগীরা মানসশরীরের প্রতি আস্থা রাখেন। সূক্ষ্মশরীরকে এঁরা বলেন, ‘লিঙ্গদেহ’। লিঙ্গশরীরে কামনা-আবেগ-বাসনা এগুলি থাকেই। কিন্তু এ শরীরের মধ্যেই রয়েছে মানসশরীর, যা অতি সূক্ষ্ম উপকরণে তৈরি, এখানে বাসনা-কামনার বেড়াজাল থাকে না।
মানসশরীরের আরও সূক্ষ্ম স্তর কারণশরীর। এই সমস্ত শরীর ইথার তরঙ্গে ভাসতে থাকে সাধকদের সাহায্য করবার জন্য। অতি উচ্চ পর্যায়ের আত্মা এঁরা। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ১৮৯২ সালে গিয়েছেন এলাহাবাদ কুম্ভে। শিষ্যদের নিয়ে বসে রয়েছেন তিনি রাতের চড়ায়। প্রদীপ জ্বলছে। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন এক বেঁটে সাধু। হঠাৎ এলেন, হঠাৎই চলে গেলেন। কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইনি কে ছিলেন গুরুদেব?’
বিজয়কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, ‘ত্রৈলঙ্গ স্বামী।’
কুলদানন্দ বললেন, ‘এ কোন দেহ তাঁর?’
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বললেন, ‘পরমহংসের দেহে প্রবেশ করে সিদ্ধ যোগীরা সাধুদের সাহায্য করতে আসেন মাঝে মাঝে।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গয়ার আকাশগঙ্গা পাহাড়ে বিজয়কৃষ্ণের দীক্ষার আগে তিনি কাশীতে ত্রৈলঙ্গস্বামীর কাছ থেকে মন্ত্র পেয়েছিলেন। যোগীপুরুষেরা বলেন, ‘কামদেহ ছেড়ে গেলেই মানসশরীরটা তৈরি হয়। মানসদেহ থাকে যে লোকে সেটাই স্বর্গলোকের সবচেয়ে নিম্নস্তর।’ সাহায্যকারী যোগীদের আত্মা এই স্তরে থাকে। এঁদের অনায়াস সাহায্য পাওয়া যায়।
আনন্দমঠ পরম্পরার গুপ্তসাধিকা রাজরাপ্পার যোগিনী মাঈ একবার বলেছিলেন, ‘ধ্যানের আগে এমন মহাত্মাদের স্মরণ করে আসনে বোসো যাঁদের আত্মা পৃথিবীর খুব কাছাকাছি আছে।’
জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কাদের স্মরণ করব, মাঈ?’ যোগিনী মৃদু হেসে বললেন, ‘প্রচ্ছন্নাবতার রাম ঠাকুর, মা আনন্দময়ী, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, জ্ঞানগঞ্জের যোগী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস। এঁরা মানসশরীরে আছেন। ধ্যানের গভীরে যেতে পারলে তোমার গুরুর সাহায্য ছাড়া এঁদেরও তুমি সহযোগিতা পেতেই পার, যদি এঁদের কারও সম্পর্কে তোমার অত্যধিক শ্রদ্ধা থাকে। জানো তো মানুষের শরীরে কণ্ঠ চক্রের দুটি নাড়ির মধ্যে রয়েছে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নামক দুটি সূক্ষ্মগ্রন্থি। এগুলো যাদের প্রবলভাবে খুলে যায় তাঁরা গুরু-আচার্য আর মানসলোকের মহাত্মাদের সাহায্য চট করে পেয়ে যায়। এই হল স্বর্গের দ্বার, টোকা দাও। খুলে যাবেই।’
মানসলোক— আমাদের পার্থিববিদ্যার সাহচর্যে গড়া ধারণার বাইরের এ জগৎ। এখানে একস্থান থেকে অন্যস্থান, নীচ বা উপর, কাছে বা দূরে— এসব ভেদাভেদের বালাই নেই। কারণ অতীন্দ্রিয় ভূমিতে সমস্ত লোকগুলোই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনও মানুষ স্থূলশরীর ছেড়ে এসেছে, সে ভুবর্লোকে স্থিতিকাল অতিবাহিত করতে পারে, আবার এমনও হতে পারে চন্দ্রলোকে চলে গেছে। আমরা তো পৃথিবীলোকের বাইরে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে পাই না কিছুই। সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো মুনি-ঋষি-আচার্য-সন্তদের এক্তিয়ারে। স্থূললোকের সঙ্গে এঁদের বেঁচে থাকতেই কোনওরকম কোনও সম্বন্ধ থাকে না।
প্রাণের বুভুক্ষা যেমন সাধারণ মানুষকে বহির্মুখ করে, তেমনই মনের জিজ্ঞাসাও তাকে একইভাবে অন্তর্মুখ করে। অন্তর্মুখীনতা মানুষকে অধ্যাত্মচেতা করে তোলে। এমন মানুষই অন্তরের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজেকে জানেন, নিজের মধ্যে ডুবে যান, অহরহ আত্মস্থ হয়ে বাস করেন। উপনিষদের ঋষিরা সেই কোনকালে বলে গিয়েছেন, ‘মানুষের ইন্দ্রিয়ের মোড় বাইরের দিকে ফেরানো, তাই সে কেবল বাইরেটা দেখে, ভিতরের দিকে ফিরে নিজেকে দেখতে পায় না। ভিতরের দিকে তাকালে সে দেখে কেবল নীরন্ধ্র অন্ধকার।’
যোগীরা বলছেন, ‘প্রাকৃত চেতনা নিয়ে, দেহটাকে বস্তুপিণ্ডরূপে দেখে যদি তোমরা স্বর্গ-নরকের ধারণা কর তাহলে তার মধ্যে কেবলমাত্র সংসারের জড়ত্বগুলো খালি কল্পনা করতে থাকবে। দিব্যজীবন যাপন কর, বিদেহ-ভাবনা কর, আর স্বর্গ-নরকের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে অবিরাম জপ কর— আমি চিন্ময়, আমি গভীর, আমি শাশ্বত, আমি বিরাট, তাহলেই একটা নিঃসীম রহস্যরাজ্যের মধ্যে তুমি প্রবেশ করতে পারবে।’
নরক চতুর্দশী
ভারতের লোকায়ত সংস্কৃতির সম্পূর্ণ চিত্রটির প্রথম দেখা মিলল অথর্ববেদে। ভক্তি, জন্মান্তরবাদ, মায়াবাদ, যোগসাধনা, বৈরাগ্য, ব্রত, উপবাস— সমস্ত কিছুর সম্মিলন ঘটল গিয়ে শেষে পুরাণ সাহিত্যে। সকাম স্বর্গকামনা করতে গিয়ে বৈদিক ঋষিদের নিষ্কাম মুক্তির সাধনা ও কর্মকাণ্ডগুলো ক্রমশ যেন আলগা হতে থাকল এইবার। বৈদিক দেবদেবীরা পর্যন্ত লোকায়তরূপে ছড়িয়ে গেলেন। আঠারোটি মহাপুরাণের শেষটি গরুড়পুরাণ। এই পুরাণে লোকায়ত্য ও তার বিন্যাস যেন নজর কাড়ল আলাদা করে। এখানেই বলা হল যে মর্তের ওপরে স্বর্গের অধিষ্ঠান আর নরক মর্তের ঠিক নীচে, পাতালে।
রাজা পরীক্ষিৎ ব্যাসদেবের পুত্র মুক্তপুরুষ শুকদেবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নরক কোথায়?’
শুকদেব উত্তর দিলেন, ‘ত্রিলোকের মধ্যেই রয়েছে নরক। দক্ষিণ দিকে পৃথিবীর নীচে জলের ওপর এর অবস্থান।’
পৌরাণিক ঋষিরা একযোগে মানুষের কৃতকর্মের অবস্থান চিহ্নিত করতে গিয়ে স্বর্গ-নরকের ধারণাগুলো স্পষ্ট করতে থাকলেন। নরকে বাস করেন পিতৃরাজ যম। তিনি সূর্যদেবের পুত্র। ঋগ্বেদের মতো প্রাচীন গ্রন্থে সরাসরি নরকের কোনও বিস্তারিত বিবরণ নেই। নরক বলতে বৈদিক ঋষিরা বলছেন কেবলমাত্র একটি মন্দ স্থানের কথা। অন্ধকার অতল গর্ভ। অথর্ববেদের ঋষিরাই প্রথম নরককে চিহ্নিত করলেন অন্ধকারের ক্ষেত্র বলে আর শেষে বললেন, ‘হত্যাকারীরা বন্দি থাকেন নরকেই।’ এভাবেই নরকের ভাবনা লোকায়ত সমাজে প্রতিফলিত হতে লাগল। শতপথব্রাহ্মণে নরকের যন্ত্রণা বিস্তারিতভাবে উঠে এল। মনুস্মৃতিতে নরকের নামকরণ করা হল। মহাকাব্যগুলোতে লেখা হল, ছায়াহীন ঘন জঙ্গল হল নরক, সেখানে জল নেই, বিশ্রাম নেই। যমদূতেরা তাদের প্রভুর আদেশে আত্মাদের খালি কষ্ট দিচ্ছে।
পৌরাণিক সাহিত্যে নরকের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে শেষে গিয়ে দাঁড়াল পঞ্চান্ন কোটির বেশি। তার মধ্যে একুশটি নরকের গুরুত্ব দেওয়া হল। ভাগবতপুরাণে নরকের অবস্থানটি দেখানো হল পাতাল ও গর্ভোদক মহাসাগরের সাতটি রাজ্যের মধ্যে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে নীচের অংশ এটি। দক্ষিণ পাতালে পিতৃলোকে নরকের অবস্থান। দেবীভাগবতে বলা হল, মহাবিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে নরকের অবস্থান। পৃথিবীর ঠিক নীচেই নরক কিন্তু পাতালের উপরে। বিষ্ণুপুরাণে বলা হল, মহাবিশ্বের নীচে মহাজাগতিক জলের অতল গভীরে রয়েছে নরক। পুরাণ ও মহাকাব্যগুলো একটি বিষয়ে একমত যে দক্ষিণ দিকে নরকের অবস্থান, দিকটি যম দ্বারা পরিচালিত। যমের রাজধানী পিতৃলোক। সেখান থেকেই মানুষকে কৃতকর্মের জন্য দায়ী করে ন্যায়বিচার প্রদান করা হয়।
সাধুগুরুরা দক্ষিণ দিকটিকে মান্যতা দেন খুব। তন্ত্রসাহিত্যে বলা হয়েছে, কালীপুজো করলে মৃত্যু দূরে পালাবে। এজন্যই মায়ের নাম রাখলেন তান্ত্রিকেরা, দক্ষিণাকালী। তন্ত্রগুরুরা বললেন, ‘মৃত্যুরূপী মনের কালোছায়া— তার নামই যম। মানুষের মনের সমস্ত রকমের ময়লামাটি হল যম, অকল্যাণকর যাবতীয় চিন্তাগুলোও যম। এগুলোকে তাড়াতে হবে। এর জন্যেই দক্ষিণাকালীর সাধনা। কালীনামে সব দূরীভূত হয়ে পড়বে।’
সাধুরা বলেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর শরীর পঞ্চভূতেই মিলিয়ে যায়। ভূত চতুর্দশী হল পঞ্চভূতকে সম্মান প্রদর্শনের তিথি।’ প্রেতসাধকেরা বলেন, ‘কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীটি হল নরক চতুর্দশী। মানুষের শরীরের মধ্যেই রয়েছে সপ্তস্বর্গ— ভূ, ভুবঃ, স্বঃ, জনঃ, মহঃ, তপঃ ও স্বর্গ। সপ্ত ঊর্ধ্বলোক রয়েছে শরীরের সাতটি পদ্মচক্রে। আবার শরীরের নীচে রয়েছে আরও সাতটি লোক— অতললোক, বিতললোক, সুতললোক, তলাতললোক, মহাতললোক, রসাতললোক ও পাতাললোক। এই দুই সাত মিলিয়ে চোদ্দো।’ পৌরাণিক সাহিত্যে জীবের অবস্থান রয়েছে চোদ্দোলোকে। এ ধারণা থেকেই চোদ্দোলোক আলোকিত করার জন্য কার্তিকের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানো হয়। মৃত্যুর দেবতা যমরাজের পুজো হয় এদিন। তার ঠিক আগের দিন কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে হয় ধন্বন্তরী দেবতার পুজো। মানুষ রোগব্যাধির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে ধন্বন্তরী দেবতার পুজো করে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পরদিন যম চতুর্দশীর ব্রত পালন করে। এর পেছনে রয়েছে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত হয়ে দীর্ঘ জীবন লাভ করার সদিচ্ছা। প্রেতসাধকেরা বলেন, ‘মানুষের দুটি চোখ, দুই নাসিকার ছিদ্র, দুই কান, একটি মুখগহ্বর, পায়ুদ্বার আর লিঙ্গদ্বার দিয়ে শুভ ও অশুভ দু’ধরনের কার্যবিধি সম্পন্ন হয়। এই ন’টি দরজাই স্বর্গ-নরকের। নবদ্বারে তাই বাতি দিতে হবে, নটি দ্বার দিয়ে সাধনা করতে শরীরের মধ্যকার পাঁচটি ভূতকেই কাজে লাগাতে হয়। এই চোদ্দো মিলিয়ে দেহতেই পালিত হয় ভূত চতুর্দশী। অশুভ কর্ম করলে ওখানেই জ্বলবে নরক চতুর্দশীর প্রদীপ আর শুভ কর্মের মধ্যে থাকলে ওখানেই প্রজ্জ্বলিত হবে স্বর্গের বাতি।’
মরমিয়ারা বলেন, ‘মানুষের দেহের দক্ষিণ দিকে হয় কামনার বিস্তার। ওকে দমন করাটাই সাধনা। নরকের দরজাটা ওইজন্যই তো ওদিকে।’ মহাভারতের আদি পর্বে মহামতি ব্যাস বললেন, ‘মানুষের ভালো ও মন্দ সমস্ত কর্মের সাক্ষী থাকে চোদ্দোজন। সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, পৃথিবী, জল, দিবা, নিশা, ঊষা, সন্ধ্যা, ধর্ম, কাল ও পরমাত্মা।’ বৈদিক ঋষিরা এঁদেরকেই কিন্তু দেবতা মেনেছেন।
ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘তিন ধরনের পাপ সমস্ত মানুষই তো করে থাকে। হিংসা, চুরি, খুন, রাহাজানি এগুলো শারীরিক পাপ। অসৎ প্রলাপ, নিষ্ঠুর বাক্য প্রয়োগ, পরদোষ কীর্তন, মিথ্যা ভাষণ এগুলো সব বাচিক পাপ আর অন্যের জিনিসে লোভ, কারও অনিষ্ট চিন্তা, বেদবাক্যে অশ্রদ্ধা এগুলো হল মানসিক পাপ। এই ত্রিবিধ পাপ মানুষ যদি সযত্নে এড়িয়ে চলে তবে সে ইহলোক ও পরলোকে সুখী হতে পারবে।’
পৌরাণিক ঋষিরা বললেন, ‘যাঁরা দেবতা ও পূর্বপুরুষদের অপমান করে তাঁরাই নরকে যায়।’ গরুড়পুরাণে প্রতিহিংসামূলক খাবারদাবার খাওয়া, অসহায়কে কষ্ট দেওয়া, রেগে যাওয়া, প্রবল অহংকারী— এগুলোকে খারাপ কর্ম বলে অভিহিত করে এর ফলাফল নরকে গমন, নরক যন্ত্রণা ভোগের বর্ণনা করা রয়েছে।
পরীক্ষিৎ রাজা মহাত্মা শুকদেবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মহর্ষি, মানুষের ভিন্ন ভিন্ন গতি হওয়ার কারণ কী?’ শুকদেব বললেন, ‘মানুষ মূলত তিন ধরনের কর্ম করে। সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। এই সব অনুষ্ঠিত কাজের কারণেই আসে সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ। অকর্ম, কু-কামনার গতি হল নরক। নাম, রূপ আর লক্ষণ অনুসারে একুশটি নরক আছে। যারা চুরি করে সম্পত্তি বাড়ায়, তাদের গতি হয় তামিস্র নরকে। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, প্রহারে, পীড়নে এদের কাল কাটে। কাউকে বঞ্চনার ফলাফল অন্ধতামিস্র নরক গমন। নিজের আত্মীয়স্বজনদের প্রতি প্রতিহংসার গতি রৌরব নরক। প্রাণহিংসার ফল মহারৌরবে গমন। দেহপুষ্টির জন্য প্রাণহত্যার ফলাফল কুম্ভীপাক নরক। অপরের অনিষ্টকারীদের গতি কালসূত্র নরক। বেদাচারী যারা নয়, অনাচারী আর অবিচারী তাদের জায়গা অসিপত্রবন নরকে। নিরপরাধ মানুষকে দুর্বিপাকে ফেলার শাস্তি শূকরমুখ নরক। কীটপতঙ্গদের নির্বিচারে হত্যার ফলাফল অন্ধকূপ নরক। অতিথিদের অবমাননা, অসম্মানের ফল কৃমিভোজ নরক। অন্যের জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার শাস্তি সংদংশ নরক। নারীর প্রতি অসম্মান তপ্তশূর্মি নরকে স্থান। পশুদের প্রতি ক্রূর মনোভাবের জায়গা বজ্রকণ্টকশাল্মলী নরক। ধর্মনীতি, সমাজনীতি অবহেলার শাস্তি বৈতরণী নরক। ছোটজাতিকে অসম্মানের ফলাফল পুয়োদ নরক। উচ্চবর্ণের প্রতি বিরাগের জায়গা—প্রাণরোধ নরক। ধনসম্পত্তির কারণে অহং, অন্যকে মানুষ জ্ঞান না করার কার্যকারিতা বিশসন নরক। স্ত্রীর প্রতি কর্তৃত্বের ফলাফল লালাভক্ষ নরক। দস্যুবৃত্তির নিরসন সারমেয়াসন নরক। মিথ্যাবাদীর শাসন অবীচি নরকে। অতিরিক্ত সুরাপান, বেলেল্লাপনার জায়গা অয়ঃপান নরক। রাজা, এই বাইরে ক্ষারকর্দম, রক্ষোগণভোজন, শূলপ্রোত, দদ্দশূক, অবটনিয়োধন, পর্যাবর্তন এবং সূচীমুখ নামে আরও সাতটি নরক আছে। এই আটাশটি নরক অশেষ যন্ত্রণার স্থান’।
পৌরাণিক ঋষিরা মৃত্যুর দেবতা যম, যমদূত নিয়োগ, বিচারের জন্য যমের কাছে জীবাত্মার আসা, যমালয়, যম কর্তৃক পুণ্যবাণদের স্বর্গে যাওয়া আর বাদবাকিদের দুর্দশার মূল্যায়নকরণ এবং রায় প্রদানের আইন আদালত বসিয়ে মানুষকে জীবিত অবস্থাতেই আসলে সচেতন করতে চেয়েছেন সদর্থক ভাবনার জীবনব্রত পালন করবার উদ্দেশে। এই জগতে যা কিছু, সব প্রাণ হতে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসছে— ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরকের চাবিকাঠি রয়েছে প্রাণের হাতেই। দেহের দাবি, প্রাণের আকুতি, মনের কল্পনা ছাড়িয়েও আরেকটা কিছু আছে, যা না পেলে মানুষের জীবনটা ভরতে চায় না। অতৃপ্তির বেদনাটাই মানুষের মনকে লোকোত্তরের অভিযাত্রী করে তোলে। মানুষ তাই মৃত্যুহীন প্রাণের উল্লাসে মাততে ভালোবাসে। প্রকৃতির চক্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় যে আমাদের নেই। দু’একজন তার আবর্ত থেকে বাইরে ছিটকে পড়ে মাত্র। এঁরা মহাত্মা, মহাপুরুষ— আমাদের উত্তরণের পথ দেখান। সচেতন করে তোলেন।
স্বর্গের সুধা
নিজের হৃদয়ের অন্তরাকাশে আত্ম সাক্ষাৎকার করাটাই বৈদিক সাধনার প্রণালী। সাধকেরা চেতনার ভূমিগুলোকেই লোক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কর্মার্জিতলোকে আমরা সবাই বাস করি। পুণ্যকর্ম, পাপকাজ সমস্তটাই এখানকার ব্যাপার। এখানকার চাওয়া পাওয়াগুলোই তো আমাদের পুরণ হয় না। কিছুটা ক্ষয় হয় খালি।
ঋষিরা বললেন, ‘মানুষের দেহটাই ব্রহ্মপুর। ওর মধ্যে একটা ডহর আছে।’ ডহর হল কমলের ঘর। তান্ত্রিকেরা বলেন, ‘মানুষের দেহের মধ্যে রয়েছে চক্রপদ্ম।’ বৈদিক ঋষিরা বললেন, ‘মানুষের হৃদয়ের মাঝে সবকিছু সমাহিত হয়ে রয়েছে। শূন্যতা ও পূর্ণতার বোধগুলো সমস্ত আসছে ওই হৃদয় থেকে। ওটাও যে একটা আকাশ। ওই আকাশেই মানুষের প্রকৃত চেতনা লুকিয়ে রয়েছে।’
ঋগ্বেদের ঋষিরা বললেন, ‘মানুষের হৃদয়টা সমুদ্র। তার ওপর আলো এসে পড়েছে। তার মধ্যে একটি পদ্ম ফুটে উঠল। সূর্যের দিকে মুখ করা পদ্ম।’ হৃদয়-কমলকে যাঁরা উপলব্ধি করতে পারেন তাঁরাই অন্তরাকাশ স্বরূপ ব্রহ্মশক্তির হদিশ লাভ করেন। সমস্ত কামনা যা কিছু আমরা বহির্জগতে পেতে চাইছি, সবই ওখানে ফুটে আছে। কর্মের দ্বারা আমাদের যে প্রাপ্তলোক সেখানকার অর্জিত উপভোগ ক্ষয় হয়ে আসবেই। হৃদয়পদ্মদলের হদিশ না পেয়ে যাঁরা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তাঁদের বিভিন্ন লোকে যথেচ্ছ গতি হয় না। সাধকেরা নিজের হৃদয়ের অন্তরাকাশে আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করে স্থির সত্য কাম্যবস্তু পেয়ে যান বলেই মৃত্যুর পর তাঁদের সমস্ত লোকে যথেচ্ছগতি হয়।
ছান্দগ্যের ঋষিরা বললেন, ‘তিনি যদি পিতৃলোক কামনা করেন, তখন তাঁর সঙ্কল্পমাত্রই পিতৃগণ তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। মাতৃলোক কামনা করলে মাতৃগণও তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে পারেন। ভ্রাতা, ভগিনী, বন্ধু-স্বজনদের এখানে এভাবেই লাভ করা যায়। আত্মবিজ্ঞান হয়েছে যাঁর, তাঁর সমস্ত কামনা পূরণ হয়, তিনি সব লোক লাভ করেন।’
সাধকেরা আত্মবিজ্ঞান লাভের জন্যই তৎপর। কী আদিকালে কী আজকের সময়ে। তাই তাঁরা বলেন, ‘তোমার বাক্য, ভাষা, শব্দ ও চিন্তা তোমার কাছেই ফিরে ফিরে চলে আসবে। সুফল বা কুফল দুই রূপেই এরা আসতেই থাকবে। এর কোনও প্রতিকার নেই। স্বর্গ-নরক তোমার হাতে এভাবেই প্রতিষ্ঠিত। নিয়তির চক্রব্যূহতে তোমার মৃত্যু যদি নিশ্চিত করতে না চাও —কথা বলা, শব্দ প্রয়োগ ও ভাবনা চিন্তায় ধ্যান দাও। এগুলোর উৎকর্ষতা নিয়ে তৎপর হও, লেগে থাক, তাহলেই স্বর্গের সুধা পান করতে থাকবে। নচেৎ অকথা-কুকথায় মন বিষিয়ে শেষে নরকেই নিমজ্জিত হয়ে পড়বে।’
সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা স্থূল শরীরকে পাত্তাই দিতেন না। তাঁরা বলতেন, ‘পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার পর মানুষের শরীরটা সেখানকার স্থূলপদার্থ দিয়েই যে গড়া থাকবে, এটা সকলে ধরতে পারে না। তারপর একটা সময় আসবে যখন সেই স্থূলশরীরটা নষ্ট হয়ে যাবে, তখনই তার বেঁচে থাকার একটা স্তর থেকে যাবে সূক্ষ্মার্থে। সূক্ষ্মচেতনা নিয়ে এ সময় কিছু মানুষ আত্মিকলোকে চলে আসেন।’ এরকম নানান ঊর্ধ্বতন লোকের কথা উপনিষদের ঋষিরা আমাদেরকে জানিয়ে গিয়েছেন। দেববিবর্তনের জীবের কথাটি তাঁরা আমাদের জানাচ্ছেন। মানুষের সর্বপ্রকার ধারণার অতীত সেখানকার ক্রিয়াকলাপ। পৃথিবীর ঊর্ধ্বে বহু স্তর বিদ্যমান। বহু লোক, বহু স্তর, মৃত্যুর পর সেখানে জীবের গতি। এই সব super munde worlds-এর অস্তিত্ব নিয়ে সরব হয়েছিলেন বৃহদারণ্যক ও ঈশোপনিষদের ঋষিরা। ধ্যানযোগে এখানকার অস্তিত্বের কথা ঋষিরা জেনেছিলেন। তাঁরা বললেন, ‘পৃথিবীতে জীবন কাটানোর পরে যখন আত্মার স্তর অনুযায়ী এইসব লোকে মানুষের গতি হয়, পৃথিবীর আনন্দ তখন তুচ্ছ বলে মনে হয়, কিন্তু এদের মধ্যে সিংহভাগ মানুষেরই থাকে পূর্ববর্তী জীবনটার প্রতিই প্রবল আসক্তি। তার ফলস্বরূপ এরা সব পুনর্জন্মের বীজ বপনের জন্য লোকগুলোতে ঘোরাফেরা করে।
প্রশ্নোপনিষদের ঋষি বললেন, ‘মানুষের মন যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখনও তার মধ্যে জেগে থাকে প্রাণের আগুন। মনটা নেই, কিন্তু শরীরের ক্রিয়া সুষম ছন্দে হয়েই চলেছে, আর চেতনা প্রকাশ পাচ্ছে।’ মানুষকে এই রকম আকাশবৎ চেতনার অনুশীলন করতে উপদেশ দিয়েছেন আচার্য-ঋষিরা। আকাশবৎ চেতনা এলে জীবনটা যে হাজার দুঃখ-কষ্টের ভেতরও নিরবচ্ছিন্ন আলোর পথ, এটা বোঝা যাবে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে উপদেশ করে গেছেন, ‘হাজারও ব্যর্থতাতেও ভেঙে পোড় না একদম। নিজেকে কখনও অবসাদগ্রস্ত হতে দেবে না। তুমি যা ভাববে, তাই হবে। নিজেকে যদি মহীয়সী ভাব, তোমার মাঝে যে মহীয়সী সুপ্ত হয়ে আছেন, তোমার ভাবনাতে তিনি সাড়া দিয়ে জেগে উঠবেন। তখনই আসলে তুমি যে কে সেটা ধরা পড়বে।’
কিশোর নচিকেতা যমের মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে বল, মানুষ এখান থেকে ওপারে গেলে, থাকে নাকি ফুরিয়ে যায়।’ যম মৃত্যুর পর মানুষের চার ধরনের গতির কথাই তখন নচিকেতাকে জানিয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘শোন বালক, মাটির মানুষ মাটিতেই মিশে যেতে পারে, বাসনার টানে বারবার পৃথিবীতে যাওয়া-আসা করতে পারে, মহর্লোকে উত্তীর্ণ হয়ে নিজের আত্মার মহিমাকে অনুভব করতে উজিয়ে যেতে পারে আর ব্রহ্মে সমাপন্ন হতে পারে। মৃত্যুর ঠিক আগে যে মানুষের মন সংসারের মায়িক বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলে, সেই মানুষই ওপারের আলোর সন্ধান পান, তাঁরা আর সংসারে ফেরেন না, নিত্য জ্যোতিতে মিশে থাকেন।’
স্বর্গকে পিতৃলোক হিসেবে সম্বোধন করেছেন অথর্ববেদের ঋষিরা। বলেছেন, ‘এখানে এলে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে দেখা হওয়াটা সম্ভব। তবে স্থূল বাসনা না গেলে এখানে আসাটা সম্ভবপর নয়।’ ভাগবতে আছে, যে ব্যক্তি সঠিক এবং ভুল কাজের মধ্যে বৈষম্য করতে সক্ষম একমাত্র তিনিই স্বর্গলোক সম্পর্কে অবগত।
সাধুসন্তেরা কামনালোকের মতোই স্বর্গের কতগুলো বিভাগের কথা বলেন। মানবশরীর পেয়ে জীব সেখানেও বাস করে। স্বর্গের নীচের চারটি স্তরকে আচার্যেরা বললেন, ‘রূপভূমি’। এখানে মানুষের অবয়ব আছে, স্ত্রী-পুরুষ ভেদজ্ঞান আছে। পৃথিবীর আত্মীয়স্বজনদের এখানে এসে চেনাও যায়। সাধারণ স্তরের আত্মারা রূপলোকে ঘোরাফেরা করে। পঞ্চমস্তর থেকে ‘অরূপলোক’ শুরু। এখানে জীবের কোনও স্থূলশরীর থাকে না। কারণশরীর অবলম্বন করে জীব এখানে অল্প সময়ের জন্য বাস করে। পরমাত্মার জ্যোতি জীবের মধ্যে এই স্তরগুলোতে এলে প্রবেশ করতে পারবে। ইহজীবনে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা না থাকলে অরূপলোক আসা সম্ভব নয়। চৈতন্য থাকে অরূপলোকে। ধ্যানের ভেতর এই লোক সম্পর্কে কিছুটা অবগত হওয়া যায়। মানুষ যেখানেই থাক না কেন আত্মজ্যোতি তার সঙ্গে থাকে। পরম আত্মা কোথাও তো যান না। জ্যোতি সর্বত্র— ‘যথা জীব তথা জ্যোতিঃ’।
শরীরবোধকে অত্যন্ত স্বচ্ছ করে তুলতে না পারলে জ্যোতির ব্যাপারগুলো বোঝা যাবে না। ধ্যান হল ঊর্ধ্বায়নের ক্রিয়া। ধ্যান গুরুর কাছে শিখে অভ্যাস করলে শরীরের প্রতিটি নাড়িকোষে রসের অনুভূতি সঞ্চারিত হয়। তখন যা কিছু অনুভব করা যায়, তা বিশেষ কোনও ইন্দ্রিয়ে নয়, সমস্ত নাড়িজাল দিয়ে ধরা যায়। ধ্যানের অনুভূতি অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। বিশেষ কার্যকর। ধ্যানেই একমাত্র ধরা পড়ে অতীব সূক্ষ্মস্তরের অস্তিত্ব। ধ্যানের রকমফের আছে। এগুলো শিখতে হলে উচ্চ আধ্যাত্মিক সম্পন্ন আচার্য দরকার। আমাকে রাজরাপ্পার উচ্চকোটির যোগিনী মাঈজি বলেছিলেন একবার, ‘একটা গাছ নিষ্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে যেমন আলো বাতাসকে শুষে নিতে পারে তেমনই তোমার অন্তরের প্রাণকে আহার দেওয়ার প্রক্রিয়াগুলো তুমি যদি জেনে যাও, চর্চা করতে থাক তাহলে তোমার মধ্যে ঊর্ধ্বায়নের ক্রিয়া কার্যকর হবে। এটা হলেই তুমি ব্যাপ্তির নানান সূক্ষ্মলোকে চলে যেতে পারবে।’
কীভাবে ঊর্ধ্বলোকে পৌঁছতে হবে তার অনেক গুহ্য প্রক্রিয়াদি থাকলেও এর প্রাথমিক ক্রিয়াটা কিন্তু গীতাতেই বলা হয়েছে। খুব কঠিন কিছু না, অল্প অভ্যাসেই এটা সিদ্ধ হতে পারে। দুই ভ্রুর মাঝখানে শরীরের যাবতীয় প্রাণস্রোতকে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই উজানে ঊর্ধ্বলোকে যাওয়া যাবে।
যোগীরা বলেন, ‘তোমার শরীরটা বলিষ্ঠ হওয়া চাই, স্নায়ুমণ্ডলীও হওয়া চাই সুদৃঢ়। বলিষ্ঠ মানে কিন্তু ব্যায়ামবীরের চেহারাটা নয়, বাহ্য সত্তায় থাকা চাই শান্ত সমতার দৃঢ় ভিত্তি। তবেই শরীরের মধ্যকার স্নায়ুগুলো সজাগ হবে। মনকে ছাড়িয়ে আরও ঊর্ধ্বে সচেতন অস্তিত্বের নানা স্তর আছে। ওখানেই আত্মস্থ হওয়ার আরও সব কেন্দ্র আছে। যেমন, একটি কেন্দ্র হল, মাথার উপরে ঠিক শীর্ষ স্থানে, আর একটি ভ্রুযুগলের মধ্যিখানে। প্রত্যেকের নিজস্ব উপযোগিতা আছে। এই কেন্দ্রগুলোতে ধ্যান করতে শিখলে বিশেষ বিশেষ ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু মানুষের যেটি মূল কেন্দ্র— সত্তা, তার অধিষ্ঠান হৃদয়ে। এখানে ধ্যান করতে শিখলে শরীরের সকল রূপান্তরের প্রেরণাগুলো নামতে থাকে। সেখানেই সূক্ষ্মচৈতন্যের বিকাশ ঘটে। পৃথিবীর ওপরকার নানান জগৎ খুলে যায়। ফুটে ওঠে নানা লোকের দৃশ্য।’
পৌরাণিক ঋষিরা বলেছেন যে মেরুপর্বতের উপর স্বর্গের স্থান। যোগীরা বলেন, ‘মেরুপর্বত হল ঊর্ধ্বায়ন প্রক্রিয়ার ফলাফল। মাথার ওপর অস্তিত্বহীন ধ্যানাঞ্চল— সহস্রার চক্র রয়েছে। ওটাই স্বর্গলোক। ইন্দ্র স্বর্গলোককে শাসন করছেন। মানুষের গোটা শরীরটাতেই আদতে রয়েছে ইন্দ্ররূপী ইন্দ্রিয় দেবতালদি শাসন। যতই ঊর্ধ্বগতি হয় মানুষের, ততই চেতনার প্রসার ঘটে।’
ঋষিরা বারে বারে বলছেন, সব দিক থেকে নিজেকে গুটিয়ে এনে নিজের ধারাটিকে ঊর্ধ্বমুখী করতে হবে। এই অনুশীলন করতে বসলে বাধা আসবে কিন্তু সে বাধা ঠেলে ওপরে উঠতে হবে। যে পর্যন্ত চৈতন্যের একটা ব্যাপ্তিকে বুঝতে পারছি না সে পর্যন্ত অনুশীলন। করতে করতেই দীর্ঘদিন পর এই প্রক্রিয়াতে শেষে শরীরে আমি যে আর নেই, এটা বোঝা যাবে। আকাশের মতন একটা মুক্তাঞ্চল সেখানে। সেইখান থেকে সেই ধারা আবার ছড়িয়ে পড়বে নীচের দিকে, সূর্যের রশ্মি ছড়িয়ে পড়ার মতো। যোগীরা দুটি গতি সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন করেছেন। ঊর্ধ্বগতি আর তির্যক গতি। দু’ভাবে মানুষজন ছড়িয়ে পড়ে। একটা অবিদ্যায়, অজ্ঞানে, জাগতিক বাসনায় ছড়িয়ে যাওয়া। আরেকটা আলোয় ছড়ানো, আত্মবিকিরণ। আত্মবিকিরণ না হলে সঠিক ঊর্ধ্বগতির প্রকাশ কখনও আসবে না। ঊর্ধ্বগতি মানে ধন-সম্পত্তি বেড়ে ধনী হয়ে যাওয়া নয়। ঊর্ধ্বগতি হলেই সূক্ষ্মলোকগুলো মানসচক্ষে ফুটে উঠবে।
যোগীদের কথা অনুযায়ী, ‘প্রেতলোক, স্বর্গলোক, নরক এগুলোর অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করবার কিছু নেই। যদি এ সমস্ত সম্পর্কে অবগত হতে চাও, কাছে নিবিড় হয়ে বস তোমরা। নিজের মধ্যে নিজের পূর্ণ সংযোগের নাম উপনিষদ। তুমি বসো, দেবতা এসে তোমার হৃদয়ে অবশ্যই বসবেন। এখানে বসলেই দেবাদিষ্ট সেই গহন গোপন রহস্যগুলো ধরা পড়বে। এখানেই দীপ্তি, দ্যুতি। দেব কথার মানে এটাই। আলো, জ্যোতি যখন এসে আচ্ছন্ন করবে তোমার অতলস্পর্শী হৃদয়ে তখনই সেখানে দেবলোক, স্বর্গলোকের স্ফুরণ হবে আর সীমাবদ্ধ সাংসারিক চেতনা নিয়ে জীবরূপে যতদিন তুমি সংসারে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছ, কী করবে আর কী করবে না— এই নিয়ে বিভ্রান্ত ও মোহিত হয়ে রয়েছ, জেনো নরকের মধ্যে ততদিন তুমি বসে আছ।’
শেষের কথা
তাহলে আমরা সংসারবদ্ধ জীব আমরা তো সংসারণ্যে বসে, নানা কামনা বাসনায় জড়িয়ে, অহংকারে মত্ত হয়ে জীবনকে লক্ষ্যহীন করে তুলেছি। তবে আমাদের গন্তব্য তো স্বর্গ নয়, নরক!
এই হল আত্মজিজ্ঞাসা। যখন দুঃখ পেয়ে অস্থির হয়ে উঠি জীবনের হিসেব নিকেশে দেখি কাজের কাজ তো কিছুই করিনি, এতদিন ‘আমার আমার’ করে দিনরাত এক করে ফেলেছি। এতদিন যা সব অর্জন করেছি নিজের কাছেই মূল্যহীন মনে হচ্ছে। তাহলে কী উদ্দেশ্য নিয়ে জীবনধারণ করলাম?
শঙ্করাচার্য একটি অদ্ভুত কথা শুনিয়েছেন, ভয়ানক নরক কী! উত্তর দিচ্ছেন, নিজের দেহ। স্বর্গ কী? বলছেন, বাসনাক্ষয়! কীসে স্বর্গলাভ হয়? ‘কা স্বর্গদা প্রাণভৃতামহিংসা’— জীবের প্রতি অহিংসায়!
বস্তুবাদীদের বিশ্বাসে স্বর্গ নরক হল এক প্রকারের অনুশাসন, যা মানুষকে সুষ্ঠভাবে জীবনধারণে জন্য বিভিন্ন পুরাণ বা শাস্ত্রের কিছু নির্দেশিকা দিয়ে গেছেন প্রাচীনকালের মানুষজন।
মানুষ, তুমি কেমন হবে?
মানুষ হবে একটি ভেজালহীন স্বচ্ছ জীবনের মালিক। সে যেমন নিজের ভালোমন্দ দেখবে, তেমনই অন্যের ভালোটাই দেখবে। কখনওই মনুষত্ব হারাবে না। সেটাই তো তার পরিচয়। সত্যেই তার অধিষ্ঠান। তখন আর পথভ্রষ্ট হওয়ার কোনও সুযোগই আর থাকবে না। সততার পুরস্কার মানুষ তখন নিজেকেই নিজে দেবে, স্বর্গ নরক পেছনে পড়ে থাকবে। তার থেকেও উচ্চলোক হাতছানি দেবে। ভাষাহীন জগতের জীবন্ত অনুভূতি— ‘ওই দেখা যায় আনন্দধাম!’
আহা, সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম!