লিখতে বসে ভাবছিলাম, এখন ২০২৫ সালের মার্চ মাস। আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে ঘোষিত হয়েছিল ভারতজুড়ে লকডাউন, এখনও যা এক বিভীষিকাময় স্মৃতি। কোভিড ১৯ রোগটি আমাদের অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল। শিখিয়েছিল, বিশ্বভরা প্রাণীজগৎ এবং পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। পশুপাখি এবং পরিবেশ যদি সুস্থ না থাকে, তবে মানুষও সুস্থ থাকবে না।
চারপাশে নানা নতুন অসুখের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে, যা মূলত পশু, পাখি, পরিবেশের থেকে মনুষ্যদেহে প্রবেশ করছে। শুধু কোভিড ১৯-ই নয়, বার্ড ফ্লু, ইবোলা, মাঙ্কি পক্স ইত্যাদি রোগের কথাও শুনছি। জানছি, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে রোগের বাহকরা— যেমন মশারা তাদের থাকা, খাওয়া, বংশবৃদ্ধির চেনা ছকগুলো পাল্টে ফেলছে। দেখছি, পরিবেশ দূষণজনিত রোগের বাড়বৃদ্ধি। পরোক্ষভাবে পরিবেশে পানযোগ্য জল কমে যাচ্ছে। এও নানা রোগবৃদ্ধির কারণ।
ঘটনার মূলে অবশ্যই মানবজাতির অবিমৃশ্যকারী আচরণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের আগ্রাসী মনোভাবের ফলে আজ জল-জঙ্গল বিপন্ন— বন্য পশুপাখিরা তাদের নিরাপদ বাসস্থান হারিয়ে মানুষের কাছাকাছি চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের থেকেও নতুন রোগ ছড়াচ্ছে। এছাড়াও পশুপাখির সংস্রবে আমরা নানাভাবে আসি— কেউ তাদের পোষেন, কেউ পালন করে ব্যবসা করেন, কেউ আবার পেশাগতভাবে হাঁস, মুরগি, ছাগল সহ নানা প্রাণীর মাংস কেটে বিক্রি করেন। যখন এই নিবিড় সংস্রবে থাকা মানুষরা অস্বাস্থ্যকরভাবে পশুপাখির রক্ত, মল, মূত্র ঘাঁটেন, তখন তাঁদের পশু-পাখি থেকে আসা জুনেটিক ডিজিজের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সুতরাং আমাদের চারপাশে এখন নতুন বিপদ— মানুষ ও অন্য প্রাণীদের মধ্যে নতুন নতুন সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব। যার প্রতিকারে ব্যবহৃত হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। এই ব্যবহার কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে হচ্ছে না— কী মানুষে, কী পশুতে, কী কৃষিতে! যথার্থ প্রয়োজনে, যথাযোগ্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানীর পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত হারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারই কাম্য— প্রয়োজনের বেশিও নয়, কমও নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার না হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ভয়াবহ কালো মেঘের পূর্বাভাস দেখা দিচ্ছে।
এমনিতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের জোগান বাড়াতে হচ্ছে। ফলে কৃষক, মৎস্যচাষী, হাঁস-মুরগি ও পশুপালনকারীরা নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন। এগুলোও সরাসরি খাবারের মাধ্যমে আমাদের পেটে যাচ্ছে এবং এতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জীবাণু (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জার্ম) থাকলে সেগুলোও আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। সামনে এখন ঘোর বিপদ। এএমআর বা (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স) মহামারীর আকারে আত্মপ্রকাশ করবে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বের সব প্রাণী ও তাদের পরিবেশের স্বাস্থ্য আসলে একই সূত্রে গাঁথা। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ সুস্থ থাকতে পারবে না। তাই কৃষিবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও পশুচিকিৎসকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একত্রে সকলের সুস্থতা বজায় রাখতে হবে— এটিই ‘এক স্বাস্থ্য’ বা ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’। এর কোনও বিকল্প নেই।