স্বাস্থ্যবিমা মারফত চিকিৎসা পরিষেবা নাগরিকের অধিকার। এমন বিমা পলিসি দুরকম হতে পারে। নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে প্রিমিয়াম গুনে তা কিনতে পারেন অথবা নাগরিকের হয়ে সরকার তার তহবিল থেকেও এর ব্যবস্থা করে দিতে পারে। দুটি ক্ষেত্রেই প্রাপ্য প্রিমিয়াম আগাম আদায় করে নেয় সংশ্লিষ্ট বিমা সংস্থা। তাই চুক্তিমতো উপযুক্ত পরিষেবা প্রদান করাই বিমা সংস্থার দায়িত্ব। ব্যক্তিগত বিমা এবং সরকারি বিমা—দুটির কোনও ক্ষেত্রেই পরিষেবায় তফাত হওয়ার কারণ নেই। স্বভাবতই নাগরিকের অধিকারে কোনও হেরফের হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিহোমে চিকিৎসা করাতে গিয়ে দুই ক্ষেত্রে দুরকম অভ্যর্থনা অভিজ্ঞতা মিলছে। এই অবাঞ্ছিত নজির ভূরি ভূরি। সম্পন্ন এবং গরিব নির্বিশেষে সরকারি হাসপাতালে প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। এর বাইরে, কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমেও বহু রোগীকে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বাংলায় গরিব, এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেরও অত্যন্ত দামি বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা গ্রহণের সামর্থ্য নেই। তাই নবছর আগে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তাদের জন্য একটি স্বাস্থ্যবিমা চালু করেছে। ‘স্বাস্থ্যসাথী’ নামের এই বিমা মারফত একটি পরিবার পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ‘ক্যাশলেস’ পরিষেবা পেতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমগুলিও এই পরিষেবা দিতে বাধ্য।
কিন্তু স্বাস্থ্যসাথী কার্ড হাতে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বহু মানুষকে বিমুখই হতে হয়। কোনও কোনও সংস্থা আবার চিকিৎসা পরিষেবা দিতে রাজি হয়েও কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করে। যেমন চিকিৎসা বিলের পুরোটা ক্যাশলেস হবে না, একটা পার্ট পেমেন্ট ক্যাশে বা নগদে করতে হবে। বলা বাহুল্য, স্বাস্থ্যসাথী কার্ডকে প্রথম দিকে ‘এলিট’ বেসরকারি সংস্থাগুলি পাত্তাই দিত না। বস্তুত এই কার্ডধারী নাগরিকরা চিকিৎসা নিতে গিয়ে উপহাসের পাত্রও হতেন। মুখ্যমন্ত্রী তাতে রুষ্ট হতেই বেসরকারি সংস্থাগুলিকে একটা নিয়মে বাঁধার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তারপর বেশিরভাগ সংস্থা নড়েচড়ে বসে বলে দাবি স্বাস্থ্যদপ্তরের। কিন্তু ফের কিছু অনিয়ম শুরু হয়েছে। সেসব গোচরে এসেছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর। এই ব্যাপারে এক অনুষ্ঠানে তাঁর কড়া প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে, ‘এমনও অভিযোগ পেয়েছি, হার্টের চিকিৎসা করাতে গেলে বারাসতের একটা প্রাইভেট হাসপাতাল বলেছে, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থেকে ২ লক্ষ টাকা ক্যাশলেস হবে, বাকি টাকা দিতে হবে ক্যাশে!’ মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘এ আবার কী? ৫ লক্ষ টাকার কার্ড। কেন ২ লক্ষ দেবে? ওর কাছে ক্যাশ না থাকলে কোথা থেকে দেবে? জীবন দিয়ে দেবে নাকি? আমরা চিকিৎসার জন্য ইনশিয়োরেন্সের টাকা দিচ্ছি। রোগী ফেরাবে কেন? ওরা তো কোনও দয়া করছে না।’
আসল জায়গাটাই ধরেছেন জননেত্রী। বিমা মানে ফেলো কড়ি (প্রিমিয়াম দাও) মাখো তেল (পরিষেবা নাও)। অর্থাৎ বিমা সংস্থা সরকারের কাছ থেকে অ্যাডভান্স প্রিমিয়াম আদায় করেছে, অতএব তারা পরিষেবা দেবে। নাগরিকের হয়ে রাজকোষ থেকেই ওই প্রিমিয়াম মেটানো হয়েছে। ‘বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমগুলি স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের রোগী ফেরালে তাদের লাইসেন্স রাখার কোনও অধিকার নেই।’—মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবনে এক অনুষ্ঠানে রাজ্যের প্রাইভেট হাসপাতাল-নার্সিংহোমগুলির একাংশকে এই ভাষাতেই তুলোধোনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্যভবন থেকে ১১০টি ‘ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল’ বা মোবাইল মেডিকেল ইউনিটের উদ্বোধন করেন মমতা। এই কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য পরিবহণ শাখা। আরও একশোটি এমন যান শীঘ্রই চালু হবে। তারপর আরও একশো। ওই মহতী অনুষ্ঠানে মমতার আরও বক্তব্য, ‘সব নার্সিংহোম-প্রাইভেট হাসপাতাল খারাপ, বলছি না। আজও অনেকে সেবা দেয়। রাজ্যের স্বাস্থ্য কমিশন হস্তক্ষেপ করার পর অভিযোগ অবশ্য কমেছে। কিন্তু এটাও সত্যি, অনেকে রোগী ফেরাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচিবকে বলেছি অভিযোগ পেলেই, শো-কজ করুন। এসব বরদাস্ত করব না।’ স্বাস্থ্যভবন সূত্রের খবর, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ইশ্যুতে একের পর এক প্রাইভেট হাসপাতালকে শো-কজের পালা চলছে। এই নজরদারি এবং সময়োচিত পদক্ষেপ যেন অব্যাহত থাকে। তবেই সাধারণ মানুষের বঞ্চনা দূর হবে। স্বাস্থ্য যে দয়ার দান নয়, নাগরিকের ন্যায্য অধিকার, প্রতিষ্ঠিত হবে এই সত্যটিও।