পরামর্শে এনআরএস হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান ডাঃ তুফানকান্তি দোলাই।
পরামর্শে এনআরএস হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান ডাঃ তুফানকান্তি দোলাই।
ষাট বছরের বেশি বয়সি পুরুষের (aged people) প্রতি ডেসিলিটার রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা হওয়া দরকার ১৪ থেকে ১৭ গ্রাম।
মহিলাদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা হওয়া দরকার ১২ থেকে ১৫ গ্রাম। পুরুষের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ১৪-এর কম হলে ও মহিলার ক্ষেত্রে ১২-এর কম হলে তখন তা অ্যানিমিয়া (anemia) ধরতে হবে।
অ্যানিমিয়ার উপসর্গ
* মাথা ঘোরার লক্ষণ থাকে • রোগী অত্যন্ত ক্লান্ত ও দুর্বল বোধ করেন • রোগীর ত্বকের রং ফ্যাকাসে হয়ে যায় • কিছু কিছু বয়স্কের ক্ষেত্রে পতনজনিত দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এমন সমস্যা হলে অবশ্যই সতর্ক হন।
বয়সকালে অ্যানিমিয়া হওয়ার কারণ—
দুর্বল দাঁত
বয়সের সঙ্গে অনেকেরই দাঁতের ক্ষয় হয়, দাঁত পড়েও যায়। খাবার ভালো করে চিবিয়ে খাবার খাওয়া হয় না। বয়স্করা এড়িয়ে চলেন শক্ত খাবার খাওয়া। শরীরে প্রয়োজনমাফিক পুষ্টি উপাদান ও ক্যালোরি প্রবেশ করে না। ফলে অপুষ্টির কারণেও দেখা দিতে পারে রক্তাল্পতা।
আয়রনের ঘাটতি
আয়রনযুক্ত খাদ্য খেতেই হবে। না হলে আয়রনের ঘাটতি জনিত অ্যানিমিয়া হওয়ার আশঙ্কা এড়ানো যাবে না।
খাদ্যাভ্যাস
কিছু বয়স্ক মানুষ মাছ-মাংস-ডিম খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। তাঁরা নিরামিষ খাদ্যের উপর ভরসা রাখেন বেশি। এই কারণে তাঁদের আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলিক অ্যাসিডের ঘাটতি দেখা দেয়। তার থেকে দেখা দেয় অ্যানিমিয়া।
রক্তপাত
পাইলস থাকলে ও সেই কারণে রক্তপাত হলেও অ্যানিমিয়া দেখা যেতে পারে। আবার কোলনে আলসার হলে সেখান থেকেও হতে পারে রক্তপাত। অন্যদিকে মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পরেও মেনস্ট্রুয়েশনের মতো রক্তপাত দেখা দিলে তাও চিন্তার বিষয়। এই সমস্ত বিষয়গুলির ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক হয়ে নিতে হবে ব্যবস্থা।
কিডনির সমস্যা
কিডনি থেকে এরিথ্রোপয়েটিন নামে বিশেষ হর্মোন বেরয় যা রক্তের কোষ তৈরিতে কাজে লাগে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে অনেক ব্যক্তির কিডনির সমস্যা দেখা দেয়। আবার কিছু লোক অনিয়ন্ত্রিত হাই ব্লাড প্রেশার, সুগারের সমস্যাতেও ভোগেন। এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও দ্রুত কিডনির সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সেখান থেকে এরিথ্রোপয়েটিনের উৎপাদনে বাধা তৈরি হয়। এই জটিলতা থেকেও দেখা দিতে পারে অ্যানমিয়া।
হর্মোনের সমস্যা
অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হওয়া অ্যান্ড্রোজেন হর্মোন রক্তের উৎপাদনে সাহায্য করে। এই হর্মোনের ঘাটতি দেখা দিলেও হতে পারে অ্যানিমিয়া।
প্রদাহ
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো ক্রনিক প্রদাহজনিত কোনও অসুখ থাকলে রোগীর বোন ম্যারো বা অস্থিমজ্জায় লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন বাধাপ্রাপ্ত হয়। রোগী ভুগতে পারেন রক্তাল্পতার সমস্যায়।
জটিল অসুখ
মায়েলোডিসপ্ল্যাস্টিক সিনড্রোম, মাল্টিপল মায়েলমার মতো ক্যান্সারও রক্তাল্পতার মতো জটিলতা ডেকে আনা।
টেস্ট
রোগ নির্ণয়ে কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা কমপ্লিট হিমোগ্রাম টেস্ট করানো প্রয়োজন। এছাড়া প্রয়োজন বুঝে চিকিৎসক রোগীকে লিভার ফাংশন টেস্ট করাতেও দিতে পারেন। দিতে পারেন ব্লাড ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করাতেও। আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলিক অ্যাসিডের অভাব আছে কি না জানতেও টেস্ট-এর প্রয়োজন হতে পারে।
এছাড়া প্রদাহজনিত সমস্যা থাকলে সি রিয়্যাকটিভ প্রোটিন, ইএসআর করতে দেওয়া হয়। কোনওভাবেই রক্তাল্পতার কারণ ধরা না পড়লে তখন বোন ম্যারো টেস্ট করাতে হতে পারে।
চিকিৎসা
* আয়রন ঘাটতি জনিত অ্যানিমিয়ায় আয়রন বেশি আছে এমন খাদ্য খেতে হবে। ডিম, মাংস, মেটে, পালং শাক, কচু শাক, ব্রকোলি, কলমি শাক, মটরশুঁটি, মসুর ডাল, কিডনি বিন, সয়াবিন, ছোলা, কুমড়োর বীজ, তিলের বীজ, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, খেজুর, গুড় খাওয়া যায়। দরকার পড়লে নিতে হবে আয়ররন ইঞ্জেকশন।
* ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতিজনিত কারণে সমস্যা হলে ভিটামিন বি১২ ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, এছাড়া দেওয়া হয় ফোলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট। তার সঙ্গে খেতে হয় ডাল, ও বিভিন্ন ধরনের শাকসব্জির মতো পুষ্টিকর খাদ্য।
* অ্যান্ড্রোজেন, এরিথ্রোপয়েটিন হর্মোনের ঘাটতিজনিত কারণে অ্যানিমিয়া হলে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে হর্মোন শরীরে প্রবেশের দরকার হতে পারে।
* পাইলস, আলসারের অসুখে মূল সমস্যার চিকিৎসাতেই জটিলতা সারে।
মনে রাখবেন—
বয়স্কদের অনেকেরই হার্টের সমস্যায় ভোগেন। তার সঙ্গে অ্যানিমিয়া থাকলে বিপদ। হিমোগ্লোবিন নয়ের নীচে নেমে গেলে হার্ট ফেলিওর হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক