নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিধানসভা ভোটের এক বছর আগে থেকেই কি ধর্মের ফর্মুলায় রাজনীতির ছক কাটতে শুরু করে দিল বিজেপি? কারণ, বামফ্রন্ট সরকারের একেবারে শেষলগ্নে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত ৩৩টি মুসলিম জাতিকে কেন্দ্রীয় সরকারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। এই মর্মে ইতিমধ্যেই সুপারিশ জমা করেছে জাতীয় ওবিসি কমিশন।
রাজ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ২০১০ সালের নভেম্বরে রাইটার্স থেকে ৪৬টি জাতির নাম কেন্দ্রীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য জাতীয় কমিশনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। এরপর কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রক ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্য সরকারের পাঠানো ওবিসি জাতিগুলির তালিকা থেকে ৩৭টিকে কেন্দ্রীয় তালিকায় আনার বিজ্ঞপ্তি জারি করে। অর্থাৎ, কেন্দ্র তাদের অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে অনুমোদন দিয়েছিল। মোদি জমানায় রাজ্যের নতুন কোনও জাতিকে কেন্দ্রীয় ওবিসি তালিকায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। উপরন্তু গত ৩ জানুয়ারি জাতীয় ওবিসি কমিশনের সচিব বিজ্ঞপ্তি জারি করে সুপারিশ জানান, পশ্চিমবঙ্গের মোট ৩৫টি জাতিকে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তার মধ্যে ৩৩টিই মুসলিম ওবিসি জাতি। দু’টি হিন্দু ওবিসি জাতিও আছে, যাদের কেন্দ্রীয় তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। ওই দু’টি জাতি অবশ্য ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রীয় তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
নজর করার মতো বিষয় হল, ওবিসি কমিশনের এখনকার চেয়ারম্যান ও একমাত্র সদস্য—দু’জনেই বিজেপি নেতা। চেয়ারম্যান হংসরাজ গঙ্গারাম আহির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। তাই কি এমন বঞ্চনা? নাকি পুরোটাই রাজনীতি? রাজ্যের অনগ্রসর কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী বুলুচিক বরাইক বলেন, ‘বিজেপি এরাজ্যের সবকিছুতে রাজনীতি করে। এখানেও তাই হয়েছে। ওবিসি হিসেবে জাতিগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় তো সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র। এখন তাহলে বাতিলের সুপারিশ করার মানে কি?’
জাতীয় ওবিসি কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করলেই এই ৩৫টি জাতির মানুষ কেন্দ্রীয় তালিকার বাইরে চলে যাবেন। তখন কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি বা কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওবিসি সংরক্ষণের সুবিধা তাঁরা আর পাবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মোট ৯৯টি জাতি এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হলে রাজ্যের হাতেগোনা কয়েকটি মুসলিম ওবিসি জাতি কেন্দ্রীয় তালিকায় থাকবে। দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে তালিকা পাঠানোর চার বছর পর যে জাতিগুলি কেন্দ্রীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তার মধ্যে মাত্র দু’টি মুসলিম জাতির নাম (হাজাম ও চৌধুলি) বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেনি জাতীয় ওবিসি কমিশন।
রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর আরও বহু জাতি ওবিসি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাম সরকার যাওয়ার সময় রাজ্য তালিকায় থাকা ওবিসি জাতির সংখ্যা ছিল ১০৮টি। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮০। তাদের কেন্দ্রীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাজ্য সুপারিশ করলেও তা মানা হয়নি। ফলে তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।