


মুম্বই: কখনও কখনও চোখের জলেই আঁকা থাকে নানা রঙের ছবি। বৃহস্পতিবার রাতে আরব সাগরের পাড়ে জেমাইমা রডরিগেজের কান্না সেজন্যই পরিণত রূপকথায়। বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে চাপের বোঝা কাঁধে নিয়ে সাতবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারানো যে একেবারেই সহজ ছিল না! তাড়া করতে হচ্ছিল ৩৩৯। কাপযুদ্ধের ইতিহাসে যে রেকর্ড নেই। তার উপর র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা ব্যাটার স্মৃতি মান্ধানার ব্যাট থেমে গিয়েছিল দশ ওভারের মধ্যেই, মাত্র ২৪ রানে। আস্কিং রেট তখনই সাত ছুঁইছুঁই। বাকি আরও প্রায় আড়াইশো রান। ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে নেমে এসেছে পিনপতনের নিস্তব্ধতা। ঘরের মাঠে কাপ জয়ের স্বপ্ন চুরমার হওয়ার কাউন্টডাউন শুরুও হয়ে গিয়েছিল। কে জানত, জেমাইমার ব্যাটের জাদুতে প্রাণ ফিরে পাবে গ্যালারি? শুধু গ্যালারিই বা কেন, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, পুরো দেশই তো এরপর অপলকে তাকিয়ে থাকল বাণিজ্যনগরীরর বাইশ গজে। ক্যাপ্টেন হরমনপ্রীত কাউরকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে জয়ের বিশ্বাস ফেরালেন জেমাইমা। আর তাতেই কোণঠাসা অ্যালিসা হিলির দল। পড়ল সহজ ক্যাচ। হল মিসফিল্ড। সেঞ্চুরির দোরগোড়া থেকে হরমনপ্রীত ফেরার পর ফের রক্তচাপ বাড়ল গ্যালারির। কিন্তু মুম্বইয়ের লড়াকু কন্যা ছিলেন ছিলেন নিরুদ্বেগ। বরং ক্যাপ্টেনের আউট আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তুলল জেমাইমাকে। নিজেকে উদ্দীপ্ত করতে মনে মনে আওড়ালেন বাইবেল। একটাই সংকল্প— ম্যাচ শেষ করে ফিরতে হবে। করলেনও সেটাই। জয়ের মুহূর্তে চোখের জল সেজন্যই বাঁধনহারা।
শুধু জেমাইমার নয়, এই আনন্দাশ্রু তো প্রত্যেক ভারতীয়েরই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় আমরা সবাই চাই ঘুরে দাঁড়াতে। প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে হাজারো সমস্যা টপকে মনে মনে ছুঁয়ে ফেলি স্বপ্নের মিনার। জেমাইমাদের হাল-না-ছাড়া লড়াই সেজন্যই স্পর্শ করছে ভারত আত্মাকে।
রবিবার আরও একবার এভাবেই কেঁদে উঠতে চাইছে ১৪৬ কোটির দেশ। বিশ্বকাপের ফাইনাল বলে কথা। উল্টোদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা। কয়েকদিন আগেই যাদের কাছে হারতে হয়েছে লিগের সাক্ষাতে। এবার হরমনপ্রীত, স্মৃতিদের সামনে সুদে-আসলে জবাব দেওয়ার পালা। ঠিক যেভাবে ভারতের প্রমীলা ব্রিগেডের প্রতিশোধের আগুনে ছারখার হয়েছে অজিদের দর্প। মহিলাদের ক্রিকেটে কখনও বিশ্বকাপ জেতেনি ভারত। টিম ইন্ডিয়ার সামনে তাই ইতিহাসের হাতছানি। জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে একজোট পঞ্জাবি হরমনপ্রীত, মারাঠি মান্ধানা, বাঙালি রিচা। চোখের জলেই এবার কাপ জয়ের শপথ। তেরঙার পাশাপাশি জেমাইমাদের হাতে মহিলা ক্রিকেটের পতাকাও। কে বলতে পারে, হরমনপ্রীতের হাতে ধরা কাপ ভবিষ্যতের মান্ধানাদের চোখে স্বপ্নের মায়াকাজল পরাবে না! একসময় ধর্মীয় বিতর্কে নাম জড়িয়েছিল জেমাইমার বাবার। অভিযোগ ছিল, ধর্মান্তরিতকরণের কাজে মুম্বইয়ের খার জিমখানাকে ব্যবহারের। তারজন্য সদস্যপদও খোয়ান বাবা ইভান। এই জয় সেই সব বিতর্ককে ছুড়ে ফেলল।