সংবাদদাতা, হলদিয়া: গভীর নিম্নচাপের জেরে একদিনের অতিবৃষ্টিতে জলবন্দি হল সারা হলদিয়া শিল্পাঞ্চল। জলে ভাসছে হলদিয়া পুরসভার ২৯টি ওয়ার্ড। বৃষ্টিতে শিল্পশহরে এই বিপর্যয় নেমে আসার জন্য পুর এলাকার বেহাল নিকাশি ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন বাসিন্দারা। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরও শহরে গত কয়েক মাসে নিকাশি সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ। চরম দুর্ভোগের জন্য পুর কর্তৃপক্ষকে দুষছেন এলাকার মানুষ।
আবহাওয়া দপ্তর গভীর নিম্নচাপের জন্য 'লাল সতর্কতা' জারি করলেও পুর কর্তৃপক্ষ ও মহকুমা প্রশাসন আগাম কোনও প্রস্তুতি নেয়নি বা বার্তা দেয়নি বলে অভিযোগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৩৩ ঘণ্টায় হলদিয়া এলাকায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ১২ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১৩ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ওই পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পরিভাষায় এটি আকাশভাঙা অতিভারী বৃষ্টি। হলদিয়ার ইতিহাসে সর্বকালীন রেকর্ড বৃষ্টি হয়েছে, জানাচ্ছেন আবহাওয়া দপ্তরের বিশেষজ্ঞরা। ওই নিম্নচাপের অবস্থান হলদিয়ার উপর হওয়ার কারণেই ভাসছে বন্দর শহর, জানিয়েছেন তাঁরা।
একটানা প্রবল বৃষ্টির জেরে পুর এলাকার জনজীবন থেকে শিল্পাঞ্চল সবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সিংহভাগ এলাকার রাস্তাঘাট জলের তলায় চলে গিয়েছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে জলমগ্ন হয়েছে ঘরবাড়ি। রাস্তা, ড্রেন, ক্যানেল, জলাভূমি সব একাকার হয়ে গিয়েছে। শহরের আবাসন এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বাজার সবই জলমগ্ন। হলদিয়ার একাধিক শিল্প কারখানা জলমগ্ন হয়েছে, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। কোথাও আবার কাজকর্ম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে শিল্প সংস্থাগুলি। বৃষ্টি বিপর্যয়ের মধ্যেই হলদিয়ার একটি নামী শিল্পসংস্থায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্ল্যান্ট সাটডাউন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রবল বৃষ্টির কারণে ওই কারখানায় মেন্টেনান্সের কাজে সমস্যা হচ্ছে।
হলদিয়া পুরসভার সমস্ত ওয়ার্ডই কম বেশি জলের তলায়। হলদিয়ার দুর্গাচক টাউন এলাকার ৮-৯টি ওয়ার্ডে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। শহরের বহু বাড়িতে জল ঢুকেছে নিকাশি বেহাল হওয়ার কারণে। দুর্গাচকে মহকুমা হাসপাতালের আবাসনে জল ঢুকেছে দীর্ঘদিন পর। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয়ে আবাসনগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ চালাচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মীরা। দুর্গাচকের বাসিন্দা দুর্গেশ আদক বলেন, আবাসন এলাকায় আগে কখনও জল ঢোকেনি। এই প্রথম তাঁর বাড়ি জলমগ্ন। স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক সুকুমার শেঠ বলেন, রাস্তাঘাট, বাজার,স্কুল সবই জলমগ্ন। স্কুলে অলিখিত ছুটি দিতে হচ্ছে। শহরের বহু স্কুলে জল ঢুকে পড়েছে। চিরঞ্জীবপুর এলাকায় বেহাল নিকাশির জন্য এক কোমর রাস্তার উপর। জলবন্দি বয়স্ক মানুষজন সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন। হলদিয়ার এক্সাইড কারখানার ভেতরে প্রোডাকশন এরিয়া জলমগ্ন। জলের মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে কাজ। ক্যান্টিনে একহাঁটু জলে পা ডুবিয়ে খাচ্ছেন শ্রমিকরা, সেই ছবি ভাইরাল করেছেন শ্রমিকরাই। ইমামি ভোজ্যতেল, গোকুল সহ একাধিক কারখানা জলমগ্ন হওয়ায় কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরেও বিভিন্ন এলাকায় জলের মধ্যেই কয়লা লোডিংয়ের কাজ চলছে। মহকুমা প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, এসডিও অফিস ও পুরসভায় বিপর্যয় মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন ২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় তিন হাজার তার্পোলিন পাঠানো হয়েছে। এছাড়া দুর্গতদের ত্রাণ শিবিরে তুলে এনে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। বিধায়ক প্রদীপ বিজলির উদ্যোগে এদিন পুরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ত্রাণশিবিরে খিচুড়ি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর টিমের উদ্যোগে দুর্গতদের বাড়ি গিয়ে তার্পোলিন বিতরণ করা হচ্ছে। এদিকে, বৃষ্টির কারণে পুকুর ও রাস্তা একাকার হওয়ায় শিবরামনগরে জলে ডুবে শেখ রবিউল ইসলাম(৪৯) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। সিপিএম নেতা পরিতোষ পট্টনায়েক বলেন, অতিবৃষ্টির জমে থাকা জল বিভিন্ন লকগেটের মাধ্যমে নদীতে বের করতে হয়। এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিয়ে নজরদারি প্রয়োজন। এবার সেবিষয়ে কোনও পদক্ষেপ না থাকায় ভুগতে হচ্ছে মানুষকে। পুর প্রশাসনের এবিষয়ে কোনও হেলদোল নেই।