Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হায় বিচারব্যবস্থা!

হায় বিচারব্যবস্থা!
  • ৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
চিন্ময়কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে জামিন দেয়নি বাংলাদেশের আদালত। গত ২৫ নভেম্বর সে-দেশের পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তার আগেও তাঁর জামিনের আর্জি নাকচ হয়েছে। ফের শুনানি ছিল মঙ্গলবার। তাই চট্টগ্রাম আদালতের দিকে নজর ছিল সারা পৃথিবীর হিন্দুসহ সমস্ত ধরনের গণতন্ত্র প্রিয় মানুষের। কিন্তু ওই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিই ওইদিন হয়নি। কারণ চিন্ময়কৃষ্ণের হয়ে আদালতে কোনও আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। ফলে আগামী ২ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর জামিন মামলার শুনানি স্থগিত রেখেছে ‘মহামান্য’ আদালত। তাই নববর্ষের দিনসহ আগামী একমাস জেলেই কাটাতে হবে চিন্ময়কৃষ্ণকে। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর মামলায় ফাঁসিয়েছে নোবেলজয়ী মহম্মদ ইউনুসের সরকার। ইনি সেই ইউনুস যাঁর নোবেল জয়ের খবরে সবচেয়ে বেশি উল্লাস করেছিল এপার বাংলার জনগণ, কারণ তিনি নাকি বাঙালির গৌরব, তাঁর সম্মানে নাকি আপামর বাঙালির মাথা আরও একধাপ উঁচু হয়েছে! যদিও বাংলাদেশেরই মাটিতে তাঁকে ঘিরে পরবর্তী ইতিহাস একেবারে অন্য। সেই ‘মহামানবই’ এখন কোনোরকম নির্বাচন ছাড়াই বাংলাদেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। এহেন ক্ষমতালোভী মানুষ যে সংখ্যাগুরু উগ্র মৌলবাদীদের হাতের পুতুল হবেন, তা বোঝার জন্য কোনও কঠিন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশ জুড়ে হিন্দুসহ সমস্ত ধরনের ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রেণির স঩ঙ্গে যে ইতরসুলভ আচরণ করা হচ্ছে তাতেই খোলসা হচ্ছে বিষয়টি।
Advertisement
চিন্ময়কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর অপরাধ কী? প্রথম পরিচয় তিনি একজন হিন্দু। রাষ্ট্রক্ষমতা শেখ হাসিনার কাছ থেকে গায়ের জোরে কেড়ে  নেওয়া হয়েছে মাসকয়েক আগেই। তার পর থেকে, সেখানে হিন্দুসহ সমস্ত সংখ্যালঘু শ্রেণির উপর উগ্র মৌলবাদী মুসলিম এবং সরকারি প্রশাসনের অত্যাচার নির্যাতন সমস্ত সীমা ছাড়িয়েছে। তারই বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের নামেই এই প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে। অত্যাচারিত হিন্দুসহ সমস্ত সংখ্যালঘু শ্রেণিও তাঁকে আন্তরিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। আসল সমস্যা এখানেই। হিন্দুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘু শ্রেণি এই প্রথম প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছে তীব্র প্রতিরোধও। বাংলাদেশের হিন্দুদের এই চেহারা একদম নতুন। উগ্র মৌলবাদী শ্রেণি এবং জঙ্গি বাহিনী এই জিনিস কোনোমতেই মেনে নিতে পারছে না। তাদের এতকালের ধারণা ছিল, ‘আমরা খুন-জখম, ভাঙচুর, লুটপাট, মেয়েদের ইজ্জত লুট প্রভৃতি যা-খুশি করব। হিন্দুরা হয় মুখ বুজে সবই মেনে নেবে, অথবা সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ইন্ডিয়ায় (ওরা ভারত বা হিন্দুস্থান বলে না) পালাবে। এটাই আমাদের সংবিধান, এটাই আমাদের হক। এইভাবেই তো পূর্ববঙ্গে হিন্দুর শতাংশ হার ২৮ থেকে ৭-এ নামিয়ে এনেছি। আর একটু এগতে পারলেই তো এথনিক ক্লিনসিংয়ের প্ল্যান পুরো সাকসেসফুল!’ তারা আরও ভাবছে, ‘কিন্তু এবারটি যে তেমন হচ্ছে না! চিন্ময়কৃষ্ণ না কে এক ব্যাটা কাবাব মে হাড্ডির মতোই উদয় হয়েছে! অতএব দেখাচ্ছি মজা।’ 
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে দুর্বলও মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তোলে, এই সত্য দুর্বৃত্তরা বিস্মৃত হয়েছিল। সংঘাতের শুরু সেখান থেকেই। চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেপ্তারের যাঁরা প্রতিবাদ করেছেন, দেশজুড়ে এখন চলছে তাঁদেরও সবক শেখাবার বা বাগে আনার পালা। গোট দেশ জুড়ে অত্যাচার বহুগুণ হয়ে গিয়েছে। এমনকী বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছেন যেসব হিন্দু পর্যটক, রেহাই দেওয়া হচ্ছে না তাঁদেরকেও। আশ্চর্য পুলিসি নিষ্ক্রিয়তায় এটাই প্রমাণ যে, এর পিছনে বর্তমান শাসকের পূর্ণ সমর্থন অথবা গোপন নির্দেশ রয়েছে। এহ্‌ বাহ্য। আদালত বা বিচার ব্যবস্থার কোন ভূমিকা দেখাল ইউনুসের বাংলাদেশ? একজন বিচারপ্রার্থী আদালতে উকিল পেলেন না! তাঁর হয়ে যাঁরা সওয়াল করতে আগ্রহী আইনজীবীরাই সেখানে বর্বর আক্রমণের শিকার। আইনজীবী নামধারী একদল লোক কোর্টে দাঁড়িয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তারা হুঁশিয়ার করে দিয়েছে, চিন্ময়কৃষ্ণের হয়ে যাঁরা সওয়াল করার সাহস দেখাবেন তাঁদের ভবপারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এমনকী, চিন্ময়কৃষ্ণকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার দাবিও শোনা গিয়েছে ওই ঘৃণ্য লোকগুলির মুখে। আদালত সব দেখেও স্পিকটি নট। ইউনুসের উটকো প্রশাসন না-হয় ‘সব অপপ্রচার’ এবং ‘সব ঠিক হ্যায়’ বলে পাশ কাটাতে পারে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশের বিচারব্যবস্থা এই ভয়ানক অন্যায় মেনে নেয় কীভাবে? আদালতও কি তার স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়েছে? এই না হলে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশ? শত ধিক্কারও এই ব্যবস্থার জন্য অল্প হয়ে যায় বইকি!
সম্পর্কিত সংবাদ